Sunday, February 22, 2026

সেতারে জিলা কাফি, উৎপল সিনহার কলম

Date:

Share post:

উৎপল সিনহা

গান তো কথা ও সুরের মিতালি। সহজ অথবা কঠিন যা-ই হোক না কেন গানের বার্তা শেষপর্যন্ত বোধগম্য হয়, কেননা কথা রয়েছে সেখানে। কিন্তু যেখানে কথা নেই, শুধুমাত্র সুর, সেখানে? সেতারে কিংবা সরোদে বাজছে নির্দিষ্ট কোনো রাগ, করা হচ্ছে বিশেষ একটি ভাবপ্রকাশ, সেখানে সুরের ভাষা চিনবো কী করে?

ধরা যাক, বর্ষার একটি রাগিনী বাজানো হচ্ছে সেতারে। সেখানে বর্ষার মেঘের রহস‍্যময় আচরণ প্রকাশিত হচ্ছে আলাপে। তারপর কখনো ঝিরিঝিরি, কখনো ঝমঝম ক’রে রাগের বিস্তার। জোড়, ঝালা, বিলম্বিত, দ্রুত এইসব সাঙ্গীতিক পরিভাষা অতিক্রম ক’রে একসময় সঙ্গীত অন্তে শান্তি। কিন্তু, এতে কি মন ভরে ? সুরের মাধ‍্যমে ভাবপ্রকাশের সমস্ত অভিব‍্যক্তিগুলো ঠিকঠাক অনুধাবন বা হৃদয়ঙ্গম করা যায়? সুরের দেহ ধরা এবং সুরের আত্মার সন্ধান করা তো খুব সহজ কাজ নয়। সুরের অন্তর্নিহিত অব‍্যক্ত ও অনির্বচনীয় ভাষা চিনতে হ’লে শুধুমাত্র অনুভব, অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধিই যথেষ্ট নয়। চাই অনুমান ও কল্পনাশক্তি এবং চূড়ান্ত সঙ্গীতবোধ। ভুললে চলবে না, ‘ সুর অনির্বচনীয়ের প্রধান বাহন। ‘ বাণীহীন সুর যখন একটা বিমূর্ত ভাব প্রকাশ করে তখন তার আবেগটিকে ঠিকঠাক প’ড়ে নিতে পারা বড়ই কঠিন।

আরও পড়ুন- জল পড়ে পাতা নড়ে, উৎপল সিনহার কলম

সুরযন্ত্রে অর্থাৎ সেতারে, সরোদে, সারেঙ্গীতে, এসরাজে , বেহালায় কিংবা বাঁশিতে যখন কোনো রাগরাগিনী বা অচেনা ধুন বাজানো হয় তখন যদি এভাবে ব‍্যাখ‍্যা করা হয় যে এখানে বিষাদ বা আনন্দের ভাবপ্রকাশ করা হচ্ছে, তাহলে যেন মন ভরে না।

রাগরাগিণীর বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে দেখা হয় নির্দিষ্ট রাগটি কোন্ তালে নিবদ্ধ, অর্থাৎ ত্রিতাল, একতাল, ঝাঁপতাল ইত্যাদি। কেমন তার চলন, বক্র নাকি সরল তাও দেখা হয়, লেখা হয়। পূর্বাঙ্গ, উত্তরাঙ্গ অথবা সন্ধিপ্রকাশের উল্লেখ থাকে। কড়ি ও কোমলের সুনিপুন ব‍্যবহারে নির্দিষ্ট রাগের ভাবরূপটির সার্থক প্রকাশ নিয়েও লেখা হয় অবশ্যই, কিন্তু তারপরেও যেন অনেককিছুই বাকি থেকে যায়।

তাহলে? কী উপায়? অনির্বচনীয় সুরকে ও সুরের ভাষাকে সম‍্যক না হোক, অন্তত কিছুটা চেনা ও অনুভব করা যাবে কীভাবে?

এ প্রসঙ্গে একজন সঙ্গীতশিল্পীর কথা উল্লেখ করতে হয়। তিনি বিশ্বজিৎ মুখোপাধ‍্যায়। প্রখর তাঁর সঙ্গীতবোধ। আদতে তবলাশিল্পী, আসানসোলের মানুষ, বর্তমানে বর্ধমানবাসী। তবলা তাঁর মুখ‍্য বিষয় হ’লেও হিন্দুস্তানী শাস্ত্রীয় তথা ধ্রুপদী সঙ্গীত, পাশ্চাত্য শাস্ত্রীয় ও রকসঙ্গীত থেকে শুরু ক’রে ভজন, গজল, আধুনিক, রবীন্দ্রসঙ্গীত,লোকগান ও নজরুলগীতির ক‍্যাসেট ও অ‍্যালবামের বিপুল সংগ্রহের সম্ভার দেখলে সঙ্গীতপিপাসু মাত্রেই বিস্মিত হবেন। আজ তো গুগল সার্চ করলেই সব পেয়েছির দেশে পৌঁছনো যায়, কিন্তু সঙ্গীতশিল্পী বিশ্বজিতের কৈশোর ও যৌবনে ক‍্যাসেট, অ‍্যালবাম ও রেডিও ছিল প্রধান ভরসা। যা হোক, গানবাজনার আড্ডায় এই বিশ্বজিৎ কোনো বড়ো মাপের শিল্পীর অনুষ্ঠান শুনে এসে যেভাবে যন্ত্রসঙ্গীতের বিশ্লেষণ করতেন তা এক কথায় অসাধারণ।

আরও পড়ুন- অসামান্য তারক সেন, উৎপল সিনহার কলম

কীভাবে গানবাজনা শুনতে, বুঝতে ও হৃদয়ঙ্গম করতে হবে তার একটি কোর্স দীর্ঘ কর্মশালার মাধ্যমে পরিচালনা করতো পশ্চিমবঙ্গ রাজ‍্য সঙ্গীত আকাদেমি এককালে, যাতে সঙ্গীত শিক্ষার্থীরা দারুণ উপকৃত হতো। জানা নেই এখনও ‘ মিউজিক অ‍্যাপ্রিসিয়েশন কোর্স ‘ নামাঙ্কিত সেই কর্মশালা সংঘটিত হয় কিনা।
সঙ্গীত বিশ্লেষক বিশ্বজিৎ আজ থেকে বহুবছর আগে আসানসোলের মতো মফস্বলে সম্পূর্ণ নিজস্ব উদ‍্যোগে গানের আড্ডায় গুটিকয়েক শ্রোতার সম্মুখে তাঁর অভিজ্ঞতালব্ধ বিশ্লেষণ পেশ করতেন। তত্ত্ব, তথ‍্য, সঙ্গীতের ব‍্যাকরণ ও পরিভাষার প্রতি যথাযথ শ্রদ্ধাশীল থেকেও কীভাবে নিজস্ব কল্পনা ও অনুমানের ওপর ভিত্তি করে একটি নির্দিষ্ট রাগের রসাস্বাদন করতে হবে সেই নতুন পথের সন্ধান দিতেন। এও এক শৈলী বৈকি। ভাবশৈলী। কল্পনাশৈলী।

এ প্রসঙ্গে অবিস্মরণীয় সেতারী পণ্ডিত নিখিল বন্দ‍্যোপাধ‍্যায়ের বাজানো ‘ জিলা কাফি ‘ রাগটির উল্লেখ করতেই হয়। জিলা কাফি অভিসারের রাগের মধ্যেই পড়ে। বাজানোর সময়কাল রাত্রি।

আমির খসরুর জিলাফা থেকে জিলা কাফি। জিলা ও কাফির সংমিশ্রণ। এটি অবিনশ্বর রাগ কাফির
রং-রঙিন ধুন-অবতার বিশেষজ্ঞের বিশ্লেষণে। কাফির অভিসার সিন্ধুড়া সিন্ধুর পথেও। প্রেম ও আনন্দ মাখামাখি, সঙ্গে দোসর তীব্র অভিমান ও সাময়িক বিরহ বেদনার প্রাবল‍্য।

নিখিল বন্দ‍্যোপাধ‍্যায়ের সেতারে রাগ জিলা কাফি শিল্পসৃজনের যে পরম উচ্চতায় অধিষ্ঠিত হয়েছে চিরকালের জন‍্য, কোনো ব‍্যাখ‍্যা বা বিশ্লেষণ সেই স্তরকে স্পর্শ করতে পারবে না। তবুও মুগ্ধ-বিস্ময় থেকে কিছুটা সরে এসে নিজের কল্পনা ও অনুমানের দরজা খুলতেই হয়। আর ঠিক তখনই জরুরি হয়ে পড়ে বিশ্বজিৎ মুখোপাধ‍্যায়ের ব‍্যক্তিগত কল্পনাশ্রিত বয়ান :

মন দিয়ে এই বাজনা শুনলে বারবার যেন ধ্বনিত হতে থাকে অনাদিকালের এক অসেতুসম্ভব প্রশ্ন, আর তা হলো ‘ কেন ‘? কেন, কেন, কেন? অবিরাম কান্নার মতো, মৃদু আর্তনাদের মতো বাজতে থাকে এই ‘ কেন ‘।
কেন এলো না? কেন প্রতিশ্রুতি দিলো তাহলে? কেন ভুলে গেলো আবেগমথিত অঙ্গীকার? কেন দেখা হলো না? কেন কথা দিয়েও কথা রাখা গেলো না? ‘ ক্রিন্তন ‘ যেন ক্রন্দনের মতো বেজে ওঠে মধ‍্যসপ্তকের গুটিকয় স্বর ছুঁয়ে একেবারে খাদের ( মন্দ্রসপ্তক ) অতলে তলিয়ে গিয়ে। নিখিল বন্দ‍্যোপাধ‍্যায়ের সংবেদী আঙুলের জাদুতে বিস্তার অংশে তৈরি হতে থাকে মায়াবী সুরের সেই অনবদ্য ইন্দ্রজাল যেখানে দেখা না দেখায় মেশা সাময়িক বিচ্ছেদ-বেদনা সুতীব্র অভিমানে, মৃদু অনুযোগে, সুগভীর ভালোবাসা ও অনুরাগে অপরূপ ঐশ্বর্য‍্যময় অমরাবতী হয়ে ওঠে। একসময় বাজনা থামে। কিন্তু শ্রোতাদের মনে ও প্রাণে সেই বাজনা বাজতেই থাকে। রেশ ফুরোয় না। শেষ হয়েও যেন শেষ হয় না।

প্রশ্নের উত্তর ঘুমিয়ে পড়ে। কিন্তু প্রশ্নের ঘুম নেই। প্রশ্ন জেগে থাকে এবং সবাইকে জাগিয়ে রাখে। রাগ জিলা কাফি শেষ হওয়ার পরেও ঘরে বাইরে জলে স্থলে ও অন্তরীক্ষে যেন অনাদী অনন্তকালের সেই প্রশ্ন বাজতে থাকে, বাজতেই থাকে :
কেন, কেন, কেন?

 

spot_img

Related articles

ঝাড়খণ্ডে মাও দমন অভিযানে বিস্ফোরণ! জখম ২ কোবরা জওয়ান

মাও -বিরোধী অভিযানের মাঝেই ভয়ঙ্কর আইইডি (IED) বিস্ফোরণ! ঘটনাটি ঘটেছে ঝাড়খণ্ডের (Jharkhand Maoist attack) পশ্চিম সিংভূমের সারান্ডা অঞ্চলে।...

বিয়ে নিয়ে অশান্তি, তরুণীকে নারকীয় অত্যাচার লিভ ইন পার্টনারের

গুরগাঁওতে (Gurugram) ডেটিং অ্যাপে আলাপের পর পছন্দের সঙ্গীর সাথে লিভ ইনে (Live in)থাকতেন ১৯ বছরের তরুণী। কিন্তু দুঃস্বপ্নেও...

ভাঙড়ে শওকত-খাইরুলের উপর হামলা, অভিযোগের আঙুল আইএসএফের দিকে 

উত্তপ্ত ভাঙড়, ক্যানিং উত্তর-পূর্বের বিধায়ক শওকত মোল্লার (Saokat Molla)গাড়িতে বোমা ছোড়ার অভিযোগ। আক্রান্ত তৃণমূল নেতা খাইরুল ইসলাম। শনিবার...

দেশজুড়ে নাশকতার ছক! বাংলা-তামিলনাড়ু থেকে ৮ জঙ্গি গ্রেফতার পুলিশের 

বিদেশি চক্রের নির্দেশে ভারতে একটি বড় সন্ত্রাসী হামলার পরিকল্পনা! পশ্চিমবঙ্গ ও তামিলনাড়ু (West Bengal and Tamilnadu) থেকে ৮...