দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুকে পিছনে ফেলে ভারতের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশিদিনের প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন নরেন্দ্র মোদি। দেশজুড়ে বিজেপির ধান্দাবাজ নেতা-কর্মী থেকে হোয়াটসঅ্যাপ ইউনিভার্সিটির অন্ধভক্তরা ভণ্ড বিশ্বগুরুর ১২ বছরের প্রধানমন্ত্রিত্ব উদযাপন করছেন। আদানি-অম্বানির মতো পুঁজিপতিদের দৌলতে ফ্যাসিবাদী সরকারের গদিতে বসে থাকা ভাড়াটে মিডিয়াও ৫৬ ইঞ্চি ছাতির এই ১২ বছরের শাসনকালকে ‘ঈশ্বরের আশীর্বাদ’ হিসেবে প্রচার করছে। কিন্তু নরেন্দ্র মোদির এই বড়লোকেদের সরকার ১২ বছরের শাসনকালে যেভাবে দেশের বারোটা বাজিয়েছে, সেই কথা কেউ বলছে না! নরেন্দ্র মোদির এই ১২ বছরের হিন্দুত্ববাদী কর্পোরেট সরকার কীভাবে দেশকে উচ্ছন্নে পাঠিয়েছে, সেই কথা কেউ বলছে না!

দেশজুড়ে উৎসবের মেজাজে মোদি সরকারের একযুগ পূর্তির ফুর্তি চলছে। কিন্তু গত একযুগে যেভাবে ভারতের ঘাড়ে ঋণের বোঝা বেড়েছে, যেভাবে বেকারত্ব-দারিদ্র থেকে পেট্রোল-ডিজেল ও রান্নার গ্যাসের দাম আকাশ ছুঁয়েছে, যেভাবে রাজ্যস্তর থেকে সর্বভারতীয় পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস আর পরীক্ষা বাতিলে যুবসমাজের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তায় ডুবেছে, যেভাবে ভারতীয় টাকার মূল্যপতনে দেশের অর্থনীতি ধসে পড়ছে— এসব প্রশ্ন করছে না দেশের মেইনস্ট্রিম মিডিয়া। কেউ প্রচার করছে না— কীভাবে শিল্পের নামে ১২ বছরে পাহাড়-জঙ্গল ধূলিসাৎ করে আদানি-আম্বানিদের পকেট ভরেছে, কীভাবে ‘সবকা সাথ সবকা বিকাশ’-এর নামে বিকাশ হয়েছে শুধু দেশের ১ শতাংশ শিল্পপতির, কীভাবে ‘পিএম কেয়ার ফান্ড’-এর নামে জনগণের ১৪ হাজার কোটি টাকা হাওয়ায় উবে গিয়েছে! এমনকী, ১২ বছরে উরি, পুলওয়ামা, পহেলগাঁও থেকে খাস রাজধানী দিল্লিতে সন্ত্রাসবাদী হামলা কিংবা আহমেদাবাদের বিমান দুর্ঘটনায় কেউ মোদি সরকারের জবাবদিহিতা দাবি করছে না!

একনজরে দেখে নেওয়া যাক ১২ বছরে মোদি সরকারের ১২ ভণ্ডামি—

১) ঋণের বোঝা : ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট অনুযায়ী, বর্তমানে ভারত সরকারের মোট বকেয়া অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক ঋণের পরিমাণ ১৯৭.১৮ লক্ষ কোটি টাকা। চলতি অর্থবর্ষ শেষ হতে হতে ঋণের এই অঙ্কটা ২১৫ লক্ষ কোটি টাকারও বেশি হবে বলে অনুমান।

২) অর্থনীতির ধস : আনুমানিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলারের জিডিপি নিয়ে ভারত বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহত্তম অর্থনীতি! কিন্তু এই জিডিপি-র কঙ্কালসার চেহারাটা কেউ প্রকাশ করে না। যেখানে আমেরিকা ও চিনের জিডিপি বিশ্বের অর্থনীতিতে ৫০ শতাংশেরও বেশি অবদান রাখে, সেখানে বিশ্বগুরু ভারতের ষষ্ঠ বৃহত্তম জিডিপি-কে পাকিস্তান-বাংলাদেশের সঙ্গে তুলনা করে ছাতি চওড়া করে মোদি সরকারের পোষা গোদি মিডিয়া।

৩) প্রশ্নপত্র ফাঁস ও পরীক্ষা বাতিল : মোদি সরকারের ১২ বছরে রাজ্যস্তর থেকে শুরু করে সর্বভারতীয় পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসে ধুঁকছে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা। শেষ ১০ বছরে প্রায় ৯০টি সরকারি ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস ও পরীক্ষা বাতিলে দেশের যুবসমাজের ভবিষ্যৎ অন্ধকার।

৪) আকাশছোঁয়া মূল্যবৃদ্ধি : মোদি সরকারের ১২ বছরে আকাশ ছুঁয়েছে বাজারদর। পেট্রোল-ডিজেল থেকে রান্নার গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি চরমে উঠেছে। ২০১৪ সালে যেখানে দেশে পেট্রোলের দাম লিটার প্রতি ৬৫ থেকে ৭০ টাকা এবং ডিজেলের দাম লিটার প্রতি ৫৫ থেকে ৬০ টাকার মধ্যে— বিশ্বগুরু মোদির জমানায় সেই পেট্রোপণ্যের দাম একশো ছাড়িয়েছে!

৫) শিল্প-কর্মসংস্থানের নামে দেশ-বিক্রি : বিশ্বের শীর্ষ ১০০টি শিল্পের মধ্যে একটিও ভারতীয় শিল্প নেই। বিগত কয়েকবছরে বহু বিদেশি সংস্থা দেশ ছেড়ে চলে গিয়েছে। নোটবন্দি এবং অপরিকল্পিত জিএসটি বহু ছোট ও মাঝারি ব্যবসাকে ধ্বংস করেছে। একযুগ ধরে শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ছোট ব্যবসাকে চাঙ্গা করার গালভরা প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি দিলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন ঘটেনি।
৬) গরিব-বিরোধী সরকারের দারিদ্র-ব্যর্থতা : শীর্ষ ৫ শতাংশ পুঁজিপতিদের দৌলতে ভারত বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহত্তম অর্থনীতি হলেও দেশে আজও মোট জনসংখ্যার আনুমানিক ২৭ শতাংশ মানুষ দারিদ্রসীমার নিচে বাস করেন। ১২ বছর ধরে দেশের গরিব সাধারণ মানুষকে ‘সবকা সাথ সবকা বিকাশের’ নামে মিথ্যা স্বপ্ন বিক্রি করেছে বিজেপি সরকার।
৭) কৃষক-বিরোধী সরকার : অপরিশোধিত ঋণ, কৃষি বিপর্যয়, জলবায়ু পরিবর্তন এবং প্রতিকূল বাজার ব্যবস্থার জেরে দৈনদশা দেশের কৃষকদের। জাতীয় অপরাধ রেকর্ড ব্যুরোর সর্বশেষ রিপোর্ট অনুযায়ী, দেশে প্রতিবছর ১০,০০০-এরও বেশি কৃষক ও কৃষি শ্রমিক আত্মহননের পথ বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছেন। আর মোদি সরকারের ১২ বছরে দেশজুড়ে ১,২১,৮০৬ জন কৃষক আত্মহত্যা করেছেন।
৮) মহিলা-সুরক্ষার ভাঁওতাবাজি : নারী-সুরক্ষা ও নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে মোদি সরকার ১২ বছর ধরে অনেক ভাষণ দিয়েছে। কিন্তু আসল সত্যিটা হল, মহিলাদের জন্য বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক দেশের মধ্যে একটি ভারত! একযুগ ধরে সরকার চালিয়েও মহিলাদের দৈনন্দিন নিরাপত্তা ও অপরাধ দমনের জন্য কার্যকর কোনও জাতীয় আইন বা ব্যাপক নীতি গ্রহণ করা হয়নি।
৯) বেকারত্ব ও কর্মসংস্থান : শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণের অভাবে এবং প্রয়োজনের তুলনায় কম কর্মসংস্থানের জেরে দেশজুড়ে বেকারত্ব বেড়েই চলেছে। ন্যাশনাল স্যাম্পেল সার্ভের একটি গোপন সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, ২০১৭-১৮ সালে দেশে বেকারত্বের হার ছিল ৬.১ শতাংশ, যা গত ৪৫ বছরে সর্বোচ্চ!
১০) অপদার্থ সরকারের দুর্বল পররাষ্ট্র নীতি : স্বাধীনতার ৮০ বছর পেরিয়ে এসে এই প্রথম মোদি জমানায় ভারতের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে। মোদি সরকারের বিদেশনীতি নিয়ে গোদি মিডিয়ায় আগ্রাসী বিশ্বগুরু ভাবমূর্তি প্রচারের আড়ালে আমেরিকার তাবেদারিতে ব্যস্ত ভারতের প্রধানমন্ত্রী। এপস্টিন ফাইলে ৫৬ ইঞ্চির ভণ্ডামি ঢাকতে কার্যত আমেরিকার অঙ্গুলিহেলনেই দেশ চালাচ্ছে মোদি সরকার।
১১) মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ : ১২ বছরের ফ্যাসিবাদী মোদি সরকারের সবচেয়ে বড় চক্রান্ত, গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভের উপর নিয়ন্ত্রণ! গত একযুগে দেশের মেইনস্ট্রিম মিডিয়াকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পকেটে পুরেছে মোদি-ঘনিষ্ঠ আদানি ও আম্বানি গোষ্ঠী। তারপর থেকেই সাংবাদিকতার মূল ভিত্তি— সরকারকে প্রশ্ন করার ক্ষমতা হারিয়েছে ভারতের গণমাধ্যম।
১২) সামাজিক বিভাজন ও ধর্মীয় মেরুকরণ : মোদি জমানায় দেশের ধর্মনিরপেক্ষতা ও গণতান্ত্রিক কাঠামো ক্ষুণ্ন হওয়ার পাশাপাশি সামাজিক সম্প্রীতি নষ্ট হয়েছে! ২০১৪ সাল থেকে হিন্দুত্ববাদী আদর্শকে সামনে রেখে উগ্র জাতীয়তাবাদী প্রচার ও ঘৃণা-ভাষণের মাধ্যমে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করার চেষ্টা হয়েছে।
