Monday, March 16, 2026

‘পাখিদের চরাচর’, উৎপল সিনহার কলম

Date:

Share post:

উৎপল সিনহা

‘একদিন পৃথিবীতে মানুষ থাকবে না । থাকবে শুধু পাখি । চরাচর জুড়ে শুধু পাখি আর পাখি । মানুষের এত লোভ! ‘এই ধরনের সংলাপ আছে বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের ‘ চরাচর ‘ চলচ্চিত্রে । প্রফুল্ল রায়ের একটি উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত এই ছায়াছবির মুখ্য চরিত্র এক ‘ পাখিধরা ‘ , যিনি একদিন পাখিদের যন্ত্রণা উপলব্ধি করবেন এবং শেষে খাঁচা খুলে সব পাখি উড়িয়ে দেবেন অনন্ত আকাশে । মুক্তি পাওয়া বন্দী পাখিরা হঠাৎ পাওয়া স্বাধীনতায় কিছুটা বিস্মিত ও বিহ্বল হয়ে ধীরে ধীরে ডানা মেলে উড়ে যেতে থাকবে দূর থেকে আরও দূরে । পাখিধরার মুখের হাসিতে লেগে থাকবে আশ্চর্য এক প্রশান্তি । চোখে একরাশ আলো । তারও বুক থেকে এক পাষানভার নেমে গেল যে ! সেও তো পাখিদের মতোই মুক্ত-স্বাধীন হলো বহু যুগের শেষে ।
মানুষে মানুষে ছয়লাপ এই চরাচরে আজ পাখিরা শুধু যে কোনঠাসা তা-ই নয় , ভয়ঙ্কর বিপন্ন । তবুও তাদের রয়েছে নিজস্ব বাসভূমি । সে এক অদ্ভুত জগত । পাখিদের পৃথিবী । এই পৃথিবীতে , এই বিশ্বপ্রকৃতিতে তাদের অধিকার যুগ-যুগান্তরের ।

বলা হয় , পাখিদের উদ্ভব ঘটেছে ১৫০ মিলিয়ন বছর আগে জুরাসিক পিরিয়ডে । অরনিথিশ্চিয়ান ডাইনোসর
টেরোসর থেকে পাখির উৎপত্তি ঘটেছে বলে মনে করা হয় । তবে আধুনিক পাখিরা ক্রিটেসিয়াস পিরিয়ডে উদ্ভূত বলে জানা যায় । প্রাণীবিদ হাক্সলে সরীসৃপ থেকে পাখিদের উদ্ভব হয়েছে বলে ‘ birds are glorified reptile ‘ বলে অভিহিত করেছেন । নির্বিচারে ঝোপঝাড় তথা অরণ্যনিধন , প্রযুক্তির বিপুল বাড়বাড়ন্ত আর আধুনিক নগরায়নের সাঁড়াশি আক্রমণে পাখিরা আজ সন্ত্রস্ত ও বিপন্ন । তাদের আদি বাসভূমি থেকে তারা নির্বাসিত আজ । ঘুলঘুলি থেকে উধাও হয়েছে চড়ুইয়ের দল । ঝিলের ধারে ঝাঁক ঝাঁক পরিযায়ী পাখিদের আনন্দকল্লোল স্তব্ধ হয়েছে বহুকাল আগেই ।

বহুযুগ আগে যখন পৃথিবীর বুকে ঘুরে বেড়াতো বিশালাকার ডাইনোসর , সেই সময় থেরোপোডা ডাইনোসরদের একটি ক্ল্যাড প্যারাডিস থেকে পক্ষীকুলের উৎপত্তি হয়েছিল । এই পক্ষীকুল বায়োলজিক্যালি এভিস শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত । প্রায় এক শতাব্দী আগে পৃথিবীর বুকে আবিষ্কৃত হয়েছিল এক অদ্ভুত প্রাণীর জীবাশ্ম । সে ছিল না পাখি না ডাইনোসর । সেই অদ্ভুত পাখিটির নাম ছিল আরকিওপটেরিক্স । বর্তমানে বহু পক্ষীবিজ্ঞানী আজও এই পাখিটিকেই পক্ষীকুলের শুরু বলে মনে করেন । এই পাখির জীবাশ্ম জানান দিয়েছিল কীভাবে ডাইনোসর থেকে পাখির জন্ম হয়েছিল । পাখিটির নামের অর্থ হলো ‘ ওল্ড উইং ‘ , অর্থাৎ পুরোনো ডানা । ছোট্ট সাইজের পাখিটি ছিল লম্বায় মাত্র ০.৫ সেন্টিমিটার , কিন্তু তার ছিল বিশাল বড় ডানা ।
ছিল দাঁতযুক্ত চোয়াল ও নখযুক্ত আঙুল এবং এরসাথে ছিল একটা লম্বা হাড়যুক্ত লেজ , যা ছিল ডাইনোসরের স্বরূপ । এই পাখিটি ছিল নন-এভিয়ান ডাইনোসর এবং পাখির মধ্যবর্তী একটি স্টেজ । কিছু পতঙ্গ ও বাদুড়ের পাখা থাকলেও কেবল পাখিদেরই পালক রয়েছে । পৃথিবীতে পাখির প্রজাতি আছে প্রায় ১০,০০০ টি । বর্গ , গোত্র , গণ এবং প্রজাতিতে পক্ষীকুলকে বিন্যস্ত করা হয়েছে । তবে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন প্রজাতি আবিষ্কৃত হয়ে চলেছে । জীবিত পাখিদের মধ্যে মৌ হামিংবার্ড আকারে সবচেয়ে ছোটো
( ২ ইঞ্চি ) , আর উটপাখি সবচেয়ে বড়ো ( ৯ ফুট ) ।

মানুষের অনেক আগে পৃথিবীতে এসেছে পাখি । সেই হিসেবে পৃথিবীর অধিকার পাখিদের কম তো নয়ই , বরং বেশি । কিন্তু মানুষের সর্বগ্রাসী লোভ পাখিদের প্রতিমুহূর্তে চরম বিপদাপন্ন করে তুলছে । খাদ্য-খাদকের সম্পর্ক ? প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা ? পাখিরা যদি কথা বলতে পারতো তাহলে মানবজাতির কাছে এই প্রশ্ন অবশ্যই রাখতো , ‘ তোমাদের তো চেতনা আছে , তবু রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবকে কেন বলতে হয়েছিল , ‘ তোদের চৈতন্য হোক ‘ ? এই সীমাহীন লোভ নিয়ে কোথায় পৌঁছোতে চাও তোমরা ? তোমাদের লোভে শেষ হয়ে গেছে আমাদের বহু প্রজন্ম । এমনকি ডোডো পাখি , যাদের মতো শান্ত , নিরীহ আদুরে পাখি আর দুটি হয় না , যারা এসেছিলো একবুক বিশ্বাস নিয়ে তোমাদের স্নেহসঙ্গ পেতে , তাদেরও হত্যা করে খেয়ে শেষ করে ফেলেছো তোমরা ? ডোডোরা তো আজ বিলুপ্ত হয়ে গেছে এই বিশ্বসংসার থেকে । তোমাদের একটুও অনুতাপ হয় না ? এত খেয়েও তোমাদের আশ মেটে না কেন মানুষ ? আমাদের এক প্রজাতিকে গিলে ফেলে আরেক প্রজাতির দিকে নৃশংস থাবা বাড়াও তোমরা প্রতিনিয়ত । তোমাদের অন্তহীন খিদে মিটবে কবে কে জানে ! তবে এও জেনো , শেষ পর্যন্ত আমরাই থাকবো পৃথিবীতে । তোমরা থাকবে না । সীমাহীন লোভে ধ্বংস হবে তোমরা । তোমাদের বিলুপ্তি শুধু সময়ের অপেক্ষা । উপকারীর অপকার করে মহাপাতকেরা । তাদের সর্বনাশ অনিবার্য । ‘

আরও পড়ুন- ইংরেজির পাশাপাশি মাতৃভাষায় পঠনপাঠন, নয়া বিজ্ঞপ্তি সিবিএসই বোর্ডের

spot_img

Related articles

মধ্যরাতে গুপ্ত তাণ্ডব! রাতারাতি মুখ্যসচিব বদলে ‘মহিলাবিদ্বেষী’ বিজেপি-কমিশনকে নিশানা মমতার

“মধ্যরাতে মেসেজ পেলাম, কাউকে কাজে লাগিয়ে ছুপারুস্তমের মতো গুপ্ত তাণ্ডব করছে“- সোমবার মহামিছিলের শেষে ধর্মতলার ডোরিনা ক্রসিং-এর মঞ্চ...

নির্বাচন সংক্রান্ত আরও আটটি ‘আদর্শ নির্বাচনী আচরণবিধি’ জারি কমিশনের

রাজ্যে (West Bengal Election) দোরগোড়ায় নির্বাচন। ইতিমধ্যেই নির্বাচন কমিশন (Election Commission) ভোটের প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছে। প্রশাসনিক থেকে...

নাম নেই শতরূপের, কেন্দ্র বদল মীনাক্ষি-দীপ্সিতাদের: তমান্নার মাকে প্রার্থী করে সেন্টিমেন্টাল তাস বামেদের!

ISF ও CPIML-liberation -এর সঙ্গে জোট করে বিধানসভা ভোটে লড়বে বামফ্রন্ট। সোমবার, সাংবাদিক বৈঠক থেকে ঘোষণা করলেন বামফ্রন্ট...

রান্নার গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি-সরবরাহে সমস্যার প্রতিবাদে রাজপথে মমতার মহামিছিলে জনসুনামি

রান্নার গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি ও বাণিজ্যিক গ্যাস (LPG Price Hike Protest) সরবরাহে কেন্দ্রের হঠকারী সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে সোমবার কলকাতার রাজপথে...