Thursday, January 15, 2026

উদ্ভাবন ও সমন্বয়ের মধ্য দিয়ে ভারতের উত্থান নিশ্চিত করছে স্টার্টআপ সংস্থাগুলি

Date:

Share post:

পীযূষ গোয়েল, কেন্দ্রীয় শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী
স্টার্টআপ ইন্ডিয়া উদ্যোগ দেশজুড়ে এক সমন্বিত ও উদ্ভাবনী পরিবেশ গড়ে তুলেছে, যেখানে যুব সম্প্রদায় শিল্পোদ্যোগের উৎসাহের ফলে নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে। ফলস্বরূপ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ২০৪৭-সালের মধ্যে বিকশিত ভারত গড়ে তোলার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হচ্ছে।

বিশ্বের বৃহত্তম স্টার্টআপ (Start Up) ব্যবস্থাপনা এখন ভারতে (India)। আজ দেশ জুড়ে শিল্পোদ্যোগের যে পরিবেশ গড়ে উঠেছে তার মধ্য দিয়ে ভারতের অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে পরিবর্তন এসেছে। এই ব্যবস্থা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই পরিবর্তন হঠাৎ করে একরাতের মধ্যে হয়নি। ২০১৫-র স্বাধীনতা দিবসে লালকেল্লা থেকে প্রধানমন্ত্রী যখন স্টার্টআপ ইন্ডিয়ার ঘোষণা করেছিলেন, তখন তিনি এক উচ্চাকাঙ্খী পদক্ষেপ করেছিলেন─ এর ফলে দেশের প্রতিটি জেলা এবং ব্লকে শিল্পোদ্যোগের পরিবেশ যে গড়ে হবে সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত ছিলেন।

২০১৬-র ১৬ জানুয়ারি শিল্পোৎসাহ ও অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য দফতর স্টার্টআপ (Start Up)  ইন্ডিয়ার সূচনা করে। এই উদ্যোগ অর্থনীতির বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রকে চাঙ্গা করে তুলেছিল। এর মধ্যে তথ্যপ্রযুক্তি পরিষেবা, স্বাস্থ্য পরিষেবা, শিক্ষা, কৃষি ও নির্মাণ শিল্প উল্লেখযোগ্য।

জলবায়ু পরিবর্তনের মতো সমস্যার সমাধানে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও পরিকাঠামো সহ ৫০ টিরও বেশি শিল্পে নতুন নতুন উদ্যোগ নজরে আসছে। এর মধ্য দিয়ে দেশের উন্নয়ন নিশ্চিত হয়, এধরণের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে উদ্ভাবন ও প্রাণবন্ত পরিবেশের প্রতিফলন ঘটে।

উদ্ভাবন ও কৃত্রিম মেধা – গত এক দশক ধরে উদ্ভাবন ও ডিপ টেকনোলজির মতো ক্ষেত্রগুলিকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। ২০১৫ সালে আন্তর্জাতিক উদ্ভাবন সূচকের নিরিখে ভারতের স্থান ছিল ৮১। গত বছর এই সূচক বেশ কয়েক ধাপ উঠে ৩৮ –এ পৌঁছেছে। প্রযুক্তি ক্ষেত্রে সরকারের প্রতিনিয়ত সহায়তার কারণেই অগ্রগতির এই ধারা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে। পিএম ডিজিটাল ইন্ডিয়া উদ্যোগের ফলে কৃত্রিম মেধা সংক্রান্ত স্টার্টআপ সংস্থার সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে।

উন্নতি প্রযুক্তির বলে বলীয়ান একটি রাষ্ট্র (Country) গড়ে তুলতে প্রধানমন্ত্রী যে স্বপ্ন দেখেছেন সেই স্বপ্নের বাস্তবায়নে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। অনুসন্ধান ন্যাশনাল রিসার্চ ফাউন্ডেশন গড়ে তোলার পাশাপাশি ইন্ডিয়া এআই মিশন এবং রিসার্চ ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড ইনোভেশন স্কিমের মতো প্রকল্পের কাজও শুরু হয়েছে। বর্তমানে বিমান শিল্প, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম, পরিবেশ বান্ধব প্রযুক্তি, রোবোটিক্সস, ইন্টারনেট অফ থিঙ্কস এবং সেমিকন্ডাক্টর-সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভারতীয় স্টার্টআপ সংস্থাগুলি উদ্ভাবনমূলক নানা উদ্যোগ বাস্তবায়িত করছে।

ভারতের বৌদ্ধিক সম্পত্তি সৃষ্টির উত্থান এই প্রবণতার প্রতিফলন। ভারতীয় স্টাটআপ সংস্থাগুলি ১৬৪০০ টি নতুন পেটেন্টের জন্য আবেদন করেছে। এর থেকে এটি স্পষ্ট যে এই সংস্থাগুলি আন্তর্জাতিক স্তরে প্রতিযোগিতায় যেমন শামিল হচ্ছে পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদী এক ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা ও মৌলিক উদ্ভাবনেও গুরুত্ব দিচ্ছে।

দেশজুড়ে উন্নয়ন– শিল্পোদ্যোগে সমগ্র ভারত জুড়ে সহায়তার এক পরিবেশ তৈরি হওয়া যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। ২০১৬সালে দেশের মাত্র ৪ টি রাজ্যে স্টার্টআপ সংক্রান্ত নীতি কার্যকর করা হয়। আজ ৩০টিরও বেশি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে এই নীতি কার্যকর হয়েছে। বর্তমানে প্রতিটি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে শিল্পোৎসাহ ও অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য দফতর স্বীকৃত স্টার্টআপ সংস্থা কাজ করছে। এর মধ্য দিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার পাশাপাশি তৃণমূল স্তরে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলির অংশগ্রহণও প্রতিফলিত হচ্ছে। এপর্যন্ত ২ লক্ষেরও বেশি স্টার্টআপ সংস্থাকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। ফলস্বরূপ সুস্থায়ী এক নীতিভিত্তিক পরিবেশ গড়ে ওঠার বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। ২০২৫ সালে ৪৯৪০০ টি স্টার্টআপ সংস্থাকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।  ফলে স্টার্টআপ ইন্ডিয়া কর্মসূচি শুরু হওয়ার পর এই প্রথম একবছরে এত বেশি সংস্থা স্বীকৃতি পেল।

স্টার্টআপের এই যাত্রায় সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। মহিলাদের নেতৃত্বে শিল্পোদ্যোগ এক্ষেত্রে অত্যন্ত ফলপ্রসু হয়েছে। স্বীকৃত স্টার্টআপ সংস্থাগুলির মধ্যে ৪৫ শতাংশেরও বেশি সংস্থায় কমপক্ষে একজন মহিলা ডিরেক্টর রয়েছেন। এর পাশাপাশি অর্ধেকও বেশি সংস্থা গড়ে উঠেছে ছোট ছোট শহরগুলিতে। এর মধ্য দিয়ে বোঝা যায় উদ্ভাবন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির চালিকাশক্তি হিসেবে দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণির শহরগুলির ভূমিকা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে।

স্থানীয় স্তরের উদ্যোগ থেকে আন্তর্জাতিক স্তরে পৌঁছনো– ভারতের স্টার্ট সংস্থাগুলির সংখ্যা যত বৃদ্ধি পাচ্ছে আন্তর্জাতিক বাজারে তাদের অংশীদারিত্বও বাড়ছে। বিশ্বের চাহিদাপূরণের জন্য স্টার্টআপ ইন্ডিয়া আন্তর্জাতিকস্তরে শক্তিশালী অংশীদারিত্ব গড়ে তুলছে। ২১টি আন্তর্জাতিক সেতু এবং কৌশলগত জোট বর্তমানে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রগুলির সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছে। এর মধ্যে ব্রিটেন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, সুইডেন ও ইজরায়েলের মত দেশগুলি রয়েছে। এই উদ্যোগগুলির ফলে ৮৫০টিরও বেশি স্টার্টআপ সংস্থা উপকৃত হচ্ছে। আমি সম্প্রতি সুইডেন, সুইজারল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড এবং ইজরায়েল সফর করেছি। স্টার্টআপ সংস্থাগুলির প্রতিনিধিরাও ভারতের বাণিজ্য সংক্রান্ত দলের সদস্য ছিলেন। এই ভাবে সারা পৃথিবীর কাছে ভারতের উদ্ভাবনী শক্তির পরিচয় করানো হয়েছে। উন্নত রাষ্ট্রগুলি আমাদের  শিল্পোদ্যোগীদের উদ্ভাবন ও ব্যবসা বাণিজ্যের কৌশল সম্পর্কে ধারণা পেয়েছে।

সংস্কার এবং বাজারের সুযোগ – বর্তমানে সহজে ব্যবসা করার পরিবেশ আরও উন্নত হওয়ায় কেন্দ্রীয় স্তরে এই উন্নয়ন যাত্রায় স্টার্টআপ সংস্থাগুলি শামিল হয়েছে। যোগ্য স্টার্টআপ সংস্থাগুলি তাদের প্রথম দশকে পর পর ৩ বছর কর ছাড়ের সুযোগ পায়। ইতোমধ্যে ৪,১০০টি সংস্থা প্রয়োজনীয় শংসাপত্র পেয়েছে। ৬০টিরও বেশি নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত সংস্কার কার্যকর হওয়ায় নানা ধরণের নিয়মের বেড়াজালের বাঁধন থেকে মুক্ত হওয়া গেছে। এর ফলে মূলধন বৃদ্ধি যেমন সম্ভব হয়েছে, পাশাপাশি দেশ জুড়ে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ শক্তিশালী হয়েছে। অ্যাঞ্জেল ট্যাক্স বিলোপ করা এবং দীর্ঘমেয়াদের মূলধন পাওয়ার সুযোগ তৈরি হওয়ায় বিনিয়োগ সংক্রান্ত বিকল্প তহবিল আরও শক্তিশালী হয়েছে।

বাজারে উৎপাদিত পণ্য বিক্রির সুযোগটিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। গভণর্মেন্ট ই মার্কেটপ্লেস বা জেম-এ ৩৫,৭০০টি সংস্থা যুক্ত হয়েছে। এই সংস্থাগুলি ৫ লক্ষেরও বেশি অর্ডার পেয়েছে, যার বাজার মূল্য ৫১,২০০ কোটি টাকারও বেশি।

শক্তিশালী আর্থিক সহায়তার কারণেই এই উদ্যোগগুলি বাস্তবায়িত হচ্ছে। ফান্ড অফ ফান্ডস ফর স্টার্টআপস স্কিম-এর আওতায় বিনিয়োগ সংক্রান্ত বিকল্প তহবিল ২৫,৫০০ কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ করেছে।এর সুফল ১৩০০ শিল্পোদ্যোগীর কাছে পৌঁছেছে। এছাড়াও ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিম ফর স্টার্টআপসের আওতায় ৮০০ কোটি টাকা বন্ধকমুক্ত ঋণের মাধ্যমে দেওয়া হয়েছে।

প্রুফ অফ কনসেপ্ট প্রোটোটাইপ ডেভেলপমেন্ট,  উৎপাদিত পণ্যের পরীক্ষা নিরীক্ষা, বাজারে প্রবেশ ও বাণিজ্যিকীকরণে স্টার্টআপ সংস্যাগুলিকে সহায়তার জন্য স্টার্টআপ ইন্ডিয়া সিড ফান্ড স্কিমের আওতায় ৯৪৫ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে।

পরিবেশের পরিবর্তন -দেশে ভারতীয় স্টার্টআপ সংস্থাগুলি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন সংগঠিত করতে পেরেছে। অতীতে কমবয়সীদের সরকারী  চাকরিতে বসা ছাড়াও ডাক্তারি ও ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে যাতে তারা পড়াশোনা করে সেই বিষয়ে তাদের উৎসাহ দেওয়া হত, কারণ এই বিষয়গুলি নিয়ে পড়াশোনা করলে সহজেই চাকরি পাওয়া যাবে। আজ ভারতীয় যুবক যুবতীরা কর্মপ্রার্থী নয়, কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী হয়ে উঠতে আগ্রহ প্রকাশ করছেন। তাদের পরিবারের সদস্যরাও এই বিষয়ে উৎসাহ দিচ্ছেন।

ভারতের স্টার্টআপ যাত্রা আসলে আমাদের তরুণ শিল্পোদ্যোগীদের আস্থার সোপান। এই সুনির্দিষ্ট নীতির নেতৃত্বে উন্নয়ন হচ্ছে। এছা়ড়াও বিশ্বের জন্য ভারতের উদ্ভাবন ক্ষমতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০৪৭ সালের মধ্যে উন্নত রাষ্ট্র গড়ে তোলার লক্ষ্যে আমরা এগিয়ে চলেছি। আমাদের এই প্রত্যয়ী যাত্রায় স্টার্টআপগুলির ভূমিকা মূল কেন্দ্রে রয়েছে।এর ফলে আন্তর্জাতিক স্তরে যেকোনও প্রতিযোগিতায় ভারত অংশ নিতে পারবে।  এইভাবে একটি সমৃদ্ধ রাষ্ট্রও গঠিত হবে।

spot_img

Related articles

নন্দীগ্রামে ‘দাগি’র মামলায় বাতিল ২০১৬-র প্যানেল ! বিস্ফোরক অভিযোগ 

২০১৬-র শিক্ষক নিয়োগের পুরো প্যানেল বাতিল করে দিয়েছে আদালত। যার জেরে চাকরি হারিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন রাজ্যের...

তামিমকে অপমান, ক্রিকেটারদের কড়া অবস্থানে কর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিল বিসিবি

টি২০ বিশ্বকাপের আগে গৃহযুদ্ধে জেরবার বাংলাদেশ ক্রিকেট। কর্তা বনাম ক্রিকেটারদের দ্বন্দ্বে উত্তপ্ত পরিস্থিতি বাংলাদেশ ক্রিকেটে। ক্রিকেটারকে অসম্মান করার...

খসড়া তালিকা প্রকাশ না করলে গণ-আন্দোলন বাংলা থেকে দিল্লি: নন্দীগ্রামে হুঙ্কার অভিষেকের

লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সির তালিকা প্রকাশ না করলে তৃণমূল গণ-আন্দোলন গড়ে তুলবে। শুধু কলকাতায় নয়, আন্দোলন আছড়ে পড়বে দিল্লিতেও। বৃহস্পতিবার...

মুখ্যমন্ত্রীর প্রস্তাবে সায়, ২৩ জানুয়ারি পরীক্ষা নয় ঘোষণা NTA-এর

রাজ্যের আবেদনে সাড়া দিয়ে জয়েন্ট এন্ট্রান্স মেইন (Joint Entrance Main)-এর পরীক্ষা পিছিয়ে দিল জাতীয় পরীক্ষা নিয়ামক সংস্থা (NTA)।...