Happy Mother’s Day: মা

কলকাতার এক মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে ঈলীনার স্কুলবেলা থেকেই ছবি আঁকায় হাতেখড়ি।

এই একটা শব্দের ম্যাজিক ব্রহ্মাণ্ড জুড়ে। এই ‘ডাক’-এর সঙ্গে জুড়ে আমাদের অস্তিত্ব। মা’দের জন্য বরাদ্দ বিশেষ একটি দিন তাই নিছকই আলঙ্কারিক। কারণ রোজকার যত হাসি, যত রাগ, যত অভিমান, যত ঝগড়া এবং নো আপস আর হাজার দাবি-দাওয়া যার কাছে, সে আমাদের মা! মাকে ছাড়া শুধু বাড়ি নয়, জীবনটাও খালি খালি লাগে। উল্টোদিকে, জ্বালিয়ে পুড়িয়ে যারা নাকি জীবনটা অতিষ্ঠ করে দেয়, তাদের জন্যই দিন-রাত দুনিয়ার দুর্ভাবনা মায়েদের! সন্তান হল নাড়ির টান। ‘মা’ হওয়া নারীর পূর্ণতা! আজ আন্তর্জাতিক মাতৃদিবসে ভিন্ন মেরুর দুই নারীর ‘সিঙ্গল মাদার’ হয়ে ওঠার লড়াইয়ের কথা শুনলেন প্রীতিকণা পালরায়

ঈলীনা বণিক
চিত্রশিল্পী

কলকাতার এক মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে ঈলীনার স্কুলবেলা থেকেই ছবি আঁকায় হাতেখড়ি। বিশ্বভারতীর কলাভবন থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে গ্লাসগো স্কুল অফ আর্টস-এ ছবি ও উপস্থাপনা শিল্প নিয়ে পড়াশোনা করেন তিনি। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সংমিশ্রণে স্বকীয় এক শিল্পধারা সৃষ্টি করেছেন ঈলীনা। দেশ-বিদেশে একাধিক প্রদর্শনী হয়েছে তাঁর। লিখেছেন একাধিক বইও। প্রেম ভেঙেছে। ভেঙেছে বিয়েও। কিন্তু ঠিক যে বয়স থেকে শরীরে হরমোনের রহস্য-খেলা শুরু হয়েছিল, তখন থেকেই ঈলীনা মা হতে চেয়েছিলেন। আর সেটা নিজের শর্তেই। আইভিএফ-এর মাধ্যমে এই শহরে নিজের পছন্দের পুরুষের ঔরসে মা হয়েছেন ঈলীনা। ঈলীনার মেয়ে অমরাবতী। বয়স দশ।

আপনার কাছে মাতৃত্বের সংজ্ঞা কী?
ঈলীনা : একজন মেয়ের জীবনের পূর্ণতা আসে মাতৃত্বের মধ্যে দিয়ে। এটা অনুভূতি। আর ফিমেল সেক্সুয়ালিটির পরিপূর্ণতা আসে মাতৃত্বের মধ্যে দিয়ে। এটা বিজ্ঞান। আমার চোখে অন্তত তাই। আর ‘মা’ হওয়ার পরের জার্নিটা যেমন মাতৃত্ব, তেমনই কনসিভ করা বা গর্ভাবস্থায় সন্তানধারণ ও লালন সেটাও মাতৃত্ব। পুরোটা আমার কাছে একটা পেন্টিং তৈরি বা ভাস্কর্য গড়ার মতোই সুন্দর ফিলিং। তাই আমার কাছে ‘মাতৃত্ব’ অপূর্ব একটা অনুভূতি, দুর্দান্ত একটা আবেগ।
আমাদের সমাজে বিয়ের সঙ্গে মাতৃত্বের একটা ওতপ্রোত যোগাযোগ আছে। কন্যা-জায়া-জননী, মেয়েদের একটা চিরকালীন অতি পরিচিত জার্নি। সেটাকে আপনি কী চোখে দ্যাখেন?


ঈলীনা : আমার মতে এই যোগাযোগটা বাধ্যতামূলক হওয়া বাঞ্ছনীয় নয়। আর চিরকালীন বলেও কিছু হয় না। আগে মেয়েরা সাবলম্বী ছিল না, তাদের শিক্ষার হার কম ছিল। এখন একটা ছেলে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে যে লড়াইটা লড়ে, একজন মেয়েকেও সেটা লড়তে হয়। ফলে মেয়েদের ক্ষেত্রেও বিয়ে করা বা মা হওয়াটা প্রায়োরিটি থাকে না। অনেক ক্ষেত্রে এক সন্তান হওয়ার কারণে তাকেও সংসারের দায়িত্ব নিতে হয়। সব মিলিয়ে সাবেক আমলে যা পরিচিত ছবি ছিল, হাল আমলে তার পরিবর্তন হয়েছে। আরও হবে। তাই বলে একজন মেয়ের ‘মা’ হওয়ার সাধ হবে না তা তো নয়। বিজ্ঞান যখন সে সুযোগ এনে দিয়েছে, তার সাহায্যে প্রথাগত সিস্টেমের মধ্যে দিয়ে না গিয়েও আইনস্বীকৃত ভাবে একজন মেয়ে নিজের ইচ্ছায় মা হতেই পারে। আমার চোখে এটা ভীষণ স্বাভাবিক।


আপনার কথায় আসি। আপনার ‘মা’ হয়ে ওঠার জার্নিটা বলুন।
ঈলীনা : দেখুন, আমার কেন জানি না, একদম ছোট্ট বয়স থেকেই ‘মাদারলি ইন্সটিঙ্কট’ ভীষণ ভাবে ছিল। সামাজিক অনুশাসন না থাকলে আমি হয়তো টিন-এজ-এই ‘মা’ হয়ে যেতাম। কিন্তু তখন তো আমি ফিনান্সিয়ালি ইন্ডিপেনডেন্ট ছিলাম না। তাই সে সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে পারিনি। নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য সবার আগে নিজের অর্থনৈতিক দিকটা নিশ্চিত করতে হয়। তাই অপেক্ষা করতে হয়েছিল। যখন নিজে প্রতিষ্ঠিত হলাম তখন ‘মা’ হওয়ার কথা ভাবলাম। কিন্তু সে জার্নিটা সহজ ছিল না।


কেন?
ঈলীনা : কারণ যে মানুষটাকে আমি ঘটনাচক্রে বিয়ে করেছিলাম, নিজের ভেতর থেকেই ফিল করতাম তার বাচ্চার মা আমি হতে চাই না। কারণ তার সঙ্গে একটা ইন্টেলেকচুয়াল ডিফারেন্স আমার ছিল প্রথম থেকেই। শেষ অবধি বিয়েটা টিকলও না। কিন্তু ডিভোর্স হয়ে গেলেও ‘মা’ হওয়ার ইচ্ছেটা তো দমে যায়নি। তখন ডিসাইড করি, আমি ‘একাই’ মা হব। কিন্তু সেখানেও বাধা। আমরা মুখে যতটা আধুনিকতা দেখাই আসলে ততটা নই। এক ডাকে চিনবেন কলকাতার এমন ডাক্তারদের অনেকে রাজি হননি ডিভোর্সি একজন ‘একা’ মেয়েকে ‘মা’ বানাতে। বলেছিলেন, বিয়ে করে আসতে!


তারপর?
ঈলীনা : দেখুন, এমন নয় যে বিয়ে করে মা হতে আমার আপত্তি ছিল। বিয়ে তো আমি একবার করেছিলাম। কিন্তু প্রপার কেমিস্ট্রি যে সম্পর্কে ওয়ার্ক করে না সেখানে আমি মা হতে চাই নি। আমি অন্য ডাক্তারদের কাছে হেল্প চেয়েছিলাম। আইভিএফ-এর মাধ্যমে ‘মা’ হতে। তো এবার একজন জানালেন, ‘মা’ হতে পারি কিন্তু ‘আননোন ডোনার’-এর থেকে আমায় স্পার্ম নিতে হবে। আমার আবার তাতে প্রবল আপত্তি ছিল! আমি চেয়েছিলাম এমন কারও থেকে আমি স্পার্ম নেব যিনি বেশ বিদ্যান, বুদ্ধিমান হবেন! সেরকম একজনকে আমি আমার ইচ্ছার কথা বলেছিলাম। তিনি আমার ইচ্ছাকে সম্মান দিয়ে ও বিজ্ঞানটা জেনে রাজিও হয়েছিলেন, কিন্তু ডাক্তার রাজি হলেন না। ফলে ব্যাপারটা মেটিরিয়ালাইজ করল না। এর মধ্যে নানা কারণে সেই মানুষটির সঙ্গে আমার দূরত্ব হওয়ায় আমি ব্যাপারটা থেকে সরে আসি কিন্তু ‘মা’ হওয়ার লক্ষ্য থেকে সরি না।


পুরো ব্যাপারটা তবে ম্যাচিউর করল কীভাবে?
ঈলীনা : আমি অন্য আরেকজন পছন্দের মানুষকে বিষয়টা বোঝাতে পেরেছিলাম। তাঁকে নিয়ে ফের আমি আরও একজন ডাক্তারের কাছে যাই এবং তিনি ফাইনালি রাজি হন। এর পরটাও কিন্তু সহজ হয়নি খুব। কারণ একবার মিসক্যারেজ ও আরেকবার অন্য একটা জটিলতায় দু’বার অসফল হওয়ার পর, তিনবারের চেষ্টায় অমরাবতী জন্মায়। মাঝে অনেকগুলো বছর অকারণে নষ্ট হয়েছিল।


যেহেতু সিঙ্গল মাদার হওয়া সত্ত্বেও আপনি জানেন আপনার সন্তানের বাবা কে, তাঁর তরফ থেকে পিতৃত্ব দাবির আশঙ্কা হয়নি?

ঈলীনা : না, হয়নি। কারণ সেটুকু বিশ্বাস ছিল। আজও আছে। দেখুন, সন্তানের মা হতে গেলে বিজ্ঞান বলছে একজন পুরুষের স্পার্ম প্রয়োজন।
আমার আবেগ থাকতে পারে, মনের ঐকান্তিক ইচ্ছে থাকতে পারে, অর্থনৈতিক ক্ষমতা থাকতে পারে, কিন্তু আমার নিজের কাছে স্পার্ম তো থাকতে পারে না! আমাকে তার জন্য একজন পুরুষের ওপর নির্ভরশীল হতেই হবে। তাই যিনি আমাকে বুঝেছেন, তাঁকে বোঝা বা তাঁর বিশ্বাস রাখা আমার তরফেও কাম্য, তাই না?

পারিবারিক সাপোর্ট কেমন ছিল? মানে, আপনার বাবা-মা?
ঈলীনা : পারিবারিক সাপোর্ট এসবে এখনও থাকে না! আমারও ছিল না। বাবা তখন বেঁচে ছিলেন না। মা রাজি হননি প্রথমে তবে আমি প্রাপ্তবয়স্ক স্বাধীন নারী, আমার জেদের কাছে শেষ অবধি হার মেনেছিলেন মা।
অমরাবতী এখন কোন স্কুলে পড়ে? কোন ক্লাস?
ঈলীনা : ও লা মার্টিনিয়ার ফর গার্লস-এ পড়ে। ক্লাস ফাইভ এখন।
যে লড়াইটা একা ‘মা’ হওয়ার জন্য লড়েছিলেন সে লড়াই কি এখনও জারি?
ঈলীনা : লড়াই তো অবশ্যই জারি। আমাদের সমাজে একা মেয়ের লড়াই যতটা কঠিন। একা মায়েদের লড়াই তার চেয়েও কঠিন। বাবা-মা’র যুগ্ম দায়িত্ব সিঙ্গল মাদারদের একা পালন করতে হয়। কেরিয়ার স্যাক্রিফাইস করতে হয় প্রচুর। সেই সঙ্গে আমার মায়ের রিসেন্টলি ম্যালিগন্যান্সি ধরা পড়েছে, তো মায়ের চিকিৎসা, মেয়ের পড়াশোনা, সব মিলিয়ে খুবই জেরবার অবস্থা। একজন আমার মা আর আমি একজনের মা। কাউকেই তো আমি ছাড়তে পারব না। লড়াইটা চালিয়ে যাচ্ছি। আবার মাতৃত্ব উপভোগও করছি।
অমরাবতী তো এখন একটু বড় হয়েছে। জানতে চায় না, বাকি বন্ধুদের মতো ওর বাবা নেই কেন?
ঈলীনা : আমি ওকে ওর মতো করে সবটা বলেছি। ও জানে। আরও বড় হলে আরও ক্লিয়ার হবে। ও বরং বলে, ওর দুটো মা। আমি আর আমার মা!

কালীদাসী হালদার
রিটায়ার্ড সরকারি অফিসার

মুর্শিদাবাদের প্রত্যন্ত গ্রামে জন্ম কালীদাসী হালদারের। এমন গ্রাম যেখানে মেয়েদের শিক্ষার চলই তেমন ছিল না। পাঁচ বছর বয়সে জেদ করে পাঠশালায় ভর্তি হওয়া থেকে ডব্লুবিসিএস অফিসার হয়ে ওঠার জীবনটা নিয়ে অনায়াসেই একটা পূর্ণদৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্র বানানো যায়। এসবের সঙ্গে বাবা-মা-চার ভাই সহ পুরো পরিবারের দায়িত্ব পালনের ফাঁকে নিজের জন্য সময় গড়িয়ে গিয়েছিল কখন, খেয়াল হয়নি। ঠিকঠাক তিপ্পান্ন বছর বয়সে ফের সেই জেদের হাত ধরেই আইভিএফ-এর মাধ্যমে সিঙ্গল মাদার হওয়া। কালীদাসীর মেয়ে কথাকলি। বয়স আট বছর।

আমাদের সোশ্যাল স্ট্রাকচার বলে, বিয়ে, বিয়ের পরে মা। আর এর সঙ্গে আমি বিয়ে করতে চাই না কিন্তু মা হতে চাই, এই দুইয়ের মাঝে কমন ফ্যাক্টর হল ‘মা’ হওয়া। বাকি কী কী আলাদা?
কালীদাসী : ‘মা’ যিনি তিনি ‘মা’। স্বামীর সঙ্গে সংসার করে মা হওয়া আর আমি যে একা একজন মহিলা হিসেবে, কোনওদিন কোনও পুরুষ সঙ্গ না করে আইভিএফ-এর মাধ্যমে ‘মা’ হয়েছি, দুইয়ের মধ্যে মাতৃত্বের স্বাদের কোনও হেরফের হতে পারে না। বরং দায়িত্ব অনেক বেশি থাকে কারণ প্রথম থেকে এটা জেনেই আমি এগিয়েছি যে তাকে আমায় মায়ের স্নেহ, বাবার ভালবাসা— দুইই দিতে হবে। এখন সমাজ কী ভাবছে এই একা মা হওয়া নিয়ে তা সবটা আমি বলতে পারব না। শুধু এটুকু জানি, আমার দেশের আইন আমার মাতৃত্বকে স্বীকৃতি দেয়। তবে এটা বলতে পরি, স্ট্রাকচারের বাইরে বেরিয়ে কিছু করতে গেলে যারা প্রথম দিকে কাজটা করে, তাদের একটু বেশি প্রতিবন্ধকতা ফেস করতে হয়। এটা সব ক্ষেত্রেই। তাই মাতৃত্বের স্বাদ এক হলেও ভাবনা আলাদা হতেই পারে। আর এই ভাবনা আলাদা হওয়ার কারণ পরিবেশ, সামাজিক অবস্থান, শিক্ষাগত যোগ্যতা সব মিলিয়ে। তবে ব্যতিক্রমও হয়।
কীরকম?
কালীদাসী : আমি নিজে যেমন মুর্শিদাবাদের প্রত্যন্ত গ্রামের মেয়ে। সেখানে মেয়েদের পড়াশোনার কথা ভাবাই হত না। এখনও যে খুব কিছু গুরুত্ব পায় তা নয়। এবার এরকম জায়গার মানুষদের তো ধারণা করা সম্ভবই নয় যে বিজ্ঞান এতটা এগিয়ে গিয়েছে যে ল্যাবরেটরিতে বাচ্চা তৈরি করে মায়ের দেহে প্রতিস্থাপন করা হয়। আমার নিজের মা’ই আমায় প্রথমে বিশ্বাস করেননি। ভেবেছেন মেয়ে কলকাতায় একা থাকে, না জানি কী অঘটন ঘটিয়েছে। আমি নিজেও ওই গ্রামেই বড় হয়ে ওঠার পরও কীভাবে এই জেদ পেলাম, জানি না। আবার এই যে কলকাতার সব মানুষ, তারা তো এত উন্নত জায়গায় বাস করে, নিজের অভিজ্ঞতায় দেখেছি, আইভিএফ-এর নাম শুনলেও সে সম্বন্ধে স্বচ্ছ ধারণা বেশিরভাগেরই নেই। এ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা বা লেখালিখিই বা ক’টা হয়? মানুষ জানবেই বা কী করে?
আপনার কি মনে হয়, চেনা সামাজিক কাঠামোয় প্রভাব পড়তে পারে তাই এর ব্যাপক বা বহুল প্রচার নেই?
কালীদাসী : এটা যদি হয়ে থাকে তবে ঠিক নয়। বেশির ভাগ মেয়েই স্বাভাবিক ছন্দে জীবন এগোতে পছন্দ করে। কিন্তু যাদের তা এগোয় না। নানা প্রতিবন্ধকতা থাকে জীবনে তাদের জন্য অন্তত এই প্রচারটা হওয়া দরকার। তারাও সমাজেরই অঙ্গ। জীবন সবাইকে সমান সুযোগ দেয় না। কাউকে বাধ্যতামূলকভাবে সংসারের দায়িত্ব নিতে হয়েছে। কারও খুব কম বয়সে স্বামী মারা গেছে, আর সে বিয়ে করেনি। কারও দুর্ঘটনায় স্বামী-সন্তান দুই-ই মারা গেছে। এরকম আরও অনেক কিছু। তাদের মাতৃত্বের সুপ্ত বাসনা যেন প্রাণ পায়, সেটা ভাবা উচিত ব্যাপক ভাবে।


আপনার কথা বলুন। জীবনের কোন পর্যায়ে এসে ঠিক করলেন আপনি একাই মা হবেন?
কালীদাসী : দেখুন, আমার বাবা-মা আমাকে পড়াশোনাই করাতে চাননি। আমি পাশের বাড়ির কয়েকটা ছেলেকে বই পড়তে দেখে ভীষণ কান্নাকাটি করায়, বাধ্য হয়ে বাবা ওই বইটা কিনে দিয়েছিলেন, যার নাম বর্ণপরিচয়! আমার বাড়িতে কেউ লেখাপড়া জানত না। পাশের বাড়ির একজন বউ পড়তে পারত, তার কাছে অ আ শেখা। এরপর পাঁচ বছর বয়সে আমার জেদে গ্রামের অবৈতনিক স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছিলেন মা। ক্লাস ফোরে বৃত্তি পেলাম। ফের কেঁদে কেটে ক্লাস ফাইভে ভর্তি হলাম। এইভাবেই জোর করে, জেদ করে মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক পাশ। বিএ পাশ করার আগেই এক্সচেঞ্জ থেকে কল পেয়ে ক্লার্ক কালেক্টরেট-এর চাকরি পেলাম। এরপর পরীক্ষা দিয়ে বিডিও অফিসে পোস্ট পেলাম। আমার সব কথা জেনে ওই বিডিও অফিসারের উৎসাহে ডব্লুবিসিএস-এ বসলাম। তিন বারের বার ক্লিয়ার করতে পারলাম। ইন্সপেক্টর অফ লিগাল মেট্রোলজি পোস্টে জয়েন করলাম। ট্রান্সস্ফারেবল জব। নানা জায়গায় বদলির পর কলকাতায় এলাম ডেপুটি কন্ট্রোলার হয়ে। সেই সঙ্গে বাড়িতে বাবা অসুস্থ হলেন। বাড়ির ভাইদের দায়িত্ব নেওয়া, সংসারের দায়িত্ব সামলে যখন দেখলাম সবাই নিজের মতো করে যে যার সংসারে প্রতিষ্ঠিত, তখন নিজের মনে হতে লাগল একদম নিজের বলতে আমার কে আছে তবে?
বিয়ে করলেন না কেন?
কালীদাসী : বাড়ি থেকে সেভাবে কেউ উদ্যোগ নেয়নি আমার বিয়ের জন্য। হয়তো বাবা-মায়ের ধারণা হয়েছিল, আমি বিয়ে করব না। যদিও আমি নিজেই একসময় চেষ্টা করেছিলাম ম্যাট্রিমোনিয়াল সাইট থেকে কিন্তু সেভাবে ম্যাচিউর করেনি। একা মেসে থাকতাম, নিজের বিয়ের জন্য নিজেই ফোন করতাম, তাই হয়তো কেউ বিশ্বাস করতে পারেনি!
এরপরেই ‘মা’ হওয়ার সিদ্ধান্ত?
কালীদাসী : হ্যাঁ। কিন্তু তাতেও তো বাধা। একা অবিবাহিত মেয়েকে ‘মা’ হতে দিতে কলকাতার অনেক ডাক্তারেরই মানসিক বাধা প্রচুর! সব বাধা উতরে যখন ‘মা’ হলাম, তখন আমার বয়স তিপান্ন। আমার এক ভাইঝি ছাড়া কেউ ছিল না পাশে। আর ছিল আমার প্রতিবেশীরা। তাদের যখন জানিয়েছিলাম, আমি ক্যারি করছি, জানতাম না কীভাবে রিঅ্যাক্ট করবেন, কিন্তু প্রত্যেকে গ্ল্যাডলি অ্যাকসেপ্ট করেছিলেন। মেয়ে হওয়ার পরও অনেক জটিলতা ছিল। আমায় ছেড়ে দিলেও মেয়ে ছাড়া পায়নি। সেই সময় আবার আমার মা প্রচণ্ড অসুস্থ। যাই হোক শেষ অবধি কথাকলিকে পেলাম আমার জীবনে। একটা কথা আর বলতে চাই, মেয়ে হওয়ার পর বার্থ সার্টিফিকেট নিতে গিয়েও কিন্তু সিঙ্গল মাদার দের অনেক সমস্যায় পড়তে হয়। কর্পোরেশনের কিছু মানুষের অজ্ঞতা ও অসহযোগিতার কারণেই এটা হয়। আমাকে অনেক লড়াই করে ‘সিঙ্গল মাদার’ সার্টিফিকেট জোগাড় করতে হয়েছিল। কথাকলি এখন সবে ক্লাস টু-তে পড়ে। আমি রিটায়ার্ড। অনেক পথ এখনও বাকি। অনেক লড়াইও।

আরও পড়ুন:Breakfast News: ব্রেকফাস্ট নিউজ

 

Previous articleBreakfast Sports: ব্রেকফাস্ট স্পোর্টস