Sunday Feature: আজীবন অবিবাহিত অটল কেন দত্তক নিয়েছিলেন বান্ধবীর মেয়েকে?

Date:

Share post:

চল্লিশের দশকের গোয়ালিয়র। ভিক্টোরিয়া কলেজের লাইব্রেরিতে ধুলো জমা ভারী বইয়ের তাকে লুকানো ছিল এক পশলা নরম রোদ। সেখানেই দেখা হয়েছিল দুই পড়ুয়ার— অটল বিহারী বাজপেয়ী এবং রাজকুমারী হাকসার। পরাধীন ভারতের সেই রক্ষণশীল সময়ে প্রেম আসত অতি সঙ্গোপনে, বইয়ের ভাঁজে চিঠির চিরকুট হয়ে। যুবক অটল মনের কথা লিখে একটি বইয়ের ভেতরে রেখেছিলেন রাজকুমারীর জন্য। রাজকুমারী উত্তরও দিয়েছিলেন। কিন্তু ভাগ্যের পরিহাসে সেই ফিরতি চিঠি আর কোনোদিন অটলের হাতে পৌঁছয়নি। না-পৌঁছনো সেই উত্তরহীনতাকেই জীবনের ‘চরম উত্তর’ মেনে নিয়ে সরে গিয়েছিলেন অটল। অথচ সেই হারানো চিঠির বুকেই লেখা ছিল এক দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কের পাণ্ডুলিপি।

দেশভাগের উত্তাল সময়ে রাজকুমারীর বিয়ে হয়ে যায় অধ্যাপক ব্রিজ নারায়ণ কৌলের সঙ্গে। অটল মগ্ন হন রাজনীতিতে। বহু বছর পর দিল্লিতে ফের দেখা দু’জনের। ততদিনে অটল প্রতিষ্ঠিত জননেতা, আর রাজকুমারী দিল্লির রামজাস কলেজের অধ্যাপকের পত্নী। কিন্তু তাঁদের সম্পর্কের রসায়ন ছিল সমকালীন সমস্ত সামাজিক সংজ্ঞার বাইরে। ১৯৭৮ সালে অটল যখন বিদেশমন্ত্রী, তখন থেকেই রাজকুমারী কৌল, তাঁর স্বামী এবং সন্তানরা অটলের সঙ্গেই থাকতে শুরু করেন। কোনো লুকোছাপা নয়, বরং এক ছাদের তলায় এক অদ্ভুত ও নিখাদ সখ্যতায় কেটেছে তাঁদের দশকের পর দশক।

এই সম্পর্কের সবচেয়ে উজ্জ্বল ও সংবেদনশীল দিকটি হলো দত্তক গ্রহণ। বাজপেয়ীর রাজনৈতিক জীবনের ব্যস্ততা ও একাকীত্বের মাঝে রাজকুমারী কৌলের পরিবারই হয়ে উঠেছিল তাঁর একান্ত আপন। রাজকুমারীর স্বামী বিএন কৌলের মৃত্যুর পর বাজপেয়ীর এই পরিবারের প্রতি দায়বদ্ধতা আরও গভীর হয়। তিনি আইনি বা সামাজিক প্রথার ঊর্ধ্বে গিয়ে রাজকুমারীর কন্যা নমিতাকে নিজের সন্তানের মর্যাদা দেন এবং তাঁকে দত্তক নেন।

সাধারণত চিরকুমার কোনো রাজনীতিবিদের এই ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়ে চটুল চর্চার সুযোগ থাকে বিস্তর। কিন্তু অটল ও রাজকুমারীর ব্যক্তিত্বের দৃঢ়তা সেই সব গুজবকে ডানা মেলতে দেয়নি। অটল শুধু নমিতাকেই নয়, পরবর্তীতে নমিতার কন্যা অর্থাৎ রাজকুমারীর নাতনি নীহারিকাকেও দত্তক নিয়েছিলেন। ভারতের এক প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে গড়ে উঠেছিল এক ছকভাঙা পরিবার, যেখানে রক্তের সম্পর্কের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছিল আজন্ম লালিত বন্ধুত্বের টান। নমিতাকে তিনি এতটাই ভালোবাসতেন যে, ২০১৮ সালে অটলের জীবনাবসানের পর তাঁর মুখাগ্নিও করেছিলেন এই পালিতা কন্যাই।

২০১৪ সালে রাজকুমারী কৌলের মৃত্যুর সময় কোনো মিডিয়া ট্রায়াল হয়নি। নীরবে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে এসেছিলেন সোনিয়া গান্ধী থেকে শুরু করে লালকৃষ্ণ আডবাণী। জীবনের একমাত্র সাক্ষাৎকারে রাজকুমারী নিজেই বলেছিলেন, তাঁর ও অটলের বন্ধুত্ব এতটাই গভীর যে তা সবার বোঝার ক্ষমতা নেই। আর অটল? তিনি এই সম্পর্কের গোপনীয়তা ও পবিত্রতা রক্ষা করেছেন আমৃত্যু।

একবার এক সাংবাদিক কৌতূহলবশত মিসেস কৌল সম্পর্কে প্রশ্ন করলে অটল তাঁর স্বভাবজাত রসবোধে উত্তর দিয়েছিলেন, “কাশ্মীর জাইসা হি মামলা হ্যায়।” অর্থাৎ যা অত্যন্ত জটিল, স্পর্শকাতর কিন্তু অবিচ্ছেদ্য। লাইব্রেরির সেই না-পৌঁছনো চিঠির আক্ষেপ অটল মিটিয়েছিলেন এক পশলা নিঃস্বার্থ ভালোবাসা আর পিতৃত্বের দায়িত্ব দিয়ে। ভারতের ইতিহাসের পাতায় অটল-রাজকুমারীর এই গল্প চিরকাল এক অনন্য ও অমলিন ‘লিভিং ইন’ বা বন্ধুত্বের সমান্তরাল আখ্যান হয়েই থাকবে।

আরও পড়ুন – সুপ্রিম নির্দেশ সত্ত্বেও অধরা ট্রাইবুনাল, ভোটের মুখে প্রার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা

_

 

_

 

_

 

_

spot_img

Related articles

IPL: ইডেনে কেকেআরের বিরুদ্ধে প্রীতির দলের তুরুপের তাস নাইট প্রাক্তনী

  সোম সন্ধ্যায় ইডেনে ভীরু-জারা। ঘরের মাঠে দ্বিতীয় ম্যাচে কেকেআরে (KKR)প্রতিপক্ষ পাঞ্জাব কিংস।এই ম্যাচটা যতটা না নাইটদের সঙ্গে পাঞ্জাব...

প্রার্থীদের কথা শুনছে কমিশন! ভোট পরিচালনার নিরপেক্ষতায় প্রশ্ন বিচারপতির

নির্বাচন পরিচালনায় মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের নিরপেক্ষতা নিয়ে একাধিকবার প্রশ্ন তুলেছে বাংলার শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস। এবার নির্বাচন...

হার্মাদরা জার্সি পাল্টে সন্ত্রাস ফেরাতে চাইছে! জামানত জব্দ হবে বহিরাগতদের

বিজেপিকে ভোট দেওয়া মানে পরোক্ষভাবে সিপিএমের হার্মাদদের সমর্থন করা! তাই রায়নার মানুষ আগেও এইসব বহিরাগতদের জামানাত বাজেয়াপ্ত করে...

ভোটার তালিকা থেকে ৮০ লক্ষ নাম উধাও! কমিশনের বিরুদ্ধে ‘ষড়যন্ত্রের’ অভিযোগে সরব গণমঞ্চ

রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়া বা ‘সার’ (স্পেশাল ইনটেন্সিভ রিভিশন) নিয়ে বিস্ফোরক অভিযোগ তুলল নাগরিক...