ভাষা সন্ত্রাস! জোর করে হিন্দি চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টার তীব্র প্রতিবাদ সবমহলে

সরকারি কাজের ভাষা হিন্দি(Hindi) করার দাবিতে প্রস্তাব জমা। রাষ্ট্রসংঘ থেকে কেন্দ্রীয় বিদ্যালয় বা আইআইটিতে শিক্ষাদান, এমনকী হিন্দিভাষী রাজ্যের হাই কোর্ট- সর্বত্র ইংরেজির পরিবর্তে হিন্দি ব্যবহৃত হোক। এই মর্মে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর(Amit Shah) নেতৃত্বাধীন সরকারি ভাষা সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির তরফে সুপারিশ করা হয়েছে। এই সুপারিশের তীব্র বিরোধিতা করেছেন বাংলার শিক্ষাবিদ থেকে কবি, সাহিত্যিক, ভাষাবিদ থেকে রাজনীতিবিদরা। ‘এখন বিশ্ব বাংলা সংবাদ’কে তাঁরা জানিয়েছেন, এটা একটা ভয়ঙ্কর প্রবণতা। যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোকে ভেঙে একনায়কতন্ত্রকে চাপিয়ে দেওয়ার পদক্ষেপ।

পবিত্র সরকার, শিক্ষাবিদ

ভাষার মতো একটা স্পর্শকাতর বিষয় চাপিয়ে দেওয়ার প্রশ্নই নেই। সরকারের সংসদীয় কমিটিতে কোনও প্রস্তাব দেওয়া আর জনগণের সেটা মন থেকে মেনে নেওয়া দুটো এক জিনিস নয়। হিন্দি চাপিয়ে দিলে সেটা বাংলার মানুষ কোনভাবেই মেনে নেবেন না। তেমনি দক্ষিণ ভারতেও এই নিয়ম লাগু করা যাবে না বলেই মনে হয়। ভারতে যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো রয়েছে। তাতে এভাবে আঘাত করা কখনওই উচিত হবে না। বহুদিন ধরে হিন্দিকে চাপিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা চলছে। এর আগেও বহু কমিটি গঠন হয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সমর্থন না পেয়ে সেই প্রস্তাবগুলির ঠাঁই হয়েছে কাগজের ঝুড়িতে। এক্ষেত্রেও সেটাই হবে বলে মনে হচ্ছে। রাজ্য যে ভাষার গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেবে সেই স্বাধীনতা তাকে দিতে হবে। ভাষা চাপিয়ে দেওয়া যাবে না।

নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী, সাহিত্যিক

যেদিন থেকে আরএসএস-বিশ্ব হিন্দু পরিষদের মতো দলগুলি দেশে তৈরি হয়েছে, তবে থেকেই হিন্দিকে রাষ্ট্রভাষা করা বা হিন্দু রাষ্ট্র স্থাপনের এজেন্ডা তারা নিয়েছে। ক্ষমতায় এলে এটা করবে সেই পরিকল্পনা তাদের দীর্ঘদিনের। এখন বিজেপি ক্ষমতায় আসায় তারা সেই পথে অগ্রসর হতে চাইছে। হিন্দি ভাষা করার প্রক্রিয়ার পাশাপাশি আছে হিন্দু রাষ্ট্র স্থাপনের ইচ্ছাও। সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথ ধরে তারা নিজেদের এই এজেন্ডাকে বাস্তবায়িত করতে চাইছে। বিজেপি ক্ষমতায় আসার পরে যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়েছে, যেটা চলছে সেটা রাজতন্ত্র। উপর থেকে যেটা আসবে সেটাই আমাদের মেনে নিতে হবে। এই রকম একটা বিষয় চালু করতে চাইছে। এভাবে ভাষা চাপিয়ে দেওয়াটা ভাষা সন্ত্রাস। বাঙালিরা সামান্য হিন্দি জানলেও সে ভাষাকে সরকারি কাজে ব্যবহার করার কোনও ইচ্ছে আমাদের নেই। দক্ষিণ ভারতের বিরাট অংশের মানুষ ইংরেজি ভাষাকেই সরকারি ভাষা হিসেবে ব্যবহার করে। ভারত তৈরি হয়েছিল ভিন্ন ভাষাভাষি মানুষকে নিয়ে। এখানকার এখানে যুক্তরাষ্ট্রীয় পরিকাঠামোটাই আদর্শ। কিন্তু কেন্দ্রে যারাই ক্ষমতায় থাকে, তারাই নিজেদের মতটা সবার উপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে।

সুবোধ সরকার, কবি

আমাদের সংবিধানে কোথাও হিন্দিকে রাষ্ট্রভাষা বলা নেই। এই ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা অত্যন্ত বিপজ্জনক। বারবার এঁরা কেন এই চেষ্টা করছেন জানি না। এটা একেবারেই ঠিক কাজ হবে না। আমাদের সরকারি কাজের ভাষা ইংরেজি। অনেক ভাষাতেই তার সরকারি পরিভাষা তৈরি হয়নি। সুতরাং ইংরেজিই ব্যবহার করা হয়। সে ক্ষেত্রে ইংরেজির বদলে হিন্দিকে চাপিয়ে দেওয়াটা হিন্দি বলয়ের বাইরে কেউ মেনে নেবে বলে আমার মনে হয় না। ভারতীয় ভাষা হিসেবে যে ২৪টি ভাষার স্বীকৃতি সংবিধানে আছে তার মধ্যে ইংরেজিও রয়েছে। সেখানে সেটিকে সবচেয়ে তরুণ ভারতীয় ভাষা হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। এখন তাকে যদি সরাতেই হয় তাহলে তার অন্য রীতি রয়েছে। সেক্ষেত্রে আইনপ্রণেতা, ভাষাবিদ তাঁদের সঙ্গে আলোচনা করে একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করে সেটা পরিবর্তন করতে হবে। কিন্তু হঠাৎ করে ইংরেজির পরিবর্তে হিন্দিকে চাপিয়ে দেওয়া হলে সেটা হবে ভাষা সন্ত্রাস। তার তীব্র বিরোধিতা হবে।

আরও পড়ুন- চাকরি প্রার্থীদের ধারনা মঞ্চে মিষ্টির প্যাকেট নিয়ে সপরিবারে হাজির কৌশিক সেন

সুখেন্দুশেখর রায়, তৃণমূল সাংসদ

কিছুদিন আগেই অমিত শাহ বলেছিলেন হিন্দি কে সরকারি ভাষা করা হবে। তা নিয়ে দেশজুড়ে প্রবল প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। ফের সংসদীয় কমিটি একটি সুপারিশ করেছে। এরা সারাদেশে হিন্দিভাষীদের প্রাধান্য কায়েম করতে চাইছে। সর্বভারতীয় পরীক্ষা যদি হিন্দিতে হয় অ-হিন্দিভাষীরা কীভাবে সেই পরীক্ষা সফল হবে? এরা চাইছে হিন্দিভাষীরাই দেশে আধিপত্য বিস্তার করুক। তামিলনাড়ুর কোনও ব্যাঙ্কে একজন হিন্দিভাষী ম্যানেজার কীভাবে কাজ চালাবেন? সংসদীয় গণতন্ত্রে কোনও ভাষাকে এভাবে চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়। এই নিয়ে অ-হিন্দিভাষীদের মধ্যে যথেষ্ট ক্ষোভ রয়েছে। সংসদেও এ নিয়ে অনেক ডিবেট হয়েছিল। এমনকী ওদের নেতা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ও বলেছিলেন, জোর করে কোনও ভাষাকে চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়। ওরা নিজেদের নেতাকে, ভারতের সংবিধানকেই মানছে না। এই নিয়ে দেশজুড়ে তীব্র প্রতিবাদ হওয়া উচিত।

রবীন দেব, সিপিআইএম নেতা

যে রাজ্যে মানুষের মাতৃভাষা যা সেই ভাষাতেই তারা সরকারি কাজ-কর্ম করা, কথা বলা সব কিছু করবেন। এটাই যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো। কিন্তু এই নরেন্দ্র মোদি, অমিত শাহরা ক্ষমতায় আসার পর থেকে সব কিছু চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন। যা কিছু তাঁদের মনোবাঞ্ছা সেগুলোই সব মানুষের উপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন। হিন্দিকে সরকারি ভাষা করার চেষ্টাও তার বাইরে নয়। এর আগেও এঁরা এই ধরনের চেষ্টা করেছেন। তখন দক্ষিণ ভারতে তুমুল উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। এখন দেশ বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত। সেসব দিকে নজর না দিয়ে আবার ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র শুরু করেছে কেন্দ্র। এই নিয়ে ফের একটি গন্ডগোলের সূচনা হতে পারে। মাতৃভাষা মাতৃদুগ্ধের সমান। এই নিয়ে আমাদের দেশ এবং বাংলাদেশে অনেক রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম হয়েছে। আবার যদি ভাষা চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে আগুনে ঘৃতাহুতি দেওয়া হবে।

আরও পড়ুন- সন্ত্রা*সবাদীদের মদত! পাক মন্ত্রীকেই অপহরণ জ*ঙ্গিদের, খুঁজতে হিমশিম অবস্থা সরকারের


 

 

 

Previous articleসন্ত্রা*সবাদীদের মদত! পাক মন্ত্রীকেই অপহরণ জ*ঙ্গিদের, খুঁজতে হিমশিম অবস্থা সরকারের