Friday, May 23, 2025

‘চার্লস চ্যাপলিন’, উৎপল সিনহার কলম

Date:

Share post:

উৎপল সিনহা

” এই বিশ্বে স্থায়ী কিছুই না , এমনকি আমাদের সমস্যাগুলোও না ” ।
” হাসি হলো ওষুধ , যেটা দুঃখ থেকে মুক্তি দেয় ” ।
” সরলতা অর্জন করা কঠিন ” ।
” নিচের দিকে তাকিয়ে আপনি কখনও রংধনু দেখতে পাবেন না ” ।
” আমার জীবনে অনেক সমস্যা আছে , কিন্তু আমার ঠোঁট তা জানে না , তাই সে সবসময় হাসতে থাকে ” ।
” একটা সৃষ্টিশীল কাজের ভেতরে সত্যটা যত গভীর হবে , সেটা তত বেশি সময় টিকে থাকবে ” ।
” আসুন , অসম্ভবের জন্য সংগ্রাম করি , অসম্ভবকে সম্ভব করি , ইতিহাস গড়ি ” ।
” আমার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু আয়না , কারণ আমি যখন কাঁদি , সে তখন হাসে না ” ।
” আমি বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে হাঁটি যাতে কেউ আমার অশ্রু দেখতে না পায় ” ।
” ক্লোজ আপ-এ জীবন হচ্ছে ট্রাজেডি , কিন্তু লং শটে সেটা কমেডি ” ।
” শিল্প হলো পৃথিবীর উদ্দেশে লেখা এক প্রেমপত্র ” ।
” ভালোবাসা দাও ভালোবাসা ছড়াও ” ।
” শেষে সবকিছুই ঠাট্টা ” ।

এইসব মণিমুক্তো ছড়িয়ে গেছেন যিনি , তাঁর বর্ণময় জীবনে তিনি অসংখ্য ভক্তদের করতালিতে বারবার অভিনন্দিত হলেও দুটি ঘটনা সারাজীবনে ভুলতে পারেন নি । এই মানুষটি শৈশবেই মা ও ভাই-সহ নিজের বাড়ি থেকে বিতাড়িত হন । তাঁর নেশাখোর বাবা তাঁদের বাড়ি থেকে বের করে দেয় । ভীষণ অপমানে , অর্থকষ্টে দিন কাটতে থাকে । তাঁর মা রোজগারের জন্য মঞ্চে গান গাইতেন । প্রচণ্ড মানসিক চাপে ভুগতেন। এমনই এক দিনে মঞ্চে গান গাইতে গাইতে মায়ের গলা ভেঙে গলার স্বর বসে যায় হঠাৎই ।
মাঝপথে গান থেমে যাওয়ায় অধৈর্য শ্রোতারা ক্ষিপ্ত ও উত্তেজিত হয়ে গালাগালি শুরু করেন , স্টেজে ঢিল পড়তে থাকে । এই মানুষটি তখন পাঁচ বছরের শিশু । ছোট্ট ছেলেটি তখন মঞ্চে উঠে তার মায়ের অসমাপ্ত গানটি গাইতে থাকে । শ্রোতারা শান্ত হয়ে শুনতে থাকেন বাচ্চাটির গান । তাঁরা মুগ্ধ হয়ে যান । তুমুল হাততালিতে বাচ্চাটিকে অভিনন্দিত করেন । সেই প্রথম তাঁর মঞ্চে ওঠা । প্রথম দিনেই বাজিমাত ।
তারপর ঘটনাবহুল জীবনের অনেক চড়াই উৎরাই পার হয়ে সেই মানুষটি ১৯৭২ সালে পেলেন একাডেমি পুরস্কার , যাকে বলা হয় অস্কার অ্যাওয়ার্ড । তিনি পুরস্কার নেওয়ার জন্য মঞ্চে উঠতেই সমস্ত দর্শক উঠে দাঁড়িয়ে হাততালি দিতে শুরু করেন । হাততালি চলে টানা পাঁচ মিনিট । অস্কার পুরস্কারের ইতিহাসে এটাই এখনও পর্যন্ত দীর্ঘ সময়ের স্ট্যান্ডিং ওভেশন । আবেগে গলা বুজে আসায় এই অনুষ্ঠানে তিনি বক্তৃতা দিতে পারেন নি ‌। মানুষটির নাম চার্লি চ্যাপলিন।

স্যার চার্লস চ্যাপলিন । পুরো নাম চার্লস স্পেন্সার চ্যাপলিন জুনিয়র ( ১৬ এপ্রিল , ১৮৮৯ — ২৫ ডিসেম্বর , ১৯৭৭ ) । তিনি ছিলেন একজন বৃটিশ চলচ্চিত্র অভিনেতা , পরিচালক ও সুরকার । নির্বাক চলচ্চিত্রের যুগে তাঁর চেয়ে বড়ো মাপের অভিনেতা ও পরিচালক আর কেউ ছিলেন না । তাঁকে বড়োপর্দার সর্বকালের সেরা মূকাভিনেতা বলা হয় । তাঁর মতো বড়ো মাপের কৌতুকাভিনেতাও বিশ্ব চলচ্চিত্রে বিরল । তাঁর বর্ণাঢ্য ব্যক্তিজীবন এবং সামাজিক খ্যাতি ও বিতর্ক দুই-ই নিম্ন থেকে একেবারে শীর্ষবিন্দু ছুঁয়ে গেছে । চিত্রনাট্যকার , প্রযোজক এবং সম্পাদক হিসেবেও তিনি খ্যাতির শীর্ষে আরোহণ করেছিলেন । হাসি তথা রঙ্গকৌতুকের ক্ষমতা কতটা সুদূরপ্রসারী হতে পারে তা বোঝা যায় তাঁর তৈরি সিনেমাগুলো দেখলে । মাত্র ১৯ বছর বয়সে তিনি সিনেমা জগতে পদার্পণ করেন ।

১৯১৪ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফরে গিয়ে হলিউড চলচ্চিত্র শিল্পের সঙ্গে যুক্ত হন এবং বড়ো পর্দায় অভিনয় শুরু করেন । অচিরেই তিনি তাঁর স্বসৃষ্ট ভবঘুরে , দ্য ট্রাম্প চরিত্রের মাধ্যমে পরিচিতি ও জনপ্রিয়তা অর্জন করেন । গড়ে ওঠে তাঁর ভক্তকুল । ফ্রান্স , ইতালি , স্পেন ও পর্তুগালে ‘ শার্লট ‘ নামে পরিচিত চ্যাপলিনের ট্রাম্প চরিত্রটি ভবঘুরে হলেও বৃটিশ ভদ্রজনোচিত আদবকায়দায় সুসংস্কৃত ও সম্মানবোধে অটুট । শার্লটের পরনে চাপা কোট , সাইজে বড়ো ঢোলা প্যান্ট , বড়ো জুতো , মাথায় বাউলার হ্যাট , হাতে ছড়ি আর অদ্বিতীয় টুথব্রাশ গোঁফ।

চ্যাপলিন ১৯১৮ সালের মধ্যে বিশ্বের অন্যতম বিখ্যাত ব্যক্তিত্বের মর্যাদা লাভ করেন। তাঁর নির্মিত চলচ্চিত্র দ্য কিড , দ্য গোল্ডরাশ , দ্য সার্কাস , সিটি লাইটস , মডার্ন টাইমস , মসিয়ে ভের্দু দারুণ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে বিশ্বময় । হাসির মোড়কে , ব্যঙ্গ ও কৌতুকের আড়ালে মানুষের দুঃখ-বেদনা , অপরিসীম দারিদ্র্য ও নিঃসীম নিঃসঙ্গতা বারবার প্রকাশ পেয়েছে তাঁর ছবিতে । চূড়ান্ত বৈষম্য ও ভুলে ভরা সমাজব্যবস্থার অজস্র ছিদ্রের দিকে বারবার আঙুল তোলেন তিনি । আসলে তিনি ছিলেন মানবতার একনিষ্ঠ পূজারী । ছিলেন দার্শনিক ও সমাজচিন্তক । তাঁর সবচেয়ে বিতর্কিত চলচ্চিত্রের নাম ‘ দ্য গ্রেট ডিক্টেটর ‘ । যে ছবির বিষয়বস্তু দেখাতে গিয়ে তিনি অতিমাত্রায় রাজনৈতিক হয়ে ওঠেন এবং অ্যাডলফ হিটলারকে ব্যঙ্গ করেন । সমাজতন্ত্রের প্রতি তাঁর অসীম আনুগত্য আছে , এই অভিযোগে তাঁর প্রতি নিষেধাজ্ঞা জারি করে আমেরিকার তৎকালীন সরকার । সেই ক্ষোভে ও প্রতিবাদে আমেরিকা ত্যাগ করেন তিনি । আর কোনদিন আমেরিকায় পা রাখেন নি।

প্রায় ৪০ বছর আমেরিকায় থাকলেও তিনি কখনও মার্কিন নাগরিকত্ব পান নি ।শেষজীবন কাটিয়েছেন সুইজারল্যান্ডে । বিখ্যাত লাইমলাইট ছবিতে সঙ্গীত পরিচালনার জন্য তিনি অস্কার পুরস্কারে ভূষিত হন । অথচ প্রথাগত সঙ্গীতের কোনো তালিম নেওয়ার সুযোগ কখনও পান নি এই গ্রেট কমেডি কিং । চূড়ান্ত পারফেকশনিস্ট হিসেবে তাঁর সুখ্যাতি ও কুখ্যাতি দুই-ই ছিল । তাঁর বিখ্যাত সিটি লাইটস চলচ্চিত্রে ভার্জিনিয়া শেরিল-এর বলা একটি সংলাপ পছন্দ না হওয়ায় বারবার রিপিট করতে বলেন। অবশেষে ৩৪২ তম বার বলার পর চার্লির পছন্দ হয় সেই সংলাপ বলা । এইসব আশ্চর্য ঘটনা ঘটিয়েই অবিস্মরণীয় হয়ে আছেন চার্লস চ্যাপলিন ।

আরও পড়ুন- সুকান্ত মজুমদার কিছু বলবেন? পাসপোর্ট কাণ্ডে বিজেপি নেতা গ্রেফতারের ঘটনায় কটাক্ষ কুণালের

_

 

_

 

_

 

_

 

_

 

 

spot_img

Related articles

একজন মানুষের মৃত্যু হল ৩০ বার! মধ্যপ্রদেশে ১১ কোটির ‘ক্ষতিপূর্ণ’ কেলেঙ্কারি

এক জীবনে মৃত্যু কতবার আসে? মধ্যপ্রদেশে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহানের (Shivraj Singh Chouhan) দৌলতে এক ব্যক্তি ৩০...

আবারও চ্যাম্পিয়ন মোহনবাগান, কালীঘাটকে হারাল সবুজ-মেরুন ব্রিগেড

জিতেই চলেছে মোহনবাগান(Mohunbagan)। ফুটবলে সাফল্যের পর ক্রিকেটেও একের পর এক সাফল্য পেয়ে চলেছে সবুজ-মেরুন ব্রিগেড। ইডেনে জেসি মুখার্জী...

BEFORE ANYONE ELSE: সর্বদলীয় প্রতিনিধিরা বিদেশ থেকে ফিরলেই সংসদে বিশেষ অধিবেশন ডাকার আবেদন মমতার

ভারত সীমান্তে পাক সন্ত্রাস ও অপারেশন সিন্দুর নিয়ে বিশ্বকে জানাতে বিদেশে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়-সহ ৯ ভারতী সাংসদদের প্রতিনিধি দল।...

বোসের বদলে বেলা! রাজভবনে পালাবদল যেন অঞ্জনের গান

দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ রাজ্যপাল সিভি আনন্দ বোস (C V Ananda Bose)। এবার কী সেই সূত্রে বদল হতে চলেছে...