
” বুড়ি চোখ মেলিয়া ফ্যালফ্যাল করিয়া মুখের দিকে চাহিয়াই রহিল, তাহার মুখে কোনো উত্তর শুনা গেল না। ফণী আবার ডাকিল — কেমন আছেন পিসিমা? শরীর কি অসুখ মনে হচ্ছে? পরে সে গঙ্গাজলটুকু মুখে ঢালিয়া দিল। জল কিন্তু মুখের মধ্যে গেল না, বিশু পালিত বলিল — আর একবার দাও দাদাঠাকুর — আর খানিকক্ষণ পরে ফণী বুড়ির চোখের পাতা বুঝাইয়া দিতেই কোটরগত অনেকখানি জল শীর্ণ গাল-দুটো বাহিয়া গড়াইয়া পড়িল । ইন্দির ঠাকরুনের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে নিশ্চিন্দিপুর গ্রামে সেকালের অবসান হইয়া গেল। ”

কে এই ইন্দির ঠাকরুন? ইনি হলেন বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস ‘ পথের পাঁচালী ‘ – র অন্যতম কেন্দ্রীয় চরিত্র হরিহরের দূর সম্পর্কের পিসি, অতিশয় বৃদ্ধা , বিধবা ও নিঃসন্তান, একেবারেই সহায়সম্বলহীন । তৎকালীন সমাজে বল্লালী বা কৌলিন্য প্রথার শিকার হয়ে চরম অবহেলা ও অনাহারে দিন কাটতো তাঁর। সংসার ও সমাজে ইন্দির ঠাকরুন ছিলেন প্রায় অবাঞ্ছিত। তাঁর জীবন যেন মনুষ্যত্বের চরম অবমাননার উদাহরণ। অকাল বৈধব্যে দিশেহারা এই বুড়ির অপু ও দুর্গার সঙ্গে মধুর সম্পর্ক থাকলেও মনে শান্তি ছিল না। তিনি ছিলেন সর্বজয়ার দু’চক্ষের বিষ। এই ফাটলের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল দারিদ্র্য। ” সর্বজয়া বলিল — যাও আর বসে থেকো না ঠাকুরঝি, বেলা হয়ে যাচ্ছে আমার কাজকর্ম আছে, এখানে তোমার জায়গা কোনোরকমে দিতে পারবো না — বুড়ি পুঁটুলি লইয়া অতিকষ্টে আবার উঠিল। বাহির দরজার কাছে যাইতে তাহার নজর পড়িল তাহার উঠান-ঝাঁটের ঝাঁটাগাছটা পাঁচিলের কোনে ঠেস দেওয়ানো আছে। আজ তিন-চারি মাস তাহাতে কেহ হাত দেয় নাই। এই ভিটার ঘাসটুকু, ওই কত যত্নে পোঁতা লেবুগাছটা, এই অত্যন্ত প্রিয় ঝাঁটাগাছটা, খুকি, খোকা , ব্রজ পিসের ভিটা– তার সত্তর বছরের জীবনে এসব ছাড়া সে আর কিছু জানেও নাই, বুঝেও নাই। চিরকালের মতো তাহারা আজ দূরে সরিয়া যাইতেছে।”

চরম দারিদ্র , অসহায়ত্ব, নিঃসঙ্গতা এবং বয়সের ভারে ন্যুব্জ হলেও তাঁর আত্মসম্মানবোধ ছিল প্রখর। তুচ্ছ কারণে সর্বজয়ার মুখঝামটা সহ্য করতে না পেরে তিনি বহুবার ঘর ছেড়ে চলে যেতেন অজানার উদ্দেশে। কালের করাল থাবায় জীর্ণ শরীরেও তিনি স্থবির হয়ে পড়েন নি। ইন্দির ছিলেন বাংলার লোকসংস্কৃতি, ব্রত , ছড়া ও সঙ্গীতের এক জীবন্ত ভাণ্ডার। তাঁর কণ্ঠে কথকতা, সুর ও স্মৃতিগাথা গ্রামীণ পরিবেশকে এক মায়াবী আলোয় উদ্ভাসিত করতো নিত্যদিন। পরিবারের শিকড় ও সংস্কৃতির সঙ্গে নবীন প্রজন্মের অপু ও দুর্গাকে তিনিই যুক্ত রাখতেন। আজও আধুনিক সমাজে
একান্নবর্তী পরিবার লোপ পাওয়ার ফলে আর্থিক সমস্যা না থাকলেও অসংখ্য বৃদ্ধা ইন্দির ঠাকরুনের মতো নিঃসঙ্গ জীবন যাপন করতে বাধ্য হন।

তবে একথাও বলতে হবে যে, নিষ্ঠুর সংসারে ইন্দিরের দুঃখের দোসর ছিল দুর্গা। সেও তো আরেক উপেক্ষিতা। মায়ের বকুনি ও পরিবারের শাসন উপেক্ষা করেও ইন্দিরের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতো ছোট্ট বালিকা দুর্গা। সে ছিল বুড়ির আনন্দের উৎস। ডানপিটে মেয়েটি বুড়ির সঙ্গে গোপনে খাবার ভাগ করে খেতো। এক অর্থে, দুর্গা ছিল বৃদ্ধার হারিয়ে যাওয়া জীবনের সোনালী স্মৃতির প্রতিচ্ছবি। আসলে দুর্গা ও ইন্দির ঠাকরুন তো একটা গোটা জীবনের শুরু ও শেষ। সর্বজয়া নয়, যেন ইন্দির ঠাকরুনেরই সন্তান ছিল দুর্গা।

আর দিদি দুর্গা ? এমন দিদি আর কি পাওয়া যাবে বিশ্বসংসারে? দুর্গাই তো একমাত্র দিদি, যার অপুর মতো হাজার হাজার ভাই আছে। শুধু বাংলা নয়, সর্বকালের বিশ্বসাহিত্যে ইন্দির ঠাকরুনের মতো এমন ‘ বিপন্ন বিস্ময় ‘ এবং দুর্গার মতো এমন ‘ প্রকৃতির কন্যা ‘ আর পাওয়া যাবে কি? দুর্গার মুগ্ধ চোখের দিকে তাকিয়ে বৃদ্ধার ফোকলা দাঁতের সেই অবিস্মরণীয় হাসি, সর্বজয়ার সঙ্গে ঝগড়া করে কয়েকদিনের জন্য উধাও হয়ে যাওয়া, সর্বজয়ার মারের হাত থেকে প্রিয় দুর্গাকে বাঁচাতে জরাজীর্ণ লোলচর্মসার শরীরে ঝাঁপিয়ে পড়া অমর হয়ে থাকবে বাংলা সাহিত্যে।

আরও পড়ুন- পুলিশের মদতে বিজেপির গুন্ডাদের ষড়যন্ত্র! হামলার অভিযোগে আদালতে যাওয়ার বার্তা অভিষেকের

_

_
_
_
_
