
ভিনসেন্ট ভ্যান গগের আঁকা তৈলচিত্র ‘ অ্যাট ইটারনিটিস গেট ‘ ( At Eternity’s Gate ) দেখেছেন আপনি ?
দেখলে আপনার মন খারাপ হবে। শিল্পী এটি আঁকেন ১৮৯০ সালের মে মাসে। এটি আঁকার দু’মাস পর শিল্পী মারা যান।
কী আছে এই ছবিতে ? একজন টাকমাথা দাড়িওয়ালা বৃদ্ধ কিছুটা ঝুঁকে বসে আছেন একটা চেয়ারে, দুটো হাত মাথার দু’পাশে এবং দুই উরুর উপরে দুই কনুই। কেন ওইভাবে বসে আছেন তিনি ? কী হয়েছে ওঁর ? মুঠো করা হাতে চোখদুটো এবং মুখের অনেকটা অংশ ঢাকা পড়ে গেছে বৃদ্ধ মানুষটির। এটিই কি পৃথিবীর সবচেয়ে বিষাদময় শিল্পকর্ম ? ভেঙে পড়া একজন মানুষের ছবি এর চেয়েও স্পষ্ট করে আর কীভাবে আঁকা যেতে পারতো ? ছবিটা দেখে কারো কারো মনে পড়তে পারে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতার একটা অমোঘ লাইন, ‘ আর কীভাবে মানুষ আমি তোমার জন্য ভাঙবো পাথর… ‘ ।

জীবদ্দশায় ভ্যান গগের আঁকা তৈলচিত্র ও অন্যান্য শিল্পকর্মের দিকে কেউ ফিরেও তাকাতো না। তিনি বেঁচে থাকতে তাঁর মাত্র একটা ছবি বিক্রি হয়েছিল। তাও সেটা কিনেছিলেন তাঁর ভাই। কিন্তু অপঘাতে তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর ছবিগুলো নিয়ে রীতিমত হৈচৈ পড়ে যায় সারা বিশ্বে। লাখ লাখ টাকায় বিক্রি হতে থাকে তাঁর অসামান্য সব চিত্রকর্ম। মাত্র ৩৭ বছরের সংক্ষিপ্ত ( ১৮৫৩ — ১৮৯০ ) আয়ু তাঁর। এর মাঝে মাত্র ১০ বছরে ৯০০ টির বেশি ছবি সৃষ্টি করেন তিনি অবিশ্বাস্য গতিতে। ‘ অ্যাট ইটারনিটিস গেট ‘ ছবির বৃদ্ধ মানুষটির কি সর্বনাশ হয়ে গেছে ? নাকি আসন্ন সর্বনাশের আশঙ্কায় বিধ্বস্ত তিনি ? রবি ঠাকুর লিখে গেছেন ‘ আমার সকল নিয়ে বসে আছি সর্বনাশের আশায়’। যে সর্বনাশের আশায় বসে থাকা যায় সে তো কাঙ্ক্ষিত। ভ্যান গগের সর্বনাশ পুরোটাই অতল কৃষ্ণগহ্বর। মাত্র ৩৭ আয়ুর অনন্য চিত্রশিল্পীর নিজের জীবনটাও তো ছিল অতল বিষাদসিন্ধুর কিনারায় দাঁড়িয়ে পলাতকা যত ঢেউ গোনা। বৃদ্ধ হওয়ার সুযোগই তো পেলেন না মরমী শিল্পী।
তবুও তাঁর সবচেয়ে ব্যাথাতুর শিল্পকর্মের নায়ক এক বৃদ্ধ ! ভিনসেন্ট ভ্যান গগের জন্ম নেদারল্যান্ডসে, মৃত্যু ফ্রান্সে। শিল্পকলার ইতিহাসে এক রহস্যময় চরিত্র ভ্যান গগ। তাঁর ছোট্ট জীবনের পরতে পরতে রহস্য। মৃত্যুর ১৩০ বছর পরেও তাঁকে নিয়ে মানুষের আগ্রহের শেষ নেই। অনন্ত অবসাদ, সীমাহীন বিতৃষ্ণা আর তথাকথিত ব্যর্থতায় ঢাকা ছিল তাঁর চারুকলার আকাশ। তাঁর ভাই আন্দ্রিস বঙ্গারের বক্তব্য অনুযায়ী, গুলিবিদ্ধ হওয়ার দিন সকালে ভ্যান গগ এঁকেছিলেন একটা জঙ্গলের দৃশ্য। সেখানে আলো ছিল। জীবন ছিল। ছবিটার নাম ‘ ট্রি রুটস্ ‘। ডাবল স্কয়ার ক্যানভাসের উপর আঁকা ছবিটা কেমন যেন অসম্পূর্ণ। শিল্প গবেষকরা মনে করেন, এই ছবির ওপর অন্তত আরও একটি রঙের প্রলেপ দেওয়া বাকি ছিল।

একটা সরাইখানায় কেটেছিল শিল্পীর জীবনের শেষ ৭০ দিন। ডাচ চিত্রশিল্পী ভ্যান গগ ফ্রান্সের গ্রাম আউভার্স – সুর – ওয়াজে ( এই গ্রামটি প্যারিসের কাছাকাছি) একটি গমক্ষেতে ( ২৭ জুলাই,১৮৯০ ) রিভলভার দিয়ে নিজের বুকে গুলি করেন। গুরুতর আহত অবস্থায় ফিরে আসেন আউভার্স রাভউ-তে তাঁর ঘরে এবং দু’দিন পর তাঁর ভাইয়ের উপস্থিতিতে মারা যান ২৯ জুলাই। অভাব, একাকীত্ব ও গভীর অবসাদের সঙ্গে তাঁর জীবনে যুক্ত হয়েছিল হ্যালুসিনেশন, বাইপোলার ডিসর্ডার এবং সিজোফ্রেনিয়ার মতো কঠিন মানসিক সমস্যা । তাঁর শেষ সময়ে পাশে ছিলেন তাঁর ভাই। তাঁর শেষ কথা ছিল, ‘ দুঃখ চিরকাল থাকবে ‘ । মৃত্যুর মাস কয়েক আগে এঁকেছিলেন বড়ই মর্মস্পর্শী, বেদনাবিধুর ও হৃদয়বিদারক ছবি ‘ অ্যাট ইটারনিটিস গেট’ । ছবিটার শিরোনাম ছিল, Sorrowing Old Man ( At Eternity’s Gate ) , দুঃখী, বিষাদগ্রস্ত বৃদ্ধ । মনে রাখতে হবে, মৃত্যুর আগের বছরে অর্থাৎ ১৮৮৯ সালে ভ্যান গগ এঁকেছিলেন ‘ Self Portrait with Bandaged Ear ‘, সেল্ফ পোর্ট্রেট উইথ ব্যান্ডেজড ইয়ার। এটি ছিল তাঁর আত্ম – প্রতিকৃতি। এক রাতে ক্ষুর দিয়ে নিজের বাঁ কানের একটি অংশ কেটে ফেলেন তিনি। অতএব রক্ত বন্ধ করতে ব্যান্ডেজ করতে হয় সেখানে। সেটাও এঁকে ফেলেন ভ্যান গগ। তীব্র মানসিক অস্থিরতায় এমন ভয়ঙ্কর কান্ড ঘটান তিনি। এইভাবে চলতে চলতে একসময় খাদের একেবারে কিনারায় এসে দাঁড়ান শিল্পী, যেখান থেকে আর ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন নি তিনি।

আরও পড়ুন- বিজেপিকে ধরাশায়ী করে সরকার ছাড়ার হুঁশিয়ারি তিপ্রা মথা প্রধানের! চাপে গেরুয়া শিবির

_

_

_
_
_
_
