খাদ্যরসিক হওয়া ভালো, তবে খাই আর খাঁইয়ের পার্থক্য জরুরি

সঞ্জয় সোম

আমি পেটুক মানুষ। খাদ্যরসিকদের সঙ্গ পেলেই মনটা কেমন যেন খাই খাই করে ওঠে। খাঁই খাঁই নয় কিন্তু – ওই এক চন্দ্রবিন্দু পুরো চরিত্র খেয়ে নেয়। যেমন কারো টাকার খাঁই, কারো কামের খাঁই, কারো নাম-যশের খাঁই, কারো বা আবার ক্ষমতার খাঁই। তারা খাঁই খাঁই করেন আর আমরা পেটুকরা খাই খাই করি – বাকি তাদের আর আমাদের তৃপ্তি-অতৃপ্তির ব্যাপারটা খানিকটা এক হলেও, ফলাফল সম্পূর্ন ভিন্ন। পার্থক্যটা কী রকম জানেন? উপনিষদ বলেছে ত্যাগেনৈকে অমৃতত্বমানশুঃ অর্থাৎ ত্যাগের মাধ্যমেই মানুষ অমৃতত্ব লাভ করতে পারে। স্বামীজি তো আবার এককাঠি এগিয়ে গিয়ে বলেছেন, ত্যাগেনৈকেন অমৃতত্বমানশুঃ, অর্থাৎ একমাত্র ত্যাগের মাধ্যমেই অমৃতত্ব লাভ করা সম্ভব। ঠাকুর বলতেন সন্ন্যাসীর ক্ষেত্রে সেই ত্যাগ ভেতরে ও বাইরে এক হওয়া চাই। গৃহীর ক্ষেত্রে শুধুই ভেতরে। মহা গোল বা‌ধিয়েছিলেন বুদ্ধদেবের চ্যালারা। যাদের খাঁই আছে তাদেরও ধরে ধরে নিয়ে গিয়ে সন্ন্যাসী করে দিয়ে। যাদের আধারই নেই তাদের মাথায় তুলে ব্যভিচারে ছেয়ে গিয়ে পুরো সমাজটা অধঃপতে যাচ্ছিল। শঙ্করাচার্য্য এসে শেষে আমাদের বাঁচালেন। খাদ্যরসিক হওয়া অখাদ্যরসিক হওয়ার চেয়ে ঢের ভালো মশাই। তাই কাশীগামী এমনই এক রসিকজন যখন ওখানে গিয়ে কী খাবেন জানতে চাইলেন, মন খুলে খাদ্যজ্ঞান বিতরণ করা গেল। বললুম কচুরি সবজি জিলিপি তো খাবেনই, তার সাথে ছানা দই বড়া, কুল্লরে মাখন মালাইও দুধ, চূড়া-মটর, ঠান্ডাই, বাটি চোখা, রাবড়ি, রসমালাই, সংকটমোচন কে লাড্ডু এবং অবশ্যই সাদা দই। বলতে বলতে আমার নিজের জিভেই জল। তারপর মনে পড়লো পেটে ছাড়া পিঠেও কিছু খাওয়ার বিষয়ে সুকুমার রায় যা লিখেছিলেন, খানিকটা খাঁই আর খানিকটা খাইয়ের অদ্ভুত মিশ্রণ ঘটিয়ে, সেটাও বিবেচ্য বটে:

সবে হল খাওয়া শুরু, শোন শোন আরো খায়-
সুদ খায় মহাজনে, ঘুষ খায় দারোগায়।
বাবু যান হাওয়া খেতে চড়ে জুড়ি-গাড়িতে,
খাসা দেখ ‘খাপ্‌ খায়’ চাপকানে দাড়িতে।
তেলে জলে ‘মিশ খায়’, শুনেছ তা কেও কি?
যুদ্ধে যে গুলি খায় গুলিখোর সেও কি?
ডিঙি চড়ে স্রোতে প’ড়ে পাক খায় জেলেরা,
ভয় খেয়ে খাবি খায় পাঠশালে ছেলেরা;
বেত খেয়ে কাঁদে কেউ, কেউ শুধু গালি খায়,
কেউ খেয়ে থতমত- তাও লিখি তালিকায়।
ভিখারিটা তাড়া খায়, ভিখ্‌ নাহি পায় রে-
‘দিন আনে দিন খায়’ কত লোক হায় রে।
হোঁচটের চোট খেয়ে খোকা ধরে কান্না,
মা বলেন চুমু খেয়ে, ‘সেরে গেছে আর না।’
ধমক বকুনি খেয়ে নয় যারা বাধ্য,
কিলচড় লাথি ঘুঁষি হয় তার খাদ্য।
জুতো খায়, গুঁতো খায়, চাবুক যে খায় রে,
তবু যদি নুন খায়, সেও গুণ গায় রে।
গরমে বাতাস খাই, শীতে খাই হিম্‌সিম্‌,
পিছলে আছাড় খেয়ে মাথা করে ঝিম্‌ঝিম্‌।
কত যে মোচড় খায় বেহালার কানটা,
কানমলা খেলে তবে খোলে তার গানটা।
টোল খায় ঘটি বাটি, দোল খায় খোকারা,
ঘাবড়িয়ে ঘোল খায় পদে পদে বোকারা।
আকাশেতে কাৎ হ’য়ে গোঁৎ খায় ঘুড়িটা,
পালোয়ান খায় দেখ ডিগবাজি কুড়িটা।
ফুটবলে ঠেলা খাই, ভিড়ে খাই ধাক্কা,
কাশিতে প্রসাদ খেয়ে সাধু হই পাক্কা!
কথা শোন, মাথা খাও, রোদ্দুরে যেও না-
আর যাহা খাও বাপু বিষমটি খেও না।
‘ফেল্‌’ ক’রে মুখ খেয়ে কেঁদেছিলে সেবারে,
আদা-নুন খেয়ে লাগো, পাশ কর এবারে।
ভ্যাবাচ্যাকা খেও নাকো, যেয়ো নাকো ভড়কে,
খাওয়াদাওয়া শেষ হলে বসে খাও খড়্‌কে।
এত খেয়ে তবু যদি নাহি ওঠে মনটা-
খাও তবে কচু পোড়া, খাও তবে ঘণ্টা।

আরও পড়ুন- ফুয়াদ হালিমের পরামর্শেই মইদুলের চিকিৎসা? পুলিশি তদন্তে জেরার মুখে সিপিএম নেতা

Advt