Saturday, April 25, 2026

গোর্খাল্যান্ড : অনেক বিজেপি নেতার মুখেই যেন সেলোটেপ

Date:

Share post:

কিশোর সাহা

আর পাঁচটা বিষয়ে বিজেপির অনেক নেতার মুখে যেন খই ফোটে। অথচ, দার্জিলিংয়ের নেপালি ভাষীদের সিংহভাগের দাবি গোর্খ্যাল্যান্ডকে সমর্থন করেন কি না তা স্পষ্ট করতে বলতে পারেন না কেন তাঁরা! অথবা একদা তৃণমূলের কিং সাইজ নেতা এখন বিজেপিতে সেমি কিং-এর মুকুট পেয়ে খুশিতে উচ্ছ্বসিত মুকুল রায়’ই বা চুপ কেন!

আচ্ছা মুকুলবাবু আপনার মনে পড়ে গোর্খাল্যান্ড করতে দেবেন না বলেই তৃণমূল সরকার গঠনের পরে ঘটা করে চুক্তির সময়ে কি ছোটাছুটিই না করেছিলেন কলকাতা-দার্জিলিংয়ে। রিচমন্ড হিলে বসে বিমল গুরুংয়ের সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা দিতেন মুকুলবাবু। এখন সেই মুকুলবাবু গোর্খাল্যান্ডের প্রশ্নের মুখে যেন সেলোটেপ এঁটেছেন।

আরও অনেক নেতাই আছেন। ধরুন বাবুল সুপ্রিয়। মাননীয় কেন্দ্রীয় মন্ত্রী একবার নিজের সাংসদ এলাকা আসানসোলে দাঁড়িয়ে উচ্চকণ্ঠে বলতে পারবেন, আমি গোর্খাল্যান্ড চাই। অথবা রায়গঞ্জের সাংসদ তথা মন্ত্রী দেবশ্রী চৌধুরী নিজের এলাকায় অথবা শিলিগুড়িতে এসে দৃপ্তকণ্ঠে ঘোষণা করতে পারবেন আমি গোর্খাল্যান্ড গঠনের পক্ষে।

জেলা স্তরের নেতাদের কথাই বা বাদ যাবে কেন! কোচবিহারের বিজেপি সভাপতি মালতি রাভা রাসমেলার মাঠে দাঁড়িয়ে কোনদিন বলতে পারবেন, তিনি বাংলা ভাগ করে গোর্খাল্যান্ডের পক্ষে রয়েছেন। বিজেপির জলপাইগুড়ি জেলা সভাপতি কি কদমতলায় দাঁড়িয়ে বুক ঠুঁকে বলতে পারবেন আলাদা গোর্খাল্যান্ড হলে তিনি খুশি হবেন।

শিলিগুড়ির জেলা সভাপতি প্রবীণ আগরওয়ালের ক্ষমতা আছে হিলকার্ট রোড কিংবা বাঘা যতীন পার্কে দাঁড়িয়ে জোর গলায় চেঁচিয়ে বলবেন, আমি গোর্খাল্যান্ডের পক্ষেই রয়েছি। শিলিগুড়ির ছোটবড়, কুচোকাচা নেতা বা বিজেপির কাউন্সিলররা নিজেদের এলাকায় মাইক নিয়ে গোর্খাল্যান্ডের পক্ষে প্রচার করতে পারবেন!

যদি না পারেন তা হলে হঠাৎ করে দার্জিলিংয়ের সাংসদ হওয়া এক নেতা তথা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার রাজু বিস্ত গোর্খাল্যান্ডের পক্ষে সংসদে সওয়াল করলে প্রতিবাদ করতে পারেন না! যদি না-ই পারেন তা হলে তো দলের মধ্য দ্বন্দ্ব রয়েছে সেটা বলেন না কেন!
এত কথা বলার কারণ হল, গোর্খাল্যান্ডের দাবিকে সামনে রেখে গত কয়েক দশক ধরে যে অনেক রাজনৈতিক দলই খেলা খেলছে তা অনেকেই ধরে ফেলেছেন। এবার বিধানসভা ভোটের আগে সেই খেলা জমে উঠবে।

অতীতে কংগ্রেস, পরে বামেরা এবং হালে তৃণমূল যে পাহাড়ের আলাদা হওয়ার দাবিকে হাতিয়ার করে ভোটের রাজনীতি করেনি তা কিন্তু নয়। তবে ওই প্রতিটি দলই বাংলা ভাগ হবে না এটা ঘোষণা করেই যাবতীয় রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও অন্যান্য লেনদেন করেছে।
বিজেপি এখন আক্রমণাত্মক মুডে আসরে নেমেছে। গোর্খাল্যান্ডের দাবি নিয়ে আলোচনার জন্য মিটিং ডেকে দিচ্ছে। পরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের চাপের মুখে সেটাকে গোর্খাল্যান্ড টেরিটোরিয়া অ্যাডমিনিস্ট্রেশন নিয়ে বৈঠক বলছে। এ সবের উদ্দেশ্য কি তা কি আমজনতা বুঝতে পারছে না!

সব্বাই বুঝতে পারছে। একটা সরলীকরণ হল, দার্জিলিংয়ের তিন বিধানসভা, শিলিগুড়ির সমতলের তিনটি আসন, ডুয়ার্সের ১০টি আসনের নেপালি ভাষীদের ভোট পেলে ১৬টি আসন পাওয়ার ক্ষেত্রে অনেকটা সুবিধা হতে পারে বিজেপির। তার মধ্যে মালবাজার, নাগরাকাটা, জলপাইগুড়ি, বীরপাড়া-মাদারিহাট, কালচিনির মতো অনেকে এলাকাই রয়েছে।

কিন্তু, বিজেপির রাজ্যের নেতারা এটা জানেন, বাংলা ভাগের পক্ষে সওয়াল করলে রাজ্যের বাদবাকি আসনের বাঙালিদের মনে প্রভাব পড়বে। আরেকটা বঙ্গভঙ্গের দায় বিজেপির ওই নেতারা কাঁধে নিতে কোনদিন চাইবেন না। কারণ, বাংলা ভাগের পক্ষে সওয়াল করলে আগামী দিনে বাংলার রাজনীতিতে আদৌ টিঁকে থাকা নিয়ে প্রশ্ন উঠে যাবে।

এটাও মনে রাখা দরকার, রক্ত দেব তবু গোর্খাল্যান্ড দেব না প্রচার করেছিল বামফ্রন্ট। সেই আশির দশকে। তার ফলে বিধানসভা ভোটে ভোটের হাল গোটা বাংলায় কেমন বেড়েছিল পরিসংখ্যানই বলে দেবে। আর অশোক ভট্টাচার্য তো রেকর্ড ভোটে সে সময়ে জিততেন।
এমনিতে গত লোকসভা ভোটের যে হিসেব তাতে শিলিগুড়িতে বিজেপি এগিয়ে রয়েছে। কিন্তু, দার্জিলিঙের মাননীয় সাংসদ গোর্খাল্যান্ডের দাবির পক্ষে যে ভাবে সওয়াল করে চলেছেন তাতে আরও একবার অশোকবাবু রেকর্ড ব্যবধানে জেতার কথা ভাবতেই পারেন।

তাই হঠাৎ উত্তরবঙ্গের রাজনীতিতে উদয় হওয়া রাজু বিস্ত কী বললেন সেটা বড় বিষয় নয় পাহাড় ও সমতলবাসীদের অনেকের কাছেই। বরং, বিজেপির সুবক্তারা রাজু বিস্তের পক্ষে কবে কিছু বলেন সেটাই দেখার বিষয়।

প্রকাশ্যে সমালোচনা করলেও তৃণমূল, কংগ্রেস এবং বামেদের অনেকের কাছেই কিন্তু রাজু বিস্ত ধন্যবাদার্হ। কারণ, আগামী বিধানসভা ভোটের প্রচারে বাংলা ভাগের পক্ষে বিজেপি সাংসদের সওয়াল করার ব্যাপারটা কোন লেভেলে নিয়ে যাওয়া যাবে সেটা ভেবেই তলে তলে কি খুশি তাঁদের অনেকে।

আর বিমল গুরুং-রোশন গিরিরা তাঁদের দাবি-দাওয়া মামলা নিয়ে থেকে যাবেন হয়তো সেই অন্তরালেই।

আরও পড়ুন-নবান্ন অভিযান: অজ্ঞাত পরিচয় বিজেপি কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা পুলিশের

Related articles

শহরের হাসপাতাল থেকে জল জমা সমস্যার সমাধান: ভবানীপুরে বার্তা মমতার

আগামী দুই বছরে শেষ হয়ে যাবে গঙ্গাসাগরের কাজ। শুক্রবার ভবানীপুর থেকে গঙ্গাসাগরের পরিষেবা নিয়ে জানালেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়...

লক্ষ্যমাত্রার পথে অনেকটাই এগোল নবান্ন, রাজ্যে সংগৃহীত ৪৮ লক্ষ টনের বেশি ধান

চলতি খরিফ মরসুমে ধান সংগ্রহে বড়সড় সাফল্যের মুখ দেখল রাজ্য সরকার। শুক্রবার বিকেল পর্যন্ত পাওয়া তথ্যানুযায়ী, রাজ্যের ক্ষুদ্র...

ভোট শেষে স্বচ্ছতা রাখতে ক্যামেরার ছবি সংরক্ষণে এক গুচ্ছ নির্দেশিকা

নির্বাচন শেষে ইভিএম সিল করা নিয়ে ইতিমধ্যেই একাধিক বুথে অভিযোগের তিরে নির্বাচন কমিশন। আবার ওয়েব কাস্টিং পদ্ধতির সুফলও...

যেখানে আশা করিনি সেখানেও জিতবে তৃণমূল, ভবানীপুরের সভা থেকে আত্মবিশ্বাসী নেত্রী

এবারের ভোট এসআইআরের অত্যাচারের বিরুদ্ধে। যেখানে আশা করিনি, সেখানেও জিতব। ভবানীপুরের সভা থেকে দৃঢ় কণ্ঠে জানালেন নেত্রী মমতা...