আমি এই বিপর্যয়ের উৎস স্হলের কাছে থাকি। চিনের সীমান্ত থেকে আমার বাড়ি গাড়িতে আধ ঘন্টার রাস্তা। গত দুমাস ধরে ‘চৈনিক দৈত্য ‘ মোকাবিলা করছি।

হংকংবাসী এ ব্যাপারে সারা পৃথিবীর কাছে বাহবা পেয়েছে ও পাচ্ছে। দুমাস আগে ভারতে যখন করোনার সম্পর্কে বিশেষ কোনও ধারনাই ছিল না, তখন থেকেই আত্মীয়স্বজন, বন্ধু-বান্ধবদের বিপর্যয় আসতে পারে বলে সাবধান করেছি, ফোনে কিম্বা ফেসবুকে পোস্ট করেছি। কেউ শুনেছে, গুরুত্ব বুঝেছে, আবার কেউ শুনেছে , কিন্তু বোঝেনি বা বুঝতে চায়নি। অনেকেই দেশে ফিরে আসতে বলেছে। আসিনি তিনটে কারনে। প্রথমত, ভীরু ও দায়িত্বজ্ঞানহীনের মতো দুঃসময়ে বিদেশের সহকর্মী , বন্ধু-বান্ধবদের ছেড়ে পালাতে চাইনি। দ্বিতীয়ত, রোগ বাহক হয়ে দেশের মানুষকে দুর্গতির দিকে ঠেলে দিতে চাইনি। তৃতীয়ত ইন্টারন্যাশনাল ফ্লাইটে উঠে নিজে রুগী হয়ে মৃত্যু ডেকে আনতে চাইনি।

দেশে আমার ৮৪ বছর বয়স্ক বাবা , ছেলে, স্ত্রীকে , ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের প্রতিদিন বুঝিয়েছি, কেন আমি যেতে পারছি না বা চাইছি না। এখন বুঝতে পারছি আমি কতোটা সঠিক চিন্তা করেছিলাম ও সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। আমি এদের সকলের কাছে কৃতজ্ঞ, এরা আমাকে শুনেছেন ও বুঝেছেন। আবার ( আমার ছেলের মতো ) কেউ কেউ হয়তো ভেবেছে – এর বয়স বাড়ছে আর টেনশন বাড়ছে। বেশি মন দিয়ে না শুনলেই হলো। সত্যি বলতে কি – গত দু’মাস ধরে এই আতঙ্ক তাড়িয়ে বেরাচ্ছে, সঙ্গে বিশেষ দুশ্চিন্তা বৃদ্ধ বাবাকে নিয়ে। প্রাক্তন শিক্ষক, অত্যন্ত বিচক্ষন মানুষটি প্রতিনিয়ত আমাকে শক্ত থাকতে অনুপ্রাণিত করেছেন। নিজের একমাত্র ছেলের জন্য দুশ্চিন্তাকে আড়াল করে। আমার কাতর আবেদন শুনে ফ্রেব্রুয়ারিতেই নিজেদের জন্য কিছু মাস্কের ব্যবস্হা করেছেন।

ঠিক সেই সময়েই যখন আমার দুশ্চিন্তাকে সঠিক প্রতিপন্ন করে এই দুর্যোগ ভারতের মাটিতে,পশ্চিমবঙ্গের মাটিতে আছড়ে পড়ল, বিহ্বল হয়ে গেলাম, কী করে আমার এই বিশাল দেশ এই মারণ ব্যধি সামলাবে? সরকার কতটা আন্তরিক ও তৎপর হবে ? কতটা ,আর কতো দ্রুত বুঝবে এর ভয়াবহতা? আজ এই মূহুর্তে বলতে দ্বিধা নেই, আমাদের রাজ্য সরকার ও কেন্দ্রীয় সরকার তৎপরতার সঙ্গে এই দুর্যোগ মোকাবিলার চেষ্ঠা করছেন, সঙ্গে অসম্ভব পরিশ্রম করছেন চিকিৎসকরা আর ওই বিভাগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ঠ অসংখ্য মানুষ , দেশের বিভিন্ন বিভাগের দায়িত্বশীল কর্মীরা।
কার্গিলের যুদ্ধের সময় দেশকে এক হয়ে যেতে দেখেছিলাম, আজ আবার দেখছি , যা আমাকে আশ্বস্ত করছে প্রতি মূহুর্তে। আশার আলো দেখছি -‘একদিন ঝড় থেমে যাবে , পৃথিবী আবার শান্ত হবে’ , আমি আবার আমার দেশে যাবো, বাবাকে দেখবো , প্রিয়জনদের দেখবো, বন্ধু বান্ধবদের দেখবো। এখন যুদ্ধ চলছে, যুদ্ধ থামানো চলবে না, যতদিন না এই দুর্যোগ নিয়ন্ত্রনে আসে।


দেশের দুই ক্যাপ্টেন দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিচক্ষণতার সঙ্গে আমাদের পরিচালনা করছেন ও নির্দেশিকা দিচ্ছেন। এ মুহূর্তে আমাদের দায়িত্ব তা অক্ষরে অক্ষরে মেনেচলা, নয়তো একজনের একটা ভুল একটা গ্রামকে শেষ করে দিতে পারে। এই দৈত্যের হাত পা কাটতে আমাদের সকলকে নিয়মানুবর্তী, আন্তরিক, অনুভূতিপরায়ণ ও শক্তিশালী হতে হবে।


সত্যি কথা বলতে কি মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার আগে আবেগযুক্ত , নাছোড় মমতা ব্যানার্জিকে দীর্ঘদিন পরে অনুভব করতে পারলাম। দিদি আপনার ওপর শ্রদ্ধা, ভরসা, নির্ভরতা আরও বেড়ে গেলো। আপনি সুস্হ্য থাকুন, মাস্ক পরুন, গ্লাভস পরুন , আর প্রয়োজনীয় বিশ্রাম নিন। ইন্টারন্যাশনাল ফ্লাইট চালু হলে, কোয়ারেন্টাইন টাইম শেষ হলে আমি দেশে যাবো, বাবাকে দেখবো, পরিবারের কাছের মানুষদের দেখবো, পাড়ার ক্লাবে আড্ডা মারবো, আপনার সঙ্গেও দেখা করার চেষ্ঠা করবো। ততক্ষন দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য, আপনাদের জন্য ২৬৪৭ কিলোমিটার দূর থেকে প্রার্থনা করছি।
