Saturday, February 28, 2026

দরিদ্র রোগী, না মুখ্যমন্ত্রী? ডাক্তারের কাছে কে গুরুত্বপূর্ণ, যোগীকে শেখালেন বাঙালি চিকিৎসক

Date:

Share post:

যেখানে সরকারি চোখ রাঙানিতে বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে কার্যত বেহাল প্রশাসন, পুলিশ। সাধারণ মানুষের থেকে নেতা, মন্ত্রীদের তাবেদারিতে তৎপর উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশের মতো গোবলয়ের প্রশাসনিক কর্তারা, সেখানেও যে নিজের নীতির প্রতি আস্থাশীল থাকলে উপেক্ষা করা যায় মুখ্যমন্ত্রীর চোখ রাঙানি, প্রমাণ করে দিলেন এক বাঙালি। চিকিৎসক হিসাবে একজন দরিদ্র মানুষের মূল্য যে একজন মুখ্যমন্ত্রীর সমান, উত্তরপ্রদেশের (Uttarpadesh) মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথকে (Yogi Adityanath) চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন বাঙালি চিকিৎসক তপন কুমার লাহিড়ি।

বিদেশের হাসপাতালের লক্ষ লক্ষ ডলারের হাতছানি ছিল, ছিল আয়েশি জীবনের সুযোগ। কিন্তু সেই সব কিছুকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে বেনারসের (Varanasi) গলিতে গলিতে আজ তিনি এক জীবন্ত ভগবান। তিনিই ডক্টর তপন কুমার লাহিড়ি। ৮৩ বছর বয়সের এই বাঙালি চিকিৎসক আজও হাতে কালো ছাতা আর কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে প্রতিদিন নিয়ম করে পৌঁছে যান হাসপাতালে, লক্ষ্য একটাই— গরিব মানুষের সেবা।

উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ একবার অসুস্থ হয়ে ডক্টর লাহিড়িকে নিজের কাছে ডেকে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু সাধারণ মানুষের এই প্রিয় ডাক্তারবাবু সোজাসাপ্টা জানিয়ে দেন, অসুখ যখন আপনার, তখন ডাক্তার হিসাবে আমার কাছে আপনার আসা উচিত। আমি আপনার কাছে যেতে যে সময় নষ্ট করব, সেই সময়ে অন্তত পাঁচজন গরিব মানুষ বিনা চিকিৎসায় ফিরে যাবে।

১৯৪১ সালে কলকাতায় জন্ম নেওয়া তপনবাবুর ছোটবেলা কেটেছে অভাবের তাড়নায় সাধারণ মানুষের চিকিৎসা না পাওয়ার কষ্ট দেখে। কলকাতা মেডিকেল কলেজ (Medical College) থেকে ডাক্তারি পাস করার পর পাড়ি দিয়েছিলেন ইংল্যান্ডে। ১৯৬৯ সালে এফআরসিএস এবং পরে থোরাসিক সার্জারিতে এমসিএইচ ডিগ্রি লাভ করেন। বিদেশে রাজকীয় মাইনের চাকরির প্রস্তাব থাকলেও ১৯৭২ সালে তিনি ফিরে আসেন দেশে। মাত্র ২৫০ টাকা বেতনে যোগ দেন বেনারস হিন্দু ইউনিভার্সিটির ইনস্টিটিউট অফ মেডিকেল সায়েন্সে (BHU Medical Science)।

সারাজীবন মানব সেবা করতে গিয়ে নিজের ঘর বাঁধা হয়নি তাঁর। ডাক্তার লাহিড়ি মনে করেন, সুস্থ হয়ে ওঠা রোগীর মুখের হাসিই তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ পুরস্কার। একসময় তিনি সরকারি মাইনে নিতেও অস্বীকার করেন। ২০০৩ সালে অবসরের পর পেনশনের সিংহভাগ টাকা দান করে দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের তহবিলে। বিনিময়ে তাঁর দাবি ছিল অতি সামান্য — সেখানের কোয়ার্টারে একটি ঘরে থাকতে দিতে হবে তাকে। নিজের যৎসামান্য প্রয়োজনটুকু বাদ দিয়ে বাকি সবটুকু বিলিয়ে দেন গরিবের সেবায়। অবসর নেওয়ার সাত দিনের মধ্যে বিদেশের পাঁচটি হাসপাতাল লক্ষাধিক টাকার প্যাকেজ অফার করে তাকে । কিন্তু তাতেও কান দেননি তিনি।

আরও পড়ুন : উইক এন্ডে রোজগার দ্বিগুণ, অন্ধ্রপ্রদেশে কুমোররাও খুঁজে পেয়েছেন নতুন পথ

চিকিৎসাক্ষেত্রে তাঁর এই নিঃস্বার্থ অবদানের জন্য ভারত সরকার তাঁকে ‘পদ্মশ্রী’ (Padmasree) সম্মানে ভূষিত করেছে। যদিও কোনো প্রচার বা সম্মানের প্রতি তাঁর কোনো মোহ নেই। অবসর নেওয়ার ২০ বছর পরেও তাঁর জন্মদিন ধুমধাম করে পালন করেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। আজও প্রতি বছর ৩রা জানুয়ারি তাঁর জন্মদিনে বেনারসের গঙ্গায় হাজার হাজার প্রদীপ ভাসান কৃতজ্ঞ রোগীরা। রোগীর মঙ্গল কামনায় যে চিকিৎসক জীবনের শেষ দিনটুকু কাটিয়ে যাচ্ছেন, তাঁর জন্য যখন তাঁর রোগীরাই মঙ্গল কামনা করেন, তার থেকে বড় প্রাপ্তি একজন চিকিৎসকের আর কী বা হতে পারে। ঠিক আজ যেটা পাচ্ছেন বেনারসের বাঙালি চিকিৎসক তপন কুমার লাহিড়ি।

spot_img

Related articles

এলাহাবাদের মামলা আরও এক সপ্তাহ পিছিয়ে দেওয়া হোক: হঠাৎ রসিকতা প্রধান বিচারপতির

গোটা দেশে অপেক্ষা রঙের উৎসবের। খানিকটা ছুটির মুডে দেশের বিচার ব্যবস্থাও। আর সেই পরিস্থিতিতে একটি মামলা প্রসঙ্গে এবার...

হাওড়ায় যুবক খুন: তদন্তভার সিআইডি-র হাতে

খুন করে গঙ্গা পার হয়ে লুকোচুরি খেলা। মূল খুনির সঙ্গেও একাধিক সহযোগীর যোগ। ফলে হাওড়ার গোলাবাড়ির (Golabari) প্রোমোটারের...

সুপ্রিম কোর্টে জোর ভর্ৎসনা: পড়ুয়া থেকে সমাজ মাধ্যমে অনুরোধ নিয়ে NCERT

বিচার ব্যবস্থার বদনাম করার চেষ্টা করে সুপ্রিম কোর্টে প্রবল ভর্ৎসিত কেন্দ্রের শিক্ষা দফতর। কোথা থেকে বিচার ব্যবস্থা নিয়ে...

শনিবার কখন প্রকাশিত হবে ভোটার তালিকা: জানালেন সিইও

নভেম্বরের শুরু থেকে যে এসআইআর প্রক্রিয়া বাংলাসহ ১২ রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে শুরু হয়েছিল তার মধ্যে একাধিক রাজ্যেই...