Saturday, May 30, 2026

‘আমি মায়াকভস্কি’, উৎপল সিনহার কলম

Date:

Share post:

উৎপল সিনহা

শেষ লেখা লিখলেন তিনি একটা চিরকুটে । ” কাউকে দোষারোপ করবেন না , দয়া করে কোনো গুজব ছড়াবেন না..”। তারপর নিজের বুকে চালালেন গুলি। বিদীর্ণ হলো হৃদপিন্ড । এভাবেই ১৯৩০ সালের ১৪ এপ্রিল মাত্র ৩৭ বছর বয়সে স্বেচ্ছায় পৃথিবীকে চিরবিদায় জানান ভ্লাদিমির মায়াকভস্কি, সোভিয়েত যুগের অন্যতম সেরা লেখক এবং বিংশ শতাব্দীর অন্যতম সেরা কবি। এ ঘটনা ঘটে মস্কোয়, কবির নিজের অ্যাপার্টমেন্টে।

শোনো! অবশেষে, তারারা যদি আলো ছড়ায়, তবে নিশ্চিত, কেউ তাদের প্রয়োজন বোধ করেছিল, কেউ হয়তো কামনা করেছিল আকাশে তাদের উপস্থিতি, তবে কেউ নিশ্চয়ই মনেপ্রাণে চেয়েছিল মুক্তোদানার নিঃসরণ।

এত আলো ছিল যাঁর দীপ্ত চোখে, তাঁরই বুকে জমেছিল বুঝি অতল এক অন্ধকার, যার জেরে হয়তো জ্যোৎস্নায় তিনি দেখেছিলেন ভূত, অথবা হয়তো ঘুম হয়নি বহুকাল। বিদায়কালে সুইসাইড নোটে তিনি লিখে যান আরো কিছু জরুরি কথা। ” আমি যেভাবে চলে যাচ্ছি, সে পথ মোটেও অনুসরণযোগ্য নয়, কিন্তু আমি নিরুপায়, এছাড়া অন্য কোনো পথ আমার সামনে খোলা ছিল না। তাবলে আমাকে যেন দুর্বলহৃদয় না ভাবা হয়… ” ।

ওভারকোট আর হ্যাট মাথায় দীর্ঘদেহী সুদর্শন মায়াকভস্কি ( ১৯ জুলাই, ১৯৮৩ ) ছিলেন রুশ বিপ্লবের অন্যতম পথিকৃৎ। ছিলেন একাধারে কবি, নাট্যকার, অভিনেতা ও চিন্তক। আবৃত্তি করতেন অসাধারণ। তাঁর কবিতায় রয়েছে এক বিমর্ষ চিৎকার। সেই চিৎকৃত শব্দগুলো প্রায়শই সৃষ্টি করেছে গভীর অর্থদ্যোতনা। এই অসামান্য মানুষটি সমাজে একজন শিল্পীর ভূমিকাকে নতুন আঙ্গিকে উপস্থাপন করেছেন, পুনঃ সংজ্ঞায়িত করেছেন। তাঁর জন্ম সোভিয়েত রাশিয়ার জর্জিয়ায়। চিত্রশিল্পী হিসেবেও বরেণ্য মায়াকভস্কি মূলত রুশ ফিউচারিস্ট আন্দোলনের অন্যতম প্রবর্তক হিসেবে যথেষ্ট জনপ্রিয় ছিলেন। সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতার এই ধ্রুপদী কবি তাঁর বৈপ্লবিক কবিতা ও শিল্পকর্মের মাধ্যমে বিশ্ব সাহিত্যে গভীর প্রভাব বিস্তার করেন। প্রথাগত কাব্যশৈলী ভেঙে নতুন এক ধারার প্রবর্তন করে কবিতা ও নাটককে এক অনন্য মাত্রায় পৌঁছে দিতে তাঁর প্রয়াস অবিস্মরণীয়। তাঁর অন্যতম উল্লেখযোগ্য সৃষ্টি ‘ Backbone Flute ‘ । বাংলা সাহিত্যে তাঁর কবিতা, বিশেষ করে ননী ভৌমিকের অনুবাদে বেশ জনপ্রিয়। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য অনূদিত ‘ এই আমি মায়াকভস্কি ‘ বইটি কবির জীবন ও চিন্তাধারার গুরুত্বপূর্ণ উৎস।

ব্রাত্য বসুর কথায়, ‘ রুশ কবি ভ্লাদিমির মায়াকভস্কির জীবন ছিল আমি এবং না-আমির এক ডুয়েল। একইসঙ্গে আবেগপ্রবণ ও আত্মধ্বংসী ব্যঙ্গ- খরশান ও আত্মনির্যাতনকারী, ভালোবাসার জন্য উন্মুখ ও পদদলনকারী এই জটিল, বহুস্তরিক অসুখী ব্যক্তিত্বকে বোঝার জন্য এমনকি তাঁর লিখে যাওয়া রচনাসমূহও যথেষ্ঠ নয় ‘ ।

মায়াকভস্কি ছিলেন আপাদমস্তক এক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞাও ছিল প্রশ্নাতীত। সারা জীবনে মোট তিনবার তিনি গ্রেফতার বরণ করেন। মানুষের সার্বিক মুক্তির সংগ্রামে তিনি ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ। ছিলেন ঠোঁটকাটা, স্পষ্টবাদী, তাই অজাতশত্রু কোনোদিনই ছিলেন না। নাস্তিক এই কবি ছিলেন ভ্রমণপিপাসু। তাস ও বিলিয়ার্ড ছিল তাঁর প্রিয় খেলা। হাঁটতে হাঁটতে সৃষ্টি করতেন কবিতা। আরেকটি খুব গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিগত ব্যক্তিগত উপলব্ধির কথা তাঁর সুইসাইড নোটে পাওয়া যায় , যা খুবই মর্মস্পর্শী। ‘ ভালোবাসার নৌকাটি দৈনন্দিন জীবনের সাথে ধাক্কা খেয়ে ভেঙে গেছে ‘ । ব্যক্তিগত সম্পর্কের টানাপোড়েন, ঘাত প্রতিঘাত, মানসিক চাপ, বিমর্ষতা এবং তৎকালীন সোভিয়েত শাসন ব্যবস্থার সাথে মতাদর্শগত দ্বন্দ্বে হতাশ হয়ে তিনি হয়তো জীবন সম্পর্কে চরম সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন। প্রেমিকার সাথে ঝগড়া, ব্যক্তিগত হতাশা, আরও নতুন আরও অভিনব কিছু লিখতে না পারার যন্ত্রণা এবং তাঁর সাহিত্যকর্ম নিয়ে তীব্র সমালোচনা তাঁকে ক্রমশই এক স্থায়ী বিষন্নতার দিকে ঠেলে দেয়।
‘ … জীবনের যাঁতাকলে ভালবাসার নৌকার হয়েছে ভরাডুবি। সময় এসেছে
তোমার – আমার ছাড়াছাড়ির,
তবে কি প্রয়োজন
দুজনের অতীতের দুঃখ, যন্ত্রণা ও ক্ষতগুলোকে
কাটাছেঁড়ার ‘ ।

আরও পড়ুন- রাত পোহালেই বার কাউন্সিলের নির্বাচন! উত্তেজনার পারদ আইনজীবী মহলে

_

 

_

 

_

 

_

Related articles

IPL: শুভমানের শতরানে ফাইনালে গুজরাট, রেকর্ড গড়েও ট্র্যাজিক নায়ক বৈভব

শুভমান গিলের দুরন্ত শতরান, রাজস্থান রয়্যালসকে ৭ উইকেটে হারিয়ে IPL ফাইনালে গুজরাট টাইটন্স (Gujarat Titans )। বৈভব সূর্যবংশী...

‘সুন্দরী’কে আর রিল বানাবে না সায়নী! উদ্ধার ঝুলন্ত দেহ

ত্রিবেণীর (Triveni) পরিচিত সোশ্যাল মিডিয়া কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও ভ্লগার (Social Media Content Creator and Vlogger) পশপ্রেমী সায়নী চক্রবর্তীর...

সোমে নতুন মন্ত্রিসভার শপথ: নজরে অর্থ ও স্বরাষ্ট্র দফতর

বাংলায় প্রথমবার ক্ষমতা দখল করলেও রাজ্যে মন্ত্রিসভা গঠনে হিমসিম বিজেপির সরকার। মাত্র পাঁচ মন্ত্রী এখনও পর্যন্ত শপথ নিয়েছেন।...

আরজিকরের ঘটনার জের: চাকরি গেল চিকিৎসক বীরূপাক্ষ বিশ্বাসের

এবার চাকরি হারালেন আরজিকর কাণ্ডের পরে নানা অভিযোগে অভিযুক্ত সিনিয়র রেসিডেন্ট চিকিৎসক বীরূপাক্ষ বিশ্বাস (Birupaksha Biswas)। শুক্রবার রাজ্যের...