অষ্টাদশ বিধানসভার (Assembly) প্রথম অধিবেশন শুরু হল বৃহষ্পতিবার। প্রথা মাফিক রাজ্যপাল রবীন্দ্র নারায়ণ রবির (R N Ravi) ভাষণ দিয়ে অধিবেশন শুরু হয়। কিন্তু সেই ভাষণ ঘিরেই শুরু রাজনৈতিক বিতর্ক। সাংবিধানিক রীতিনীতি অনুযায়ী রাজ্যপালের (Governor) ভাষণে সরকারের আগামী দিনের নীতিগত রূপরেখা তুলে ধরার কথা। কিন্তু এবারের ভাষণে প্রশাসনিক কর্মপরিকল্পনার চেয়ে রাজনৈতিক বক্তব্যই বেশি জায়গা পেয়েছে। বিধানসভা অধিবেশনের সূচনায় রাজ্যপালের এই ভাষণ লিখে দেয় সরকারপক্ষ। কাজেই সেখানে সরকারের বক্তব্য এবং মনোভাব প্রতিফলিত হবে সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সাধারণত প্রশাসনিক বিষয়গুলিকেই তুলে ধরা হয় ভাষণে। সরাসরি রাজনৈতিক ভাষ্য এড়িয়ে চলা হয়। কারণ রাজ্যপাল পদটি সমস্ত দলমতের ঊর্ধ্বে। তবে বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকার স্থাপনের বিগত এক যুগে বিভিন্ন রাজ্যের রাজ্যপাল নিজের সাংবিধানিক খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসছেন। এদিন, রাজ্যপাল রবির ভাষণ ঘিরে প্রশ্ন, এটি সরকারের নীতিপত্র, না বিজেপির নির্বাচনী ইস্তাহারের সম্প্রসারিত সংস্করণ?

অনুপ্রবেশ, জনসংখ্যার ভারসাম্য নষ্ট হওয়া, সিন্ডিকেট রাজ, তোলাবাজি, বন্দে মাতরম বাধ্যতামূলক করা, আগের সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ- একের পর এক রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর বিষয় উঠে এসেছে এদিন রাজ্যপালের ভাষণে। সবচেয়ে বেশি বিতর্ক তৈরি হয়েছে অনুপ্রবেশ প্রসঙ্গে। রাজ্যপাল দাবি করেছেন, দীর্ঘদিনের অবৈধ অনুপ্রবেশে পশ্চিমবঙ্গের জনসংখ্যার ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে এবং প্রকৃত নাগরিকরা বঞ্চিত হয়েছেন। সেই সঙ্গে অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের শনাক্ত করে ফেরত পাঠানোর সরকারি উদ্যোগের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

বিরোধীদের প্রশ্ন, জনসংখ্যার ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার এই দাবি কোন সরকারি সমীক্ষা বা তথ্যের ভিত্তিতে করা হল? বিধানসভার মঞ্চকে ব্যবহার করে কি রাজনৈতিক মেরুকরণের বার্তা দেওয়া হচ্ছে?

বিতর্কের আরেকটি বড় কেন্দ্র ‘বন্দে মাতরম’। রাজ্যের সমস্ত সরকারি স্বীকৃত স্কুল ও মাদ্রাসায় বন্দে মাতরম গাওয়া বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্তের কথা রাজ্যপাল (R N Ravi) নিজেই তুলে ধরেছেন। বিরোধীদের একাংশের মতে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দেশপ্রেমের নামে মতাদর্শ চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। বিশেষ করে মাদ্রাসার উল্লেখকে কেন্দ্র করে নতুন করে সংখ্যালঘু রাজনীতির বিতর্কও উসকে উঠতে পারে।

ভাষণে বারবার উঠে এসেছে ‘সিন্ডিকেট’, ‘তোলাবাজি’, ‘অবৈধ কয়লা পাচার’, ‘মানবপাচার’ এবং ‘শাসকের আইন’-এর মতো শব্দবন্ধ। রাজ্যপালের বক্তব্য, নতুন সরকার আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করেছে এবং আগের আমলের সমজবিপোধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে। কিন্তু বিরোধীদের বক্তব্য, কোনও সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক অভিযোগ থাকতেই পারে, কিন্তু রাজ্যপালের সাংবিধানিক ভাষণে সেই রাজনৈতিক আক্রমণ শোভা পায় না।

কেন্দ্রীয় প্রকল্পের প্রসঙ্গেও রাজনৈতিক বার্তা স্পষ্ট। ভাষণে দাবি করা হয়েছে, এতদিন পশ্চিমবঙ্গের মানুষ প্রধানমন্ত্রী বিশ্বকর্মা, কুসুম, উজ্জ্বলা ৩.০, খেলো ইন্ডিয়ার মতো প্রকল্পের সুবিধা থেকে বঞ্চিত ছিলেন। এখন সেগুলি কার্যকর করা হবে। বিরোধীদের প্রশ্ন, এতদিন কেন্দ্র ও বিজেপি নেতৃত্ব এই বঞ্চনার কথা জেনেও কী পদক্ষেপ নিয়েছিল?
আরও খবর: বিধানসভাতে ‘বাছাই’ নীতি, ব্রাত্য ‘জাগো বাংলা’-সহ একাধিক সংবাদমাধ্যম

শুধু সমালোচনা নয়, অভিভাষণে সরকারের রাজনৈতিক দর্শনেরও স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা গিয়েছে। জাতীয় শিক্ষা নীতি, সীমান্ত সুরক্ষা, অনুপ্রবেশ রোধ, কেন্দ্রীয় প্রকল্প বাস্তবায়ন, শিল্পায়নের নতুন মডেল— সব মিলিয়ে বিজেপির দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অবস্থানই যেন বিধানসভার মঞ্চ থেকে পুনরায় উচ্চারিত হয়েছে।

ফলে অধিবেশন শুরুর আগেই নতুন বিতর্কের কেন্দ্রে রাজ্যপালের ভাষণ। বিরোধীদের দাবি, এটি নিরপেক্ষ সাংবিধানিক অভিভাষণের চেয়ে অনেক বেশি রাজনৈতিক দলিল। অন্যদিকে সরকারের বক্তব্য, জনগণের ম্যান্ডেট অনুযায়ী নতুন সরকারের নীতিগত অবস্থানই রাজ্যপালের ভাষণের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে।
–
–
