Friday, January 30, 2026

স্বপ্নের পদ্মা সেতু এখন বাস্তবে, পূর্ণ হল হাসিনা সরকারের আরেকটি অঙ্গীকার

Date:

Share post:

খায়রুল আলম (ঢাকা) : দেশের দক্ষিণ জনপদের মানুষের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণে যে বিপুল কর্মযজ্ঞের সূচনা হয়েছিল পদ্মার পাড়ে, তা পূর্ণ অবয়ব পেল বৃহস্পতিবার। বেলা ১২টা ২ মিনিটে সেতুর মাওয়া প্রান্তের ১২ ও ১৩ নম্বর খুঁটির ওপর বসে গেল টু-এফ নম্বর স্প্যানটি। আর এর মধ্য দিয়ে ৬.১৫ কিলোমিটার এই সেতুর পুরো মূল কাঠামো দৃশ্যমাণ হল। তৈরি হল রাজধানীর সঙ্গে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের ২১ জেলার সরাসরি সড়ক যোগাযোগের পথ।

পদ্মা সেতুর নির্বাহী প্রকৌশলী দেওয়ান মো. আব্দুর কাদের জানান, এরপর দ্বিতল এই সেতুর ঢালাইয়ের কাজ, অ্যাপ্রোচ রোড ও ভায়াডাক্ট প্রস্তুত করা, রেলের জন্য স্ল্যাব বসানো হয়ে গেলেই স্বপ্নের পদ্মাসেতু যানবাহন চলাচলের উপযোগী হবে। এক বছরের মধ্যেই সেতুটি চালু করা যাবে বলে ইতিমধ্যে আশা প্রকাশ করেছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। এই মাহেন্দ্রক্ষণ ঘিরে পদ্মাপাড়ে ছিল উৎসবের আমেজ। কেবল পদ্মার দুই তীরের বাসিন্দারা নন, ঢাকা থেকেও অনেকে আসেন সেতুর শেষ স্প্যানটি বসানোর কাজ নিজে চোখে দেখতে। নৌকা, ট্রলার ও স্পিডবোট ভাড়া করে তারা নদতে কাছাকাছি জায়গায় অবস্থান নেন। শেষ স্প্যানটি বসানো হয়ে গেলে উল্লাস প্রকাশ করেন তারা।

নির্বাহী প্রকৌশলী দেওয়ান মো. আব্দুর কাদের জানান, গত শুক্রবার পদ্মা সেতুর ৪০তম স্প্যান স্থাপনের মধ্য দিয়ে ছয় কিলোমিটার দৃশ্যমান হয়। ৪১তম স্প্যানটি বসাতে বুধবারই সব প্রস্তুতি নিয়ে রাখা হয়। ৩২০০ টন ওজনের ১৫০ মিটার দীর্ঘ স্প্যানটি মাওয়ার কুমারভোগের কন্সট্রাকশন ইয়ার্ড থেকে নিয়ে ১২ ও ১৩ নম্বর খুঁটির কাছে পৌঁছে যায় ভাসমান ক্রেইন ‘তিয়ান ই’। বৃহস্পতিবার সকাল ৯টায় হালকা কুয়াশার মধ্যেই ইঞ্চি মেপে শুরু হয় স্প্যান স্থাপনের কাজ।

বেলা ১২টা ২ মিনিটে সেই কাজ শেষ হলেই মুন্সিগঞ্জের মাওয়া থেকে শরীয়তপুরের জাজিরা পর্যন্ত পদ্মার এপার-ওপার যুক্ত হয়। যে ৪১টি স্প্যান দিয়ে পুরো পদ্মা সেতু তৈরি হচ্ছে, তার মধ্যে জাজিরা প্রান্তে ২০টি বসানো হয়েছে, আর মাওয়া প্রান্তে বসানো হয়েছে ২০টি স্প্যান। একটি স্প্যান বসেছে মাওয়া ও জাজিরা প্রান্তের মাঝখানে। দ্বিতল এই সেতুতে স্প্যানের ওপর কংক্রিটের স্ল্যাব বসানোর কাজ শেষ হলেই পিচ ঢালাই হবে।

২২ মিটার প্রশস্ত এই সেতুতে চারটি লেইনে যানবাহন চলতে পারবে। আর নীচ দিয়ে এক লাইনে চলবে ট্রেন। ওই এক লাইনেই মিটারগেজ ও ব্রডগেজ- দুই ধরনের ট্রেন চলাচলের ব্যবস্থা হচ্ছে। স্থানীয় সংসদ সদস্য অধ্যাপিকা সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলি বলেন, “নিজস্ব অর্থায়নে এই সেতু নির্মাণ করে বাঙালি বিশ্বর সামনে নিজেদের সক্ষমতার জানান দিল। এর মূলে রয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রজ্ঞাপূর্ণ সিদ্ধান্ত।” এই সেতু বাস্তবায়নের জন্য যাদের ত্যাগ, শ্রম, ঘাম রয়েছে, তাদের সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, “এই সেতুর সুফল ভোগ করবে পুরো জাতি।”

১৯৯৮ সালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় থাকার সময়ই পদ্মা সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। কিন্তু তা শুরু হতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় ফিরে পুনরায় পদ্মা সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। প্রকল্পে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার ঋণ সহায়তার প্রস্তাব নিয়ে আসে বিশ্ব ব্যাংক। কিন্তু বনিবনা না হওয়ায় পদ্মা সেতু প্রকল্পের বাস্তবায়ন বিলম্বিত হতে থাকে। ২০১০ সালের জুলাইয়ে সেতু নির্মাণের জন্য প্রাক-যোগ্যতা দরপত্র মূল্যায়ন করে পাঁচ দরদাতাকে বাছাই করে তা বিশ্ব ব্যাংকের অনাপত্তির জন্য পাঠানো হলেও সংস্থাটি তা ঝুলিয়ে রাখে। এরপর পদ্মা সেতুতে ‘সম্ভাব্য দুর্নীতির’ অভিযোগ আনে বিশ্ব ব্যাংক। দীর্ঘ টানাপড়েন শেষে বাংলাদেশ বিশ্ব ব্যাংককে ‘না’ বলে দেয়। শেষ পর্যন্ত নকশা অপরিবর্তিত রেখে নিজস্ব অর্থায়নেই পদ্মা সেতু নির্মাণের ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে শুরু হয় সেই বিপুল কর্মযজ্ঞ।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে মূল সেতুর নির্মাণ ও নদী শাসন কাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। এরপর ২০১৭ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর ৩৭ ও ৩৮ নম্বর খুঁটিতে বসানো হয় প্রথম স্প্যান। মোট ৪২টি পিলারে ১৫০ মিটার দৈর্ঘ্যের ৪১টি স্প্যান বসিয়ে ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ পদ্মা সেতুর মূল কাঠামো তৈরি হয়। কিন্তু মাঝে ২২টি খুঁটির নিচে নরম মাটি পাওয়া গেলে নকশা সংশোধনের প্রয়োজন হয়। পরে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নকশা সংশোধন করে পাইল বাড়িয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত দেয়। তাতে বাড়তি সময় লেগে যায় প্রায় এক বছর। এরপর করোনাভাইরাস মহামারী আর বন্যার মধ্যে কাজের গতি কমে যায়। সব বাধা পেরিয়ে অক্টোবরে বসানো হয় ৩২তম স্প্যান। এরপর বাকি স্প্যানগুলো বসানো হয়ে যায় অল্প সময়ের মধ্যেই। ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি টাকার এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে মোংলা বন্দর ও বেনাপোল স্থলবন্দরের সঙ্গে রাজধানী এবং বন্দরনগরী চট্টগ্রামের সরাসরি যোগাযোগ স্থাপিত হবে। তাতে মোট দেশজ উৎপাদন এক দশমিক দুই শতাংশ বাড়বে এবং প্রতি বছর শূন্য দশমিক ৮৪ শতাংশ হারে দারিদ্র্য কমবে বলে সরকার আশা করছে।

আরও পড়ুন-‘প্ল্যান করেই হামলার নাটক’, মেয়ো রোডের সভায় মমতার নিশানায় বিজেপি

spot_img

Related articles

দুদিনের সফরে শহরে শাহ: ‘জিতবই’ বার্তা দলীয় কর্মীদের

বাংলায় নির্বাচন শুরুর ঘণ্টা বাজার আগেই রাজনৈতিক ডেইলি প্যাসেঞ্জারিতে বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বরা। প্রতি সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রী, সভাপতি থেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর...

কমিশনের জন্য পেশায় টান: হাই কোর্টের দ্বারস্থ LIC কর্মীরা, ব্যাখ্যা তলব আদালতের

রাজ্যের কর্মীদের পরে এবার কেন্দ্র সরকারের কর্মীরাও এসআইআর-এর অপরিকল্পিত পদক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন তুললেন। পর্যবেক্ষক পদে নিযুক্ত এলআইসি (LIC)...

রাজ্য পুলিশের নতুন ডিজি পীযূষ পাণ্ডে, রাজ্যজুড়ে পুলিশ আধিকারিকদের ব্যাপক রদবদল

নির্বাচনের আগে রাজ্য পুলিশের গুরুত্বপূর্ণ সব পদে রদবদলের ঘোষণা হল শুক্রবার। রাজ্য পুলিশের ডিজি রাজীব কুমারের অবসরগ্রহণের আগেই...

মাধ্যমিকের আগে অ্যাডমিট বিভ্রাট: কড়া পদক্ষেপ হাইকোর্টের

মাধ্যমিক পরীক্ষার আগে অ্যাডমিট কার্ড নিয়ে বিভ্রাট নতুন নয়। এবছরও তার ব্যতিক্রম হল না। ফের একবার কলকাতা হাই...