Sunday, January 11, 2026

‘গিলগামেশ’, উৎপল সিনহার কলম

Date:

Share post:

উৎপল সিনহা

উরুক শহরের রাজা গিলগামেশ অমরত্বের সন্ধানে বেরিয়েছিলেন । কিন্তু কেন তাঁকে বেরোতে হয়েছিল অমরত্বের খোঁজে ? কেননা তিনি দেবতাদের রোষানলে পড়েছিলেন ।

উরুক কোথায় ? মেসোপটেমিয়ার নগররাজ্য উরুক। সেখানকার রাজা গিলগামেশ । আসলে গিলগামেশ মেসোপটেমিয়া পুরাণের একটি চরিত্র । তাঁর গল্প মানবিক ইতিহাসের প্রথম মহাকাব্য । এটি খৃষ্টপূর্ব
২০০০ সালে রচিত । এই মহাকাব্য আবর্তিত হয়েছে মূলত গিলগামেশ ও তাঁর বন্ধু এনকিদু-কে ঘিরে । আক্কাদীয় ভাষায় রচিত এই মহাকাব্য । মেসোপটেমিয়া বর্তমান ইরাক , সিরিয়া , তুরস্ক এবং কুয়েতের কিছু অংশ । মানুষ অমর নয় , সে জানে । তবুও সে কিছুতেই মরতে চায় না । সে নিজেকে ভাবে অমৃতের সন্তান । তাই সভ্যতার ঊষালগ্ন থেকেই মানুষ অমরত্বের সন্ধান করে চলেছে । গিলগামেশ পৃথিবীর প্রাচীনতম উপাখ্যান । সম্ভবত এটিই পৃথিবীর প্রথম গল্প ।

গল্পে আছে , এনকিদুকে দেবতারা প্রেরণ করেন গিলগামেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য । কিন্তু কিছু ঘটনাপরম্পরায় এনকিদু একসময় গিলগামেশের সঙ্গে বন্ধুত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হন । এনকিদু কমিক্সের বীর টারজানের মতো একটি চরিত্র , যাঁকে দেবতা আরুরু সৃষ্টি করেন । দেবমাতা নিনসনের দ্বিতীয় পুত্র হিসেবে তিনি পরিচিতি লাভ করেন । দেবমাতার আদেশে গিলগামেশ ও এনকিদু একসাথে বিভিন্ন অভিযানে যান , যার বিবরণ এই মহাকাব্যে পাওয়া যায় । মহাকাব্যে ঘটনাক্রমে স্বর্গের ষাঁড় হত্যা ও অপদেবতা হুমাবাবা হত্যার জন্য শাস্তি হিসেবে এনকিদুর মৃত্যু হলে ভেঙে পড়ে গিলগামেশ । বন্ধু এনকিদুর মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেন না তিনি ।তাই প্রাণপণ চেষ্টা করতে থাকেন মৃত বন্ধুকে পুনর্জীবিত করার। তিনি শুনতে পান , পৃথিবীর একেবারে শেষ প্রান্তে নাকি উৎনাপিশতিম নামে একজন আছেন , যিনি নাকি মৃত্যুকে জয় করেছেন । শুধুমাত্র তিনিই জানেন অমরত্বের রহস্য । তাই যে করেই হোক তাঁর কাছে পৌঁছানোর জন্য গিলগামেশ বেরিয়ে পড়েন রাজ্য ছেড়ে । বিশাল অরণ্য , পাতাল থেকে শুরু করে আকাশছোঁয়া মাশুপর্বত পেরিয়ে তিনি মৃত্যুসাগরের তীরে পৌঁছোন । উৎনাপিশতিমের নৌকার মাঝি উর্শানাবি ছাড়া আর কেউ ওই নদী পেরোতে পারে না । অনেক অনুরোধ সত্ত্বেও মাঝি গিলগামেশকে নদী পেরোতে কোনো সাহায্য করে না । তখন সম্পূর্ণ নিজের চেষ্টায় অসম্ভবকে সম্ভব করে গিলগামেশ অবশেষে হাজির হলেন উৎনাপিশতিমের কাছে। কিন্তু উৎনাপিশতিম তাঁকে জানান , মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচার কোনো উপায় তাঁর জানা নেই । তিনি নিজে মহাপ্লাবনের সময় দেবতা এয়ার দয়ায় বেঁচে গেছেন । অতএব মৃত্যু অনিবার্য এবং এটাই জীবনের নিয়ম ।

এ কথা শুনে ভীষণ আশাহত হন গিলগামেশ । তাঁকে দেখে তখন উৎনাপিশতিমের স্ত্রীর খুব মায়া হয় । প্রায় অসম্ভবকে সম্ভব করে আসা একজন মানুষকে এভাবে আশাহত করার জন্য তিনি রীতিমতো ভর্ৎসনা করেন তাঁর স্বামীকে । তখন উৎনাপিশতিম বলেন , মৃত্যুসাগরের তলায় গায়ে কাঁটাযুক্ত একধরনের লতা আছে , জীয়নলতা । এই লতাই পারে মানুষকে অমরত্ব দিতে । অতঃপর গিলগামেশ অভিযানে নেমে উদ্ধার করেন সেই মহামূল্য জীয়নলতা । তারপর ফিরতে থাকেন উরুকের উদ্দেশে ।‌ তাঁর বন্ধুকে যে করেই হোক বাঁচাতে হবে । দিতে হবে অমরত্ব । ফেরার পথে একসময় এক দীঘির পাড়ে জীয়নলতা রেখে স্নান করতে নামেন গিলগামেশ । শীতল জলে স্নান করে প্রাণ জুড়িয়ে যায় তাঁর । মনে তাঁর সফল অভিযানের প্রশান্তি । কিন্তু পাড়ে এসে কী দেখলেন তিনি ? জীয়নলতা নেই । একটা সাপ এসে খেয়ে গেছে সেই জীয়নলতা । এভাবেই তাঁর এত পরিশ্রম ব্যর্থ হয়ে যায় । শেষ হয়ে যায় সব আশা ।

মন ভেঙে যায় তাঁর । তারপর একসময় গিলগামেশ উপলব্ধি করেন যে , মৃত্যু জীবনের অনিবার্য সত্য । কেউ অমর নয় । তখন তাঁর হতাশা কেটে যায় । সত্যের আলোয় উদ্ভাসিত হয় তাঁর মনপ্রাণ । তাঁর উপলব্ধি তাঁকে নতুন স্বপ্ন দেখায় । এভাবেই শেষ হয় গিলগামেশ উপাখ্যান । এই কাব্যে বন্ধুর জন্য বন্ধুর ভালোবাসা অমর হয়ে আছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী এই গল্প পুরোনো হয় না । এখনও মানুষ এই গল্প পড়ে চলেছে , ভবিষ্যতেও পড়বে ।

আরও পড়ুন- ইডেনে ব্যাট হাতে বিরাট দাপট কোহলির, প্রথম ম্যাচে হারের মুখ দেখল কেকেআর

_

 

_

 

_

 

_

 

_

 

_

spot_img

Related articles

‘ডুবন্ত টাইটানিক’, উৎপল সিনহার কলম

টাইটানিক যখন সমুদ্রের অতলে তলিয়ে যায়,ঠিক তার ১ ঘন্টা ৪০ মিনিট পর রাত ৪টে ১০ মিনিটে সেখানে আসে...

ফের শিরোনামে ডবল ইঞ্জিন ছত্রিশগড়! এবার পুলিশের জরুরি পরিষেবার গাড়িতে গণধর্ষণ যুবতীকে

ফের নারী নির্যাতনের ঘটনায় উত্তাল হয়ে উঠল ডবল ইঞ্জিন রাজ্য ছত্রিশগড়। এবার খোদ পুলিশের জরুরি পরিষেবা ‘ডায়াল ১১২’-র...

বিজেপির সেমসাইড গোল! শুভেন্দুর নিরাপত্তারক্ষীরা পেটাল বিজেপি নেতাকে

বাংলাকে না চেনেন বিজেপির নেতারা, না তাঁদের ঘিরে থাকা কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা বাহিনী। ফলে বারবার 'সেমসাইড' হয়ে যাচ্ছে। বিরোধী...

নাকতলার নক্ষত্রদের নিয়ে বিশেষ উদ্যোগ, অরূপকে কৃতজ্ঞতা কৃশানুর পরিবারের

নাকতলা সেখানে সাত কীর্তিমানের কীর্তিকলাপ।যদিও তাঁরা আজ প্রয়াত। ভারতীয় ফুটবলের মারাদোনা কৃশানু দে(krishanu dey), গীতিকার গৌরিপ্রসন্ন মজুমদার, গীতিকার...