গত পাঁচ বছর বিজেপির যিনি বিধায়ক ছিলেন তাঁকে ২০১৯ থেকে ২০২৪ কোচবিহারের মাটিতে বিজেপির সাংসদ ছিলেন। সাংসদ সময় কাটাতো দিল্লিতে আর এখানে যিনি বিদায়ী বিধায়ক মিহির গোস্বামী তাঁর ডাক নাম সুইচ অফ বিধায়ক। মানুষ কোনদিন তাকে ফোনে পায়নি। মঙ্গলবার নাটাবাড়িতে তুফানগঞ্জ আর.এম.সি গ্রাউন্ডের জনসভা থেকে এভাবেই বিজেপিকে আক্রমণ শানালেন তৃণমূলের (TMC) সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় (Abhishek Banerjee)। লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, পথশ্রী, যুবসাথীর মতো একাধিক প্রকল্পের প্রসঙ্গ তুলে অভিষেক জানান, নাটাবাড়িতে বিধায়ক ছিলেন বিজেপির, পরিষেবা দিয়েছে তৃণমূল।

বিজেপিকে (BJP) কটাক্ষ করে অভিষেক বলেন, ‘২০১৯ থেকে ২০২৪, অমিত শাহ একাধিক প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। বলেছিলেন কোচবিহারে নারায়ণী ব্যাটালিয়ান তৈরি করা হবে, তা হয়নি। চিলা রায়ের নামে প্যারা মিলিটারি ট্রেনিং সেন্টার তৈরি করা হবে, কেন্দ্র সরকার করেনি। ঠাকুর পঞ্চানন বর্মার নামে স্মৃতিস্মারক হবে, হয়নি। মদনমোহন মন্দির, জল্পেশ মন্দির, কমলেশ্বরী মন্দিরকে কেন্দ্র করে পর্যটন কেন্দ্র হবে, একটাও করেনি। উত্তরবঙ্গে AIIMS হবে বলেছিলেন, কোচবিহার বিমানবন্দর আন্তর্জাতিক মানের হবে বলেছিলেন, কোনওটাই হয়নি। অন রেকর্ড বলছি, কেউ যদি করে থাকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় করেছেন। আজ থেকে দেড় মাস আগে ১৯ ফেব্রুয়ারি, রাজবংশী ভাষাকে অষ্টম তফশিলে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য কেন্দ্রীয় সরকারকে আমাদের রাজ্য সরকারের তরফ থেকে চিঠি লেখা হয়েছে। আজও তার কোনও উত্তর আসেনি।’

অভিষেকের (Abhishek Banerjee) দাবি, নাটাবাড়ির বিদায়ী বিধায়ক মিহির গোস্বামী গত পাঁচ বছরে এই নাটাবাড়ির জন্য কিছুই করেননি। এ বারের যিনি বিজেপি প্রার্থী, তিনিও নাটাবাড়ির লোক নন। তৃণমূল যাঁকে প্রার্থী করেছে, সেই শৈলেন্দ্রনাথ বর্মা নাটাবাড়ির লোক। এলাকার ১৬টা অঞ্চল হাতের তালুর মতো চেনেন। তিনি এখানকার মানুষের সমস্যা, আবেগ বোঝেন। বহিরাগত প্রার্থীর পক্ষে তা বোঝা সম্ভব নয়। দীর্ঘদিন তিনি জেলা পরিষদেরও সদস্য।

নাটাবাড়ি বিধানসভা থেকে জোড়াফুল ফোটা সময়ের অপেক্ষা। অভিষেক বলেন, ‘২০১৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এই কোচবিহারের মাটিতে বিজেপির সাংসদ ছিলেন। অথচ দিল্লিতে দরবার করে বাংলার মানুষের টাকা আটকে রেখেছিল এই বিজেপিই। ২০২৪ সালে বিজেপিকে হারিয়েছেন কোচবিহারের মানুষ। আমি তাঁদের কুর্নিশ জানাই। ২০২৪ অবধি বিজেপির সাংসদ ছিলেন। দিল্লিতে সময় কাটাতেন। আর বিজেপির যিনি বিধায়ক ছিলেন, তাঁকে ডাকা হতো সুইচঅফ বিধায়ক বলে। সব সময়ে ফোন বন্ধ। সব সময়ে মোবাইল ফোন বন্ধ। খালি ছবি তুলে সংবাদমাধ্যমে টিকে থাকা। ’

এদিন প্রধানমন্ত্রী মোদিকে খোঁচা দিয়ে অভিষেক বলেন, ‘রাসমেলার ময়দানে দেশের প্রধানমন্ত্রী সভা করে গিয়েছেন, অথচ মদনমোহন ঠাকুরের মন্দিরে গেলেন না।রাসমেলা ময়দান থেকে হেঁটে গেলে মন্দির ২-৩ মিনিট। যাঁরা রাজনৈতিক ভাবে লড়তে না পেরে, নিজেদের হিন্দু ধর্মের ধারক বাহক বলে দাবি করেন, তাঁরা রাজনৈতিক সভা করতে এসে মন্দিরে গিয়ে পুজো দেওয়ার ইচ্ছেটুকুও প্রকাশ করেন না। অথচ অন্য সময়ে ধর্মকে ঢাল করে রাজনীতি করে।’

বাদের খাতায় ১০ লক্ষের বেশি নাম হিন্দু বাঙালির এ প্রসঙ্গেও সুর চড়ান অভিষেক। বলেন, ‘এ বার লড়াইটা অনাচার বনাম উন্নয়ন, অবহেলা বনাম সম্মান, শোষণ বনাম হার না মানার মানসিকতার লড়াই। যাঁরা আমাদের বাংলাদেশি বলেছে, ভুলে গেলে চলবে? কোচবিহারের কত মানুষ বিজেপি শাসিত রাজ্যে কাজে গিয়ে বাংলায় কথা বলার কারণে বাংলাদেশি তকমা পেয়েছেন। BSF-এর অত্যাচার ভুলে গেলে চলবে না। এই বিজেপি মানুষকে অত্যাচার করেছে। অবৈধ ভাবে যাঁদের নাম বিজেপি কেটেছে, যে ২৭ লক্ষ নাম আন্ডার অ্যাজুডিকেশনের নামে অবৈধ ভাবে কেটেছে, তার মধ্যে ১০ লক্ষের বেশি নাম হিন্দু বাঙালির। আমি সবাইকে অনুরোধ করব, যে সম্প্রদায়েরই হোন, এই বাংলা সবার। আগামিদিন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সবাইকে তাঁর মৌলিক অধিকার, ভোটাধিকার ফিরিয়ে দেবেন। কেউ ভয় পাবেন না, আতঙ্কিত হবেন না। টাকা আটকে রুখতে পারেনি, আমাদের নাম কেটেও আমাদের রুখতে পারবে না। বাংলাদেশি বলে দাগিয়ে দিয়ে আমাদের টাইট করতে পারবে না।’

উন্নয়নের খতিয়ান দিতে গিয়ে আজ অভিষেকের সংযোজন, “মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কোচবিহার সফরে এসে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের কথা বলেছিলেন চার বছর পরে ৪৫ কোটি টাকা খরচা করে ২০১৬ সালে হরিণ চরায় গভর্মেন্ট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ হয়েছে উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন দফতরের উদ্যোগে দেউচড়াই ও দেওয়ানহাট বাজারের সংস্কার হয়েছে। নাটাবাড়িতে গার্লস স্কুল তৈরি হয়েছে। ২০২৩ সালে পঞ্চায়েত নির্বাচনের পর তুফানগঞ্জ এক নম্বর রক বলরামপুর এক নম্বর পঞ্চায়েতে ২১ টি কাঁচা রাস্তা পাকা করার কাজ শুরু হয়েছিল যা ইতিমধ্যেই শেষ হয়েছে। এখানে ষোলটা জিপি মিলিয়ে ৮১ হাজার মহিলা লক্ষ্মীর ভাণ্ডার পায়। এখানে ৩০ হাজার গরিব মানুষের পাকা বাড়ির ব্যবস্থা করে দিয়েছে তৃণমূল সরকার। নাটাবাড়ি মাথাভাঙ্গা তুফানগঞ্জ সিতাই দিনহাটা কোচবিহার গ্রামীণ রাস্তাঘাট সংস্কার করা হয়েছে। এই ১২৮ থেকে ১২৯ কোটি টাকার মধ্যে দশ পয়সাও কেন্দ্রীয় সরকার দেয়নি, নাটাবাড়িতে বিজেপি বিধায়ক থাকা সত্ত্বেও তৃণমূল সেই পরিষেবা মানুষকে দিয়েছে। নাটা বাড়িতে প্রসূতি মায়েদের জন্য সিজার অপারেশন করার ব্যবস্থা যত দ্রুত করা সম্ভব তৃণমূল সরকার করবে। নাটাবাড়ি হাই স্কুলের খেলার মাঠ সংস্কার করবে তৃণমূল সরকার। ”

অভিষেক বলেন, ‘গত পাঁচ বছর অসমের ট্রাইব্যুনালকে ব্যবহার করে রাজবংশী মা-ভাইদের এই কোচবিহার, জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ারে নোটিস পাঠিয়েছে বিজেপি।’ মূল্যবৃদ্ধি নিয়েও বিজেপিকে তোপ দাগেন তিনি।

–
–
