“এক ব্যক্তি এক পদ” রীতিতে প্রদেশ সভাপতির দৌড়ে অধীর-মান্নানদের টেক্কা দিচ্ছেন প্রদীপ

সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আগামী বছর অর্থাৎ ২০২১ সালের এপ্রিল-মে মাস নাগাদ অনুষ্ঠিত হতে পারে রাজ্য বিধানসভা নির্বাচন। তাই করোনা আবহের মধ্যেই যতটা সম্ভব নিজেদের ঘর গুছিয়ে নেওয়া থেকে শুরু করে রণকৌশল তৈরিতে নেমে পড়েছে বাংলার প্রধান রাজনৈতিক দলগুলি।

শাসক তৃণমূল কংগ্রেস হোক কিংবা প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে উঠে আসা বিজেপি সংগঠন মজবুত করতে প্রতিনিয়ত কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। একাধিক ভার্চুয়াল সভার আয়োজন করছে।

অন্যদিকে, একুশের ভোটের লক্ষ্যে বিগত বেশ কয়েক মাস ধরে বাম-কংগ্রেস জোটকে মজবুত করতে একাধিক যৌথ কর্মসূচি গ্রহণ করেছে সিপিএম ও কংগ্রেস নেতৃত্ব। শুধু মূল রাজনৈতিক দলই নয়, ছাত্র-যুব থেকে শুরু করে বাম কংগ্রেসের শ্রমিক সংগঠনগুলিও একের পর এক রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করেছে। তৃণমূল ও বিজেপিকে বেগ দিতে বাম-কংগ্রেসের মতো দুই বিপরীতধর্মী রাজনৈতিক দলকে কাছাকাছি আনতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন প্রদেশ কংগ্রেস সদ্য প্রয়াত সোমেন মিত্র।

রাজ্য রাজনীতির খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে সোমেন মিত্রের আকস্মিক প্রয়াণ এই জোট রাজনীতিতে সমস্যায় ফেললেও ফেলতে পারে বলেও মনে করছে রাজনৈতিক মহলের একাংশ। তাই সোমেন মিত্রের বিকল্প উত্তরসূরি খোঁজার কাজ বেশি দিন ফেলে রাখতে চায় না কংগ্রেস। কলকাতায় এসে তেমনই ইঙ্গিত দিলেন বাংলার এআইসিসি পর্যবেক্ষক গৌরব গগৈ। রাজ্যের নেতারাও তাঁর কাছে আর্জি জানিয়েছেন, সোমেন মিত্রের অসম্পূর্ণ কাজ এগিয়ে নিয়ে যেতে হাইকম্যান্ড যেন দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়।

বামেদের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে সোমেন মিত্রের হাত ধরে “দুর্বল” প্রদেশ কংগ্রেস রাজ্য রাজনীতিতে কিছুটা প্রাসঙ্গিকতা খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করছিল। আর গত কয়েক বছরে প্রদেশ দফতরে সোমেন মিত্রের সবচেয়ে বেশি ছায়াসঙ্গী হিসেবে যাঁকে দেখা গিয়েছে সেই প্রদীপ ভট্টাচার্য প্রদেশ সভাপতি হিসেবে সোমেনবাবুর উত্তরসূরী হওয়ার দৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে।

NRC-CAA থেকে শুরু করে করোনা-আমফানন সব ইস্যুতে রাজ্য ও কেন্দ্রের বিরুদ্ধে প্রতিটি কর্মসূচিতে সোমেন মিত্রের পাশে থেকেছেন রাজ্যসভার সাংসদ প্রদীপ ভট্টাচার্য। সোমেন মিত্রের উপস্থিতিতেও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে ভাষণ দেওয়া থেকে শুরু করে সংবাদ মাধ্যমের কাছে প্রতিক্রিয়া সবই করেছেন বর্ষীয়ান কংগ্রেস নেতা প্রদীপ ভট্টাচার্য।

শুধু টসি নয়, তৃতীয়বার প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি হওয়ার পর থেকে বিভিন্ন নির্বাচনে প্রার্থী তালিকা বাছাই থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলি সবচেয়ে বেশি যদি সোমেন মিত্র কারও থেকে নিয়ে থাকেন, তিনি প্রদীপ ভট্টাচার্য। বিধানচন্দ্র রায়ের জন্ম-মৃত্যু দিবস উদযাপন হোক কিংবা ফরোয়ার্ড ব্লক দফতরে অশোক ঘোষের জন্মজয়ন্তী পালন, বাম-কংগ্রেস সখ্যতায় সর্বক্ষেত্রে বান সোমেন মিত্রের সঙ্গী ছিলেন প্রদীপ ভট্টাচার্য।

ফলে খুব দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রবীণ নেতা প্রদীপ ভট্টাচার্যকেই আরও একবার প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতির পদে বসিয়ে দেওয়া কংগ্রেস হাইকম্যান্ডের কাছে খুব একটা বড় সমস্যা হওয়ার কথা নয়। এর বাইরে প্রদেশ সভাপতি হওয়ার মতো এই মুহূর্তে আর মাত্র দুটি অপশন আছে। অধীর চৌধুরী আর আব্দুল মান্নান। সর্বভারতীয় কংগ্রেস নেতৃত্ব যদি বাংলায় কোনও দাপুটে নেতাকে বিধান ভবনে বসাতে চায়, তা হলে অধীর চৌধুরীর থেকে যোগ্যতর বিকল্প আর কেউ নেই। কিন্তু সর্বভারতীয় রাজনীতির কথা ভেবে সেই পথে নাও হাঁটতে পারেন সোনিয়া গান্ধী-রাহুল গান্ধী। কারণ, অধীর বর্তমানে লোকসভার কংগ্রেস দলনেতা, পিএসি চেয়ারম্যান পদে থাকা অধীরকে বিধান ভবনের চেয়ারে ফেরাতে হলে সংসদে তাঁর দায়িত্ব কাকে দেওয়া হবে, সেই প্রশ্নও উঠতে পারে। আবার আবদুল মান্নান যেহেতু এখন বিধানসভার বিরোধী দলনেতা, তাঁর ক্ষেত্রেও উঠতে পারে একই প্রশ্ন। কারণ, প্রথাগত ভাবে “এক ব্যক্তি এক পদ” রীতি চালু আছে জাতীয় কংগ্রেসে। ফলে এক্ষেত্রেও অ্যাডভান্টেজ প্রদীপ ভট্টাচার্য।

আর এ সবের মধ্যে না গিয়ে দিল্লির হাইকম্যান্ড যদি সংগঠন থেকে অন্য কোনও ”বিকল্প” মুখ তুলে আনতে চায়, তা হলে সেই নেতার পরিচিতি এবং রাজ্যব্যাপী গ্রহণযোগ্যতা কতটা, সেটাও ভেবে দেখার বিষয়। সেক্ষেত্রে সোমেন মিত্রের ঘনিষ্ঠ অমিতাভ চক্রবর্তী বা শুভঙ্কর সরকারদের নাম ভেসে এলেও প্রদেশ সভাপতির দৌড়ে অধীর-মান্নান-সহ বাকিদের কয়েক যোজন দূরে ফেলেছেন প্রদীপ ভট্টাচার্য।