
… আমি অর্ফিয়াসের বাঁশরী ,
মহা-সিন্ধু উতলা ঘুম ঘুম
ঘুম চুমু দিয়ে করি
নিখিল বিশ্বে নিঃঝুম…

মৃত্যুপুরীর একেবারে শেষ প্রান্তে যখন হাওয়ায় মিলিয়ে যাচ্ছে প্রিয়তমা ইউরিডিসের পার্থিব অবশেষের শেষ
চিহ্নটুকু, তখনই শোনা গেল এক দৈববাণী, ” হায় অর্ফিয়াস! তুমি দেখিয়ে দিলে, দেব স্বভাবের চেয়ে মানব স্বভাব অধিকতর শক্তিশালী। ”

বীর অর্ফিয়াস, শিল্পী ও প্রেমিক অর্ফিয়াস , একাধারে অর্ধমানব ও অর্ধদেবতা অর্ফিয়াস মানবীয় ত্রুটির ঊর্ধ্বে যেতে পারে নি। সে শেষপর্যন্ত বিশ্বাস রাখতে পারে নি দৈববাণীতে। মানবীয় কৌতুহল, আশঙ্কা ও অবিশ্বাস থেকে মুক্ত হতে সে পারে নি। তাই সে হারিয়েছে তার প্রিয়তমা স্ত্রীকে চিরদিনের জন্য। কিন্তু তার সম্মোহনী, মনোমুগ্ধকর জাদুকরী বাঁশির সুর পৌরাণিক কাহিনীর অন্তরাল ভেদ করে আজ হাজার হাজার বছর পরেও যেন বাস্তবের মাটিতে মূর্ত হয়ে ওঠে। জগৎ ও জীবনের সমস্ত অন্ধকার সরিয়ে আজও যেন হাওয়ায় হাওয়ায় ভেসে বেড়ায় অর্ফিয়াসের বাঁশির সুর, আলো ছড়ায় ভালোবাসার, বার্তা শোনায় মনের সঙ্গে মনের মহাবন্ধনের। বার্তা দেয় এক উজ্জ্বল উন্নত পৃথিবীর।

অর্ফিয়াস ও ইউরিডিসের উপাখ্যান এক অবিস্মরণীয় অবিনশ্বর পৌরাণিক প্রেমকথা। গ্রিক পুরাণের কিংবদন্তি সঙ্গীতশিল্পী ছিলেন অর্ফিয়াস। তাঁর ছিল এক অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন বাদ্যযন্ত্র,যা প্রকৃতির জড় ও জীবন্ত সবকিছুকেই মুগ্ধ করতো। দেবতা, মানুষ, জীবজন্তু , এমনকি পাথর পর্যন্ত আলোড়িত হতো তাঁর অসামান্য বাঁশরীর সুরে।
আসলে তিনি বাজাতেন ‘ কিথারা ‘ ( Kithara ) , যে যন্ত্রটির সুর বীণার মতো। এটি ছিল প্রাচীন গ্রিসের একটি তারযুক্ত বাদ্যযন্ত্র, যেটি প্রাচীন গ্রিসের উচ্চমার্গীয় সঙ্গীতে ভীষণ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। শুধু সুরশিল্পীই নয়, অর্ফিয়াস ছিলেন কবি ও ধর্মগুরু। ছিলেন অসামান্য প্রজ্ঞার অধিকারী। সঙ্গীতের অসাধারণ শক্তির মূর্ত প্রতীক অর্ফিয়াস ছিলেন একাধারে মানব ও ঐশ্বরীয় ক্ষমতাধর। সূর্যদেবতা অ্যাপোলো স্বয়ং তাঁকে একজন কবি ও সঙ্গীতজ্ঞ হিসেবে তালিম দেন , এমনই ছিল জনশ্রুতি। পৃথিবীতে শুধুমাত্র তাঁর সমসাময়িকদের মোহিত করাই নয়, তার বাইরেও অর্ফিয়াস পাতালের নিষিদ্ধ অঞ্চলে প্রবেশ করার ছাড়পত্র পেতেও সঙ্গীতের অপরাজেয় ক্ষমতাকে ব্যবহার করেছিলেন।

অর্ফিয়াসের প্রিয়তমা স্ত্রী ইউরিডিসকে সাপে কামড়ায় এবং তাঁর মৃত্যু হয়। শোকে কাতর অর্ফিয়াস তাঁর মৃত স্ত্রীর জীবন ফেরাতে প্রবেশ করেন পাতালপুরীতে। সেখানে পাতালের দেবতা হেডিস এবং তাঁর স্ত্রী পার্সেফোনের দরবারে পৌঁছে যান তিনি। সুরের মূর্ছনায় তাঁদেরও মোহিত করেন এবং তাঁদের কাছে তাঁর মৃত স্ত্রীর প্রাণ ফিরিয়ে দেওয়ার আবেদন করেন। প্রথমে তাঁরা অর্ফিয়াসের আবেদনে সাড়া না দিলেও শেষপর্যন্ত তাঁর স্ত্রীর প্রাণ ফিরিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিতে একপ্রকার বাধ্য হন তাঁরা। কিন্তু কঠিন এক শর্ত দেন, তা হলো পাতাল থেকে বেরিয়ে পৃথিবীতে পা রাখার মুহূর্ত থেকেই তিনি আর পিছনের দিকে তাকাতে পারবেন না। তাঁর স্ত্রী তাঁর পিছনে পিছনে কিছুটা দূরত্ব রেখে হাঁটতে থাকবে। কিন্তু এই শর্ত ভঙ্গ করলে অর্ফিয়াস তাঁর স্ত্রীকে চিরদিনের মতো হারাবেন। স্ত্রীকে ফিরে পাবার আনন্দে অধীর অর্ফিয়াস দেবতাদের অজস্র ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে পাতাল থেকে বেরোনোর উদ্দেশ্যে হাঁটতে শুরু করেন। কিন্তু কিছুটা এগোতেই ইউরিডিসের পায়ের শব্দ শুনতে না পেয়ে তাঁর মনে সংশয় উপস্থিত হয়। তিনি দেবতার দেওয়া শর্ত ভুলে স্ত্রীকে দেখার জন্য পিছনে তাকান এবং দেখতে পান তাঁর প্রিয়তমা তাঁর চোখের সামনেই ধীরে ধীরে হাওয়ায় বিলীন হয়ে গেলেন।
এই চূড়ান্ত বিচ্ছেদে একেবারে বিধ্বস্ত হয়ে একটি শোকগাথা লিখে মর্মান্তিক মৃত্যুবরন করেন অর্ফিয়াস।

গ্রিক পুরাণের চরিত্র হলেও অর্ফিয়াস ও তাঁর বাঁশরী ভালোবাসা ও ন্যায়ের প্রতীক হয়ে রয়েছে আজও। আজও কবিতায়, গানে , সিনেমা ও নাটকে, প্রতিবাদে-প্রতিরোধে, সমস্ত অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে , শোষণ, অবিচার ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে আন্দোলনে সমবেত স্লোগানে অর্ফিয়াসের বাঁশরী যেন মূর্ত প্রেরণা। যুগ যুগান্তর ধরে সঞ্চিত জমাট অন্ধকারের বুক চিরে আলোকোজ্জ্বল মশাল হয়ে যেন জেগে রয়েছে এই মিথ।

অর্ফিয়াসের বাঁশির মোহময়ী সুর যেন বিশ্বব্যাপী হিংসা ও বিদ্বেষের আগুন নিভিয়ে প্রকৃতি ও জীবজগতে শান্তি ও সাম্য প্রতিষ্ঠা করে। বিপুল ধ্বংসের মাঝে দাঁড়িয়েও যেন সৃষ্টির সৌন্দর্য্যের জয়গান গায় অর্ফিয়াসের বাঁশরী। এ বাঁশরীর অপূর্ব সুর যেন ধ্বংস ও সৃষ্টির মাঝে নির্মাণ করে এক অভিনব সেতু , যা আদতে সর্বকাল ও সর্বযুগের এক অতুল ভারসাম্য। জীবন ও মরণের সীমানা ছাড়িয়ে এই সুর যেন এক অপরাজেয় স্বত্বা, যা ধ্বংসের অন্ধকারের মধ্যেও অপরূপ এক ঐকতানের সন্ধান দেয় আমাদের চিরঅস্থির বিশ্বকে।

আরও পড়ুন- ভোটার তালিকায় কারচুপির অভিযোগ: মাইক্রো অবজার্ভার নিয়োগ নিয়ে কমিশনকে কড়া চিঠি মুখ্যমন্ত্রীর

_

_
_


