কেমন আছে পর্যটকদের আকর্ষণের অমোঘ চুম্বক ঐতিহাসিক কোচবিহার রাজবাড়ি?

সোমনাথ বিশ্বাস, কোচবিহার

কোচবিহারকে ঘিরে রয়েছে অনেক ইতিহাস। হেরিটেজ স্থাপত্যের একের পর এক নিদর্শন রয়েছে কোচবিহার শহরকে কেন্দ্র করে। কোচবিহারের ‘কোচ’ শব্দটি এসেছে কোচ রাজবংশ থেকে। ‘বিহার’ শব্দটি এসেছে সংস্কৃত শব্দভাণ্ডার থেকে। ব্রিটিশ রাজত্ব থেকে শুরু করে মহারাজা নৃপেন্দ্র নারায়ণের রাজত্বকাল— পুরনো বহু স্মৃতি আজও বহন করে চলেছে এই জেলা। কোচবিহারের অন্যতম আকর্ষণ ঐতিহ্যবাহী রাজবাড়ি। পর্যটকদের কাছেও আকর্ষণের অমোঘ চুম্বক ঐতিহাসিক কোচবিহার রাজবাড়ি।এখানকার প্রাকৃতিক পরিবেশও মুগ্ধ করার মতো। রাজাদের সেই যুগ আর নেই। বর্তমানে যার রক্ষণাবেক্ষণ-এর দায়িত্বে রয়েছে আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া।

১৮৮৭ সালে মহারাজা নৃপেন্দ্র নারায়ণের রাজত্বকালে তৈরি হয়েছিল কোচবিহার রাজবাড়ি। অপর নাম ভিক্টর জুবিলি প্যালেস। লন্ডনের বাকিংহাম প্রাসাদের আদলে এই রাজবাড়িটি তৈরি হয়েছিল বলেই মনে করেন অনেকে। কারও কারও দাবি, রোমের সেন্ট পিটার্স ব্যাসিলিকার আদলে নির্মিত এই প্রাসাদ। কোচবিহার রাজবাড়ি ইষ্টক-নির্মিত। অর্থাৎ, প্রধানত ইট-বালি-সুড়কি দিয়ে তৈরি প্রাসাদটি।

দোতলা রাজবাড়িটিতে ক্ল্যাসিক্যাল ওয়েস্টার্ন শৈলী বা ইতালীয় রেনেসাঁর স্থাপত্য নিদর্শন মেলে। রোমান গথিক শৈলী ফুটে ওঠা এই বিশাল প্রাসাদ চার হাজার মিটারেরও বেশি জায়গা জুড়ে অবস্থিত। প্রাসাদটির উচ্চতা ১২৪ ফুট। প্রাসাদের ভিতর রয়েছে শয়নকক্ষ, বৈঠকখানা, ডাইনিং হল, বিলিয়ার্ড হল, গ্রন্থাগার ইত্যাদি। তা ছাড়াও, সেখানে দেখতে পাওয়া যায় পুরনো দিনের আসবাব এবং নানা সামগ্রী। কোচবিহারের রাজবাড়ির ইতিহাস জানতে আজও বহু মানুষ ভিড় করেন।

৫১,৩০৯ বর্গফুট বিশাল এলাকার জুড়ে প্রাসাদটি গড়ে উঠেছে। মূল ভবনটি ১২০ মিটার দীর্ঘ ও ৯০ মিটার প্রশস্ত। রাজবাড়ির আকর্ষণ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে তার সামনের সুসজ্জিত গার্ডেনটি। যা কিছুটা কলকাতার ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল-এর উদ্যানের মতই সুসজ্জিত।

৬৪ ঘর বিশিষ্ট এই রাজ মহলে ৩৮মিটার উঁচু রেনেসাঁ শৈলীতে নির্মিত একটি দরবার কক্ষ রয়েছে। এছাড়া বাড়িতে রয়েছে ড্রেসিং রুম, শয়নকক্ষ, বৈঠকখানা, ডাইনিং হল, বিলিয়ার্ড হল, গ্রন্থাগার, তোষাখানা, লেডিজ গ্যালারি ও ভেস্টিবিউল। যদিও এই সব ঘরে রাখা আসবাব ও অন্যান্য সামগ্রী এখন আর নেই। পর্যটকদের জন্য ৮টি কক্ষের মিউজিয়াম গঠন করা হয়েছে। যেখানে রাজাদের ব্যবহৃত বিভিন্ন পোশাক, দেবদেবীর মূর্তি, সামান্য কিছু আসবাবপত্র রয়েছে।

রাজবাড়ির উদ্যানের আকর্ষণের কারণ একাধিক। যদিও স্থানীয় মানুষদের দাবি, সেই উদ্যানের আকর্ষণ এখন অনেকটাই কমেছে। কিন্তু কেন? তাঁরা বলছেন, একটা সময় এই উদ্যানের প্রধান আকর্ষণ ছিল মিউজিক্যাল ফোয়ারা। কেউ কেউ বলত— সঙ্গীত জলফোয়ারা। চোখ ধাঁধানো দৃশ্য! ছবি তুলে রাখার মতো ! স্থানীয়দের পাশাপাশি বাইরে থেকে আসা বহু পর্যটকও টিকিট কেটে এখানে সময় কাটাতে আসতেন। কিন্তু এখন তা খুব বেশি হয়ে ওঠে না। কর্তৃপক্ষ বিকেলের পরই বন্ধ করে দেয় রাজবাড়ির ফটক। উদ্যানেও ওই সময় থেকে প্রবেশ নিষিদ্ধ।

তাঁদের আরও দাবি, সেই উদ্যান এখন অনেকটাই বেহাল-বিপন্ন! পর্যাপ্ত সংস্কার আর সৌন্দর্যায়নের অভাবে উদ্যানটি ক্রমশ তার আকর্ষণ হারাতে বসেছে। আগের তুলনায় পর্যটকের সংখ্যা কমেছে। কোচবিহার রাজবাড়ির উদ্যানটি রাজবাড়ির মতোই ঐতিহাসিক স্থান হিসেবে দেশে-বিদেশে পরিচিতি পেয়েছে। পর্যটক ও সৌন্দর্যপিপাসু মানুষ ভিড় জমাতেন ঐতিহ্যবাহী এই পার্কে। কিন্তু উদ্যানটি আজ প্রায় ধ্বংসের মুখে। ক্রমশ সবুজ হারিয়ে যাচ্ছে। আগাছা ঘিরে ধরছে, আলো নেই, সংস্কারে অবহেলা, বড় বড় ঘাসে ঢেকে গিয়েছে গোটা পার্ক।

কোচবিহার রাজবাড়ি ও তার উদ্যান আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে তার ঐতিহ্যমন্ডিত ইতিহাসকে সঙ্গী করে। কিন্তু সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে রাজবাড়ির জৌলুস ও আকর্ষণ এখন অনেকটাই নিম্নমুখী।