বাংলায় এসআইআরে সবথেকে বেশি দুর্দশায় মতুয়া সমাজের মানুষ, তা নরেন্দ্র মোদি থেকে অমিত শাহর ভাষণেই স্পষ্ট। তাঁদের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়ে আজও নাগরিকত্বের স্বপ্ন দেখাচ্ছেন মোদি-শাহরা। অথচ তাঁদের যে এই পরিস্থিতিতে কী আশঙ্কা ও অনিশ্চয়তায় পড়তে হয়েছে মেট্রো চ্যানেলের ধর্নামঞ্চ (dharna mancha) থেকে মতুয়া (Mayua) সমাজের প্রতিনিধি হিসাবে সেই ছবিই তুলে ধরলেন সাংসদ মমতাবালা ঠাকুর (Mamatabala Thakur)।

কেন্দ্রে একের পর এক সরকার এসেছে। কিন্তু মতুয়া সমাজের ভোটাধিকার নিয়ে বারবার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ হয়েছে। সেই ইতিহাস তুলে ধরেন মমতাবালা এদিন জানান, মতুয়াদের সবথেকে যে জ্বলন্ত সমস্যা, যা নিয়ে ২০০৩ সাল থেকে বড়মার নেতৃত্বে আন্দোলন করে আসছি। প্রথমে অটল বিহারী বাজপায়ির (Atal Bihari Bajpayee) সময়ে যে নিয়ম হল – জন্মসূত্রে নাগরিক হওয়া যাবে না। তার বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হল ঠাকুরবাড়ি, ঠাকুরনগরে আমরণ অনশন। পরবর্তীকালে তার জন্যই প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের (Manmohan Singh) মন্ত্রী পাঠিয়ে অনশন ভাঙার জন্য আবেদন। কথা দিয়েছিল আপনাদের এই কাজ আমরা করব। পাশে থাকব। দশ বছর থাকা সত্ত্বেও কোনও কাজ তাঁরা করেননি।

এরপরই মতুয়া সমাজের, বড়মার আন্দোলনের ইতিহাস মমতাবালার মুখে। তিনি স্মৃতিচারণ করেন, পরবর্তীকালে এই ধর্মতলায় বড়মার (Boroma) নেতৃত্বে আমার স্বামী কপিলকৃষ্ণ ঠাকুরের ডাকে মানুষ ছুটে এসেছিল। ওপার বাংলার থেকে এই দেশে আসা যে লক্ষ লক্ষ মানুষ তাঁরা এই দেশের নাগরিক হতে পারবে না। তার জন্যই লক্ষ লক্ষ মানুষ ধর্মতলায় ছুটে এসেছিল।

সব রাজনৈতিক দল যখন প্রতিশ্রুতি ভেঙেছে, তখন মতুয়া সমাজের পাশে দাঁড়িয়েছেন একমাত্র তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই কথা ধর্নামঞ্চে তুলে ধরে মমতাবালা জানান, বড়মারই (Boroma) কাজ আজ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee) করছেন। আমাদেরই কাজ – আমার হরিচাঁদ, গুরুচাঁদের কাজ করছেন। তার জন্য সুপ্রিম কোর্টে লড়াই করতে ছুটে গিয়েছেন। ভারতবর্ষের এত নেতা, মন্ত্রী কেউ তো যায়নি আমাদের জন্য। একমাত্র ছুটে গিয়েছেন তিনি। সংবিধানকে বাঁচানোর জন্য ছুটে গিয়েছেন আমাদের নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আজ মতুয়াদের ঘরে বড়মার যে স্বপ্ন, যখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রেলমন্ত্রী ছিলেন তখন বড়মার কাছে যান, তিনি বলেছিলেন আমার এই মতুয়া সমাজের মানুষকে তুমি দেখো। সেই কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আজ তাঁর পাশে মতুয়া সমাজের মানুষ।

এই সর্বনাশা এসআইআরের পরে কেমন আছেন মতুয়া সমাজের মানুষ? সেই করুণ ছবি তুলে ধরে মমতাবালা জানান, লক্ষ লক্ষ মানুষ আজ কাঁদছে। কাল আমি জেলাশাসকের দফতরে গিয়েছে। সেখানে গাড়ি নিয়ে যাওয়া যাচ্ছে না। ছোট ছোট শিশু কোলে নিয়ে, বয়স্ক লোক নিয়ে তাঁরা লাইনে দাঁড়িয়েছেন। এর জবাব কী নির্বাচন কমিশন দিতে পারবে? এতগুলো লোক যে আজ মারা গেল, তার রক্তে হাত রাঙানো। তাঁদের ভোটের অধিকার প্রয়োগ করতে দেবে না।

কীভাবে বিজেপি নাগরিকত্বের নামে শুধুই মতুয়া সমাজের সঙ্গে ভোটবঙ্কের খেলা খেলেছেন, এদিন মঞ্চ থেকে তাও স্পষ্ট করে দেন তৃণমূল সাংসদ। তিনি দাবি করেন, এই ভোট নিয়েই তো ২০১৪ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় রয়েছে। তার বলেছিল ২০১৪-তে সিএএ-তে নাগরিকত্ব দেব, আমাদের ভোট দিন। আজ যারা মতুয়া সমাজের মানুষ না বুঝেই চলে গেল সেই লোভে। ভেবেছিল বোধহয় নিঃশর্ত নাগরিকত্ব পাবো। ২০১৯ থেকে ২০২৬ – আজও পায়নি। আশা করি জীবনেও পাবে না। কারণ ১১টা নথি চেয়েছিল যে ১১টা নথি কোনও মতুয়া সমাজের মানুষের কাছে নেই। সেই মতুয়া সমাজের মানুষ যখন ১১টি নথি দিয়ে আবেদন করল না সিএএ-তে তখন আবার ছলে বলে কৌশলে নির্বাচন কমিশনকে দিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসআইআর-এর মাধ্যমে তাদের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার কাজ করল। তার বিরুদ্ধে লড়াই করছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। আজ শান্তনু ঠাকুরের, সুব্রত ঠাকুরের কোনও কথা নেই। আজ অসীম সরকারের কোনও কথা নেই। তার জন্য কী লড়াই করছে ওরা? আমরাও আমরণ অনশনে বসেছিলাম।

আরও পড়ুন : ৬০ লক্ষ মানুষের ভোটাধিকার না থাকলে কীভাবে ‘ফ্রি অ্যান্ড ফেয়ার’ নির্বাচন: প্রশ্ন মেনকার

সেই সঙ্গে মমতাবালা ঠাকুর স্পষ্ট করে দেন, লড়াইটা বিজেপির সঙ্গে বাঙালির লড়াই। এটা শুধু মতুয়া সমাজের লড়াই নয়। প্রতিটা বাঙালি সমাজের জন্য লড়াই। বাংলাকে বাঁচানোর লড়াই। পানের দোকানে বলবেন বাঙালির শত্রু বিজেপি। যে সন্তান জন্ম নেবে তাকে শেখাবেন বাঙালির শত্রু বিজেপি।

–

–

