“আদালতের বাইরের প্রতিবাদ বিক্ষোভ কী ভাবে বিচার প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলে?”

নারদ-মামলা স্থানান্তরের যে আবেদন CBI করেছে, মঙ্গলবার তার শুনানিতে সলিসিটর জেনারেলকে এই প্রশ্নই করলেন হাইকোর্টের বৃহত্তর বেঞ্চের অন্যতম বিচারপতি ইন্দ্রপ্রসন্ন মুখোপাধ্যায়৷

CBI-এর কৌঁসুলি সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহেতাকে বিচারপতির প্রশ্ন, “আমাদের দেশে ওপেন কোর্টে বিচার হয়। সেখানে এজলাসে যে কেউ হাজির থাকতেই পারেন। কে হাই-প্রোফাইল, কে লো-প্রোফাইল তার ওপর বিচার প্রক্রিয়া নির্ভর করে কি? দেশের সংবিধানে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ এবং বিক্ষোভ দেখানোর কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এটা কী ভাবে বিচার প্রক্রিয়ার উপর প্রভাব ফেলেছে সেটা বলুন।’’

একইসঙ্গে মেহেতাকে বিচারপতি সৌমেন সেন প্রশ্ন করেন, “সে দিন ভার্চুয়াল শুনানি হয়েছে। আইনমন্ত্রী এবং বাকিরা আদালতের বাইরে বিক্ষোভ করেছেন৷ এতে সমস্যা কোথায়? চার্জশিট জমা হয়েছে ভার্চুয়ালি। আপনার কথার যৌক্তিকতা কোথায়?’’


এদিন মামলা-স্থানান্তর নিয়ে দ্বিতীয় দিনের শুনানিতে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহেতা সেই সব পুরোনো কথাই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে টেনে আনেন৷ এদিনও শুনানি শেষ হয়নি৷ বুধবার ফের সওয়াল-জবাব চলবে৷


এদিনের শুনানিতে বিচারপতিদের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে চিলির স্বৈরাচারি প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট পিনোশেতের উদাহরণ টেনে বিচারকদের পক্ষপাতিত্ব এবং নিরপেক্ষতা নিয়ে মন্তব্য করেন মেহেতা৷
মেহেতার বক্তব্য ছিলো, ‘‘পিনোশেতের রায়ে বলা হয়েছে, কোনও রায়ের ক্ষেত্রে তৃতীয় নীতি হল, ওই রায়ের পক্ষে সাধারণ মানুষের ধারণা কি?” মেহেতা বলেন, “বিচারের মূল কথা, বিচারককে শুধু নিরপেক্ষ হলেই হবে না, তাঁকে নিরপেক্ষ দৃষ্টিতেও বিষয়গুলি দেখতে হবে।’’
বিচারপতিদের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে মেহেতা একথা বলা মাত্রই ক্ষুব্ধ ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি রাজেশ বিন্দল মেহতার উদ্দেশে প্রশ্ন করেন, ‘‘আপনি কি বিচারের পক্ষপাতিত্ব নিয়ে কথা বলতে চান?’’

◾মেহতা – ‘‘বিচারকের মনোভাব পক্ষপাতদুষ্ট নাও হতে পারে, কিন্তু বাইরে যেভাবে সেদিন ভয় দেখানো হয়েছে, সে জন্যই পক্ষপাতের বিষয়টি আমি বলেছি।’’

পক্ষপাতের বিষয়টি নিয়ে বিচারপতি ইন্দ্রপ্রসন্ন মুখোপাধ্যায় মেহতাকে জিজ্ঞাসা করেন, “প্রতিবাদ কী ভাবে বিচার প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলছে সেটা বলুন৷ আমাদের দেশে ওপেন কোর্টে বিচার হয়। সেখানে এজলাসে যে কেউ উপস্থিত থাকতেই পারেন। হাই- প্রোফাইল কে, কে লো- প্রোফাইল তার ওপর বিচার প্রক্রিয়া নির্ভর করে কি? দেশের সংবিধানে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ এবং বিক্ষোভ দেখানোর কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এটা কী ভাবে বিচার প্রক্রিয়ার উপর প্রভাব ফেলেছে সেটা বলুন।’’ জবাবে মেহতা বলেন, ‘‘পাবলিক ইন লার্জের কথা বলা হচ্ছে।’’

এই সময় অভিযুক্তদের আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন,”সেদিন কেউ ভিতরে যাননি। এজলাসেও কেউ ছিল না।’’
◾মেহতা – ‘‘আমি শুধু বলছি আদালত শুধু জামিন নিয়েই শুনেছে। বাকি শুনানিই তো হয়নি। একবার ভেবে দেখুন বিশেষ আদালতে মন্ত্রীরা গিয়েছিলেন শুধুমাত্র জামিন করানোর জন্য।’’
◾বিচারপতি আইপি মুখোপাধ্যায়, মেহেতাকে – ‘‘আপনার যদি সে দিনের বিচার পর্ব নিরপেক্ষ বলে না মনে হয়ে থাকে, তাহলে শুনানি থামিয়ে দিতে পারতেন। সওয়াল চালালেন কেন?’’

◾মেহতা- ‘‘স্বয়ং আইনমন্ত্রী হাজার মানুষের সঙ্গে আদালতের বাইরে বিক্ষোভ দেখালো সেদিন, বিচারক প্রভাবিত না হলেও সাধারণ মানুষের মনে হবে এই জামিন বাধ্য হয়ে দেওয়া।’’ মেহেতা বলেন, “১৭ মে, গ্রেফতারের দিন, বিচারকের ওপর চাপ ছিল। বিচারক জানতেন, অভিযুক্তদের তাঁর সামনে হাজির করানো যাবে না। সমস্ত জাতীয় সংবাদমাধ্যমে দেখা গিয়েছে,CBI দফতরে মুখ্যমন্ত্রী পৌঁছেছেন। বাইরে বিক্ষোভ হচ্ছে। আদালতে আইনমন্ত্রী হাজির। এতে তো বিচারকের ওপর মানসিক চাপ হতেই পারে। যা বিচার প্রক্রিয়া প্রভাব পড়তে পারে।

◾বিচারপতি আই পি মুখোপাধ্যায় – “আমাদের দেশে যে কোনও সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ন বিক্ষোভ দেখানোর অধিকার মানুষের আছে। তাহলে বিচারক কিভাবে প্রভাবিত হবেন ?”
◾মেহেতা – “বিক্ষোভ, ধরনা, রাজ্যের মন্ত্রীদের উপস্থিতি, চাপের রাজনীতি, এসব থেকে মাননীয় বিচারক নিজেকে বিচ্ছিন্ন রাখতে পেরেছিলেন কিনা সেটা নিয়ে মানুষের মনে প্রশ্ন থাকতে পারে। বিচারকের রায় পক্ষপাতদুষ্ট না হয়ে থাকলেও মানুষের মনে প্রশ্ন থাকতে পারে। তবে এটা থেকে কখনই এই সিদ্ধান্তে আসা যায় না যে, বিচারক পক্ষপাতদুষ্ট। কিন্তু সুবিচার শুধু করলেই হবে না, সুবিচার যে হয়েছে সেটা যেন মানুষ উপলব্ধি করতে পারেন।”
◾বিচারপতি সৌমেন সেন – “মামলার শুনানি রুদ্ধদ্বার কক্ষে হয়েছে এবং ভার্চুয়ালি হয়েছে। তাহলে বিচারককে প্রভাবিত করার সুযোগ কিভাবে হলো ?”
◾মেহেতা – “হাজার হাজার মানুষ পাথর ছুঁড়ছেন, মুখ্যমন্ত্রীধরনায় ধর্নায় বসে আছেন। আমরা কি করব, অফিসাররা কি করবেন?”
এদিনের নারদ মামলা স্থানান্তর নিয়ে
সওয়ালে CBI টেনে আনে সারদা মামলায় মদন মিত্রের গ্রেফতারির প্রসঙ্গ। একইসঙ্গে পুলিশ কমিশনার থাকাকালীন রাজীব কুমারের বাংলোয় CBI পৌঁছনোর পর যে ধর্না চলেছিল, সেই প্রসঙ্গও তুলে ধরে তুষার মেহতা বোঝানোর চেষ্টা করেন এ রাজ্যে এটা লজ্জার ইতিহাস৷ মেহেতার বক্তব্য, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বা প্রভাবশালীরা গ্রেফতার হন। কিন্তু, কোথাও গ্রেফতারিকে কেন্দ্র করে CBI অফিসারদের আটকে রাখা, ধরনা-বিক্ষোভ, ইট ছোড়াছুড়ির ঘটনা ঘটে না।
CBI এই প্রসঙ্গ টানতেই পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চ মেহেতাকে পাল্টা প্রশ্ন করে বলেন, পুরনো যেসব ঘটনার উদাহরণ দিচ্ছেন, সেসব এখন কতটা প্রাসঙ্গিক? পাশাপাশি যদি ওই সমস্ত ধরনা-বিক্ষোভে ধৃতদের কোনও হাত না থাকে, তাহলে তাঁদের জামিনে বাধা কোথায়? ”
বুধবার ফের শুনানি হবে৷
আরও পড়ুন:আইনি বিপাকে হু-এর প্রধান বিজ্ঞানী, নোটিশ পাঠালো আইবিএ