সুপ্রিম কোর্টের (Supreme Court) এক গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণে নতুন করে আলোচনায় উঠে এল গৃহবধূদের অবদান। শীর্ষ আদালত স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, বিয়ে মানে কোনও মহিলাকে ঘরের পরিচারিকার দায়িত্বে বসিয়ে দেওয়া নয়। সংসার সামলানো, সন্তানদের বড় করে তোলা, পরিবারের প্রতিটি সদস্যের দেখভাল করা এই সমস্ত কাজের কোনও নির্দিষ্ট বেতন না থাকলেও তার মূল্য অপরিসীম। তাই শুধু গৃহবধূ নয়, তাঁদের দেশের ভবিষ্যৎ গড়ার অন্যতম স্তম্ভ বলেই স্বীকৃতি দিয়েছে শীর্ষ আদালত। এক পথ দুর্ঘটনায় মৃত গৃহবধূর ক্ষতিপূরণ সংক্রান্ত মামলার শুনানিতে এই গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ করেছে সুপ্রিম কোর্ট।

আদালতের পর্যবেক্ষণ, এতদিন পথ দুর্ঘটনায় কোনও গৃহবধূর (Home Maker) মৃত্যু বা আহত হওয়ার ঘটনায় ক্ষতিপূরণ নির্ধারণের সময় তাঁদের অবদানকে মূলত অদক্ষ বা আধা দক্ষ শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরির সঙ্গে তুলনা করে হিসেব করা হতো। ফলে একজন গৃহবধূ প্রতিদিন সংসারের জন্য যে অসংখ্য দায়িত্ব পালন করেন সেই নিরলস পরিশ্রমের প্রকৃত মূল্য কখনওই উঠে আসত না। আদালতের মতে, এই অবৈতনিক শ্রমকে শুধুমাত্র অর্থনৈতিক মাপকাঠিতে বিচার করলে একজন মহিলার পরিবারের ও সমাজের প্রতি অবদানকে ছোটো করা হয়।

সেই কারণেই সুপ্রিম কোর্ট নতুন নির্দেশিকায় স্পষ্ট করেছে, পথ দুর্ঘটনায় কোনও গৃহবধূর (Home Maker) মৃত্যু হলে তাকে শুধু একটি সম্ভাব্য আয়ের ক্ষতি হিসেবে দেখা যাবে না। বরং একটি পরিবারের ভরসা, যত্ন এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রার যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়, ক্ষতিপূরণ নির্ধারণের সময় সেই দিকটিকেও গুরুত্ব দিতে হবে। এই ভাবনাকে সামনে রেখেই মোটর যান আইনের আওতায় গৃহবধূর মৃত্যুর ঘটনায় ক্ষতিপূরণের ভিত্তি হিসেবে মাসিক ন্যূনতম ৩০ হাজার টাকা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে শীর্ষ আদালত। একই সঙ্গে দেশের সমস্ত উচ্চ আদালতের প্রধান বিচারপতিদের এই ধরনের মামলাগুলি দ্রুত নিষ্পত্তির বিষয়েও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এই রায়ের মাধ্যমে সংসারে মহিলাদের ভূমিকা নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। আদালতের মতে, বিয়ের পর ঘরের সব কাজ বা দায়িত্ব শুধুমাত্র স্ত্রীর উপর চাপিয়ে দেওয়া ঠিক নয়। পরিবার ও সংসার সামলানো স্বামী-স্ত্রী দুজনেরই সমান দায়িত্ব। একই সঙ্গে আদালত জানিয়েছে, বিয়ে হয়ে গেলেই কোনও মহিলার নিজের স্বপ্ন বা কর্মজীবনের ইচ্ছে শেষ হয়ে যায় না। তিনি যদি পরিবারের দায়িত্ব পালন করেও নিজের পেশাগত জীবনে এগিয়ে যেতে চান, তবে তা নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোনও জায়গা নেই।

আইন বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, এই পর্যবেক্ষণ শুধু একটি মামলার রায় নয়, সমাজের বহুদিনের প্রচলিত ধারণারও বদল ঘটানোর বার্তা। দীর্ঘদিন ধরে ঘরের কাজকে কাজ বলেই ধরা হতো না, অথচ সেই অদৃশ্য শ্রমের উপরই দাঁড়িয়ে থাকে একটি পরিবার। সুপ্রিম কোর্টের এই মন্তব্য সেই অবদানের স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি, স্ত্রীকে শুধুমাত্র ঘর সামলানোর মানুষ হিসেবে দেখার মানসিকতার বিরুদ্ধেও স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছে।

–

–

–
–
–
