Sunday, January 25, 2026

‘দু’দিনের টেস্ট ম্যাচ’, উৎপল সিনহার কলম

Date:

Share post:

উৎপল সিনহা

পাঁচ দিনের টেস্ট দু’দিনেই শেষ । অ্যাশেজ সিরিজ চলছে। এবার পাঁচ টেস্টের সিরিজে প্রথম এবং চতুর্থ টেস্ট ম্যাচ শেষ হলো মাত্র দু’দিনের মধ্যেই। এটা কি ক্রিকেটের পক্ষে ভালো ?
মোটেও না।

ভালো-মন্দ আলোচনার আগে দেখে নিতে হয় স্কোরবোর্ড, যা কিনা সবসময় ‘ গাধা ‘ নয়। অস্ট্রেলিয়া ১৫২ ও ১৩২ এবং ইংল্যান্ড ১১০ ও ১৭৮ – ৬ , ইংল্যান্ড ৪ উইকেটে জয়ী। ১০৪ বছর পর অ্যাশেজে প্রথম দিনেই পড়লো ২০ উইকেট! প্রতি বছরের মতো এবারও বক্সিং ডে টেস্ট ম্যাচ শুরু হয় ২৬ শে ডিসেম্বর। আর শেষ হয়ে গেল ২৭ শে ডিসেম্বর। ২৮ , ২৯ ও ৩০ ডিসেম্বরের বড়ো দিনগুলোয় ফাঁকা পড়ে রইলো এম সি জি।

রোমান্টিক ক্রিকেটপ্রেমীরা বললেন, ‘ আহা, এ তো টেস্ট ম্যাচ নয়, এ যেন থ্রিলার! ম্যাচের প্রথম বল থেকেই পেন্ডুলামের মতো দুলছে স্কোরবোর্ড। ম্যাচের প্রত্যেক মুহূর্তে কী হয়, কী হয়! এরা মাত্র ১৫২ রানে শেষ, তো ওরা মাত্র ১১০ । দুই দলের মোট ৪ ইনিংসের তৃতীয়টি শুরু হয়ে যাচ্ছে প্রথম দিনেই। একদিনেই পড়ে যাচ্ছে ২০ উইকেট। এর চেয়ে চমকপ্রদ আর কী হয় !

কিন্তু তাই কি ? বাস্তববাদী ক্রিকেটরসিক, প্রাক্তন ক্রিকেটার, ক্রিকেট বিশেষজ্ঞ এবং ক্রিকেট আয়োজকদের চোখে পাঁচদিনের ম্যাচ দু’দিনে শেষ হলে ক্রিকেটের ঘোর অমঙ্গল। ধুমধাড়াক্কা ক্রিকেটের রমরমার মাঝে ধ্রুপদী ক্রিকেট শিল্প বেঁচে আছে টেস্ট ম্যাচের হাত ধরেই। যেমন শাস্ত্রীয় সঙ্গীত। তিন মিনিটের গান গেয়ে তুমি বিশ্বজয় করে এলেও তোমাকে শেষপর্যন্ত নতমস্তকে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে যেতে হবে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের দরবারে এসে। কেননা এখান থেকেই তুমি শিখেছো সঙ্গীতের অআকখ। ঠিক তেমনি টেস্ট ক্রিকেট হলো ক্রিকেট – জননী। টেস্ট ম্যাচ ক্রিকেটের সর্বোত্তম পরীক্ষা এবং ক্রিকেটারদের প্রবেশিকা। তাই পাঁচদিনের টেস্ট দু’দিনে শেষ হওয়া ক্রিকেটের সবচেয়ে খারাপ বিজ্ঞাপন।
মেলবোর্নে অ্যাশেজের বক্সিং ডে টেস্ট ছিল সিরিজের চতুর্থ টেস্ট ম্যাচ। প্রথম তিনটি ম্যাচ জিতে অস্ট্রেলিয়া ইতিমধ্যেই ৩–০ এগিয়ে। কিন্তু মেলবোর্নে তারা হেরে গেল মাত্র দু’দিনে। হৃত গৌরব কিছুটা ফিরে পেলো ইংল্যান্ড।

মেলবোর্নের পিচ নিয়ে সমালোচনায় মুখর দু’দলের ক্রিকেটার-সহ প্রাক্তন ক্রিকেটার ও বিশেষজ্ঞদের প্রায় সকলেই। পিচে প্রায় ১০ মিলিমিটার উচ্চতার ঘাস ছিল , ব্যাটসম্যানদের পক্ষে যা অত্যন্ত বিপজ্জনক । বলা হয় , বড়ো ও পুরু ঘাসের আনইভিন বাউন্সের পিচ ব্যাটসম্যানদের বধ্যভূমি। এই পিচে বল পড়ে কী আচরণ করবে বলা মুশকিল। এই ধরনের পিচে একরাশ আতঙ্ক ও দুশ্চিন্তা নিয়ে ব্যাট করতে নামেন যে কোনো ব্যাটসম্যান। বলের এত বেশি নড়াচড়া ক্রিকেটের পক্ষে মোটেই ভালো নয়।

বক্সিং ডে টেস্টের প্রথম দিন মাঠে এসেছিলেন ৯৩ হাজার ৪৪২ জন দর্শক। অ্যাশেজের ইতিহাসে কোনো টেস্টে একদিনে এত দর্শক খেলা দেখতে আসেন নি। তৃতীয় এবং চতুর্থ দিন ৯০,০০০ করে দর্শক আসার কথা ছিল। কিন্তু তার আগেই খেলা শেষ। তাই অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট বোর্ড বিরাট আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে। তাই মনে রাখতে হবে সংক্ষিপ্ত টেস্ট ম্যাচ ক্রিকেট বানিজ্যের পক্ষে একবারেই ভালো নয়। বক্সিং ডে টেস্টের জন্য টিকিটের চাহিদা ছিল আকাশছোঁয়া। সব টিকিট বিক্রি হয়ে গিয়েছিল। এবার বাকি তিনদিনের টিকিটের টাকা ফেরত দিতে হবে অস্ট্রেলীয় ক্রিকেট বোর্ডকে।
কি গেরো, কী গেরো!

২০২৪ – এ ভারত বনাম দক্ষিণ আফ্রিকা টেস্ট কার্যত মাত্র দেড় দিনে শেষ হয়ে গিয়েছিল। মাত্র ৬৪২ বল স্থায়ী হয়েছিল সেই টেস্ট। তখন নিন্দার ঝড় ওঠে ক্রিকেট বিশ্বে। তাহলে এবার মেলবোর্নের পিচকে ‘ পুওর ‘ রেটিং দেওয়া হবে না কেন? এমনকি ম্যাচ জেতার পর সাংবাদিক সম্মেলনে এসে জয়ী ইংল্যান্ড অধিনায়ক পর্যন্ত বলে যান, ‘ আমি নিশ্চিত, এরকম পিচ অন্য কোথাও হলে এতক্ষনে তাদের জন্য নরকবাস অপেক্ষা করতো। ‘

পরাজিত অস্ট্রেলীয় অধিনায়ক ম্যাচ শুরুর দিনেই বলেন, ‘ এমন পিচে নিঃসন্দেহে খুব চাপে থাকবে ব্যাটসম্যানেরা। ‘
মাইকেল ভন বলেন, ‘ এই ধরনের পিচে টেস্ট খেলা উচিত নয়। ‘ গ্লেন ম্যাকগ্রা বলেছেন, ‘ পিচে বড্ড বেশি ঘাস ছেড়ে রাখা হয়েছে। টেস্ট ক্রিকেটের জন্য বেশিই প্রাণবন্ত দেখাচ্ছে বাইশ গজকে। ব্যাট বলের মধ্যে আরও ভারসাম্য থাকা দরকার। ‘ অ্যালিস্টার কুক বলেন, ‘ এমন পিচে তো উইকেট নেওয়ার জন্য বোলারদের কোনো পরিশ্রমই করতে হচ্ছে না। ‘

তাহলে শেষপর্যন্ত কী দাঁড়ালো ? ভারতের ঘূর্ণি পিচে দেড় দিনে ম্যাচ শেষ হলে যেমন বলা হয় ‘ খারাপ পিচ ‘ , ঠিক তেমনি অস্ট্রেলিয়ার পুরু ঘাসের পিচে ফাস্ট বোলারদের গতির ঝড়ে ব্যাটসম্যানেরা আহত হলে এবং খেলা দু’দিনের মধ্যেই শেষ হয়ে গেলে সেই পিচকেও অবশ্যই খারাপ পিচ বলতে হবে। মাত্র ৬৪২ বলে একটা টেস্ট ম্যাচ শেষ হয়ে যাওয়া যতটা খারাপ, ঠিক ততটাই খারাপ মাত্র ৮৫২ বলে একটা গুরুত্বপূর্ণ টেস্ট ম্যাচ শেষ হয়ে যাওয়া।

আরও পড়ুন- দুর্ঘটনার কবলে আশিস বিদ্যার্থী ও তাঁর স্ত্রী, অহেতুক আতঙ্ক না ছড়ানোর আর্জি

_

spot_img

Related articles

প্রয়াত বিবিসির সাংবাদিক মার্ক টুলি: শোক প্রকাশ মুখ্যমন্ত্রীর

বিবিসি-র প্রাক্তন সাংবাদিক মার্ক টুলির প্রয়াণে অবসান হল একটি যুগের। স্বাধীনতার পরবর্তী সময় থেকে বর্তমান প্রেক্ষাপট পর্যন্ত ভারতের...

থাকছে দেশীয় প্রযুক্তির প্রদর্শনী! সাধারণতন্ত্র দিবসে বর্ণাঢ্য কুচকাওয়াজ রেড রোডে

সাধারণতন্ত্র দিবস উপলক্ষে প্রতিবছরের মতো এ বারও কলকাতার রেড রোডে অনুষ্ঠিত হতে চলেছে বর্ণাঢ্য সামরিক কুচকাওয়াজ। জাতীয় নিরাপত্তা,...

ভোটাধিকার রক্ষায় জাতীয় ভোটার দিবসে রাজ্যজুড়ে প্রতিবাদ তৃণমূলের 

এসআইআরের আড়ালে সাধারণ মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণের প্রতিবাদে পথে নামল তৃণমূল। দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Abhishek...

SIR আতঙ্কে ফের রাজ্যে চার মৃত্যু

রাজ্যে SIR প্রক্রিয়া শেষের পথে হলেও এই নিয়ে এখনও আতঙ্কের শেষ নেই(SIR harassment)। একের পর এক আতঙ্কে প্রাণ...