
টোটাল ফুটবলের মৃত্যু নেই। রূপকথা নয়, এটা একটা দর্শন। যতদূর জানা যায় এই দর্শনের স্রষ্টা রাইনাস মিশেল। ১৯৭৪ বিশ্বকাপের ফাইনালে টোটাল ফুটবল ব্যর্থ হয়েছিল মাঠের বাইরের এক অতি নোংরা খেলার বিরুদ্ধে। হেরেছিল দুর্ধর্ষ নেদারল্যান্ডস। জিতেছিল তৎকালীন পশ্চিম জার্মানি । আয়াস্ক এবং ডাচ বাহিনীর কোচ রাইনাস মিশেল উদ্ভাবন করেছিলেন এক অনবদ্য ফুটবল সিস্টেম, যা ফুটবল দুনিয়াকে চমকে দিয়েছিল নয়নাভিরাম সংঘবদ্ধ ঐকতানে, যা ছিল একইসঙ্গে সৃষ্টিশীল, প্রাণবন্ত এবং ফলপ্রসূ , যার নাম টোটাল ফুটবল। ফুটবলে এসেছিল নয়া দিগন্ত। গুরু মিশেলের শিষ্যদের মুখোমুখি হতে বুক কাঁপতো যে কোন প্রতিপক্ষের। জোহান ক্রুয়েফ, হ্যানসেন, হান, হ্যানেগেন, নিসকেনস প্রমুখ তারকাসমৃদ্ধ ডাচ বাহিনীকেই ফুটবল পন্ডিত ও বিশেষজ্ঞরা ১৯৭৪ বিশ্বকাপের সম্ভাব্য চ্যাম্পিয়ন হিসেবে ধরে নিয়েছিলেন। কিন্তু বাস্তবে তা ঘটে নি। তীরে এসে ডুবে যায় তরী। অপ্রতিরোধ্য কমলা বাহিনীর অশ্বমেধের ঘোড়া একেবারে বিপর্যস্ত হয়েছিল ফাইনালে। সে এক রোমহর্ষক ঘটনা। কিন্তু তার আগে জেনে নিতে হয় টোটাল ফুটবলের মূল বৈশিষ্ট্যগুলো।

টোটাল ফুটবল হলো ফুটবলের এমন একটি বৈপ্লবিক কৌশলগত অবস্থা , যেখানে দলের খেলোয়াড়দের কোনো নির্দিষ্ট বা ফিক্সড পজিশন থাকে না। গোলকিপার বাদে বাকি ১০ জন খেলোয়াড় যে কোনো মুহূর্তে তাদের পজিশন অদলবদল করে আক্রমণ ও রক্ষণে ভারসাম্য বজায় রাখতে পারে। ১৯৭০- এর দশকে রাইনাস মিশেল ও জোহান ক্রুয়েফের হাত ধরে আয়াস্ক আমস্টারডাম এবং নেদারল্যান্ডস জাতীয় দল এই সিস্টেমকে জনপ্রিয় করে তোলে। একজন আক্রমণে গেলে অন্যজন তার রক্ষণের জায়গাটি কভার করে, ফলে দলের সাংগঠনিক কাঠামোটি অটুট থাকে। প্রতিপক্ষকে সবসময় চাপে রাখার জন্য ইচ্ছেমতো মাঠকে বড়ো করা ও ছোট করা এই সিস্টেমের অন্যতম কৌশল। খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ করে খেলার রাশ সবসময় নিজেদের হাতে রাখাও এখানে খুব গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়াও, বল হারানোর সাথে সাথেই তীব্র চাপের ( প্রেসিং ফুটবল ) মাধ্যমে সেই বল কেড়ে নিয়ে নিজেদের দখলে রাখাও এই সিস্টেমের অন্যতম ফসল। বুদ্ধিমত্তা , নমনীয়তা ও নিবিড় অনুশীলন ছাড়া এই কৌশল রপ্ত করা সহজ নয়। আধুনিক ফুটবলে প্রেসিং ও পজিশনাল প্লে ছাড়া ম্যাচ জেতা প্রায় অসম্ভব। এই সিস্টেমের মূল দর্শন হলো গোটা দলটাই একসাথে আক্রমণ ও একসাথে রক্ষণ করবে। এমন ফুটবল অর্কেস্ট্রেশন দারুণ উত্তেজক এবং দৃষ্টিনন্দন।

১৯৭৪ বিশ্বকাপে ফাইনাল ম্যাচের আগেই দুরন্ত ডাচ বাহিনীকে দেখে পশ্চিম জার্মানি বুঝে যায় যে, শুধুমাত্র মাঠের ফুটবল দিয়ে জোহান ক্রুয়েফদের হারানো প্রায় অসম্ভব। তাই মাঠের বাইরে এমন কোনো খেলা খেলতে হবে যা ডাচদের মনোবল একেবারে দুমড়ে মুচড়ে দেবে। যদিও সেবার পশ্চিম জার্মানির দলটাও ছিল ভীষণ শক্তিশালী। সেই দলে ছিলেন গার্ড মুলার, পল ব্রাইটনার, বনহফ, বার্টি ফোকটস, বেকেনবাওয়ার, হেইঙ্কস প্রমুখ। ফাইনালে ম্যাচের দু’মিনিটে ডাচরা নিসকেনসের গোলে এগিয়ে গেলেও শেষপর্যন্ত হেরে যায়। পশ্চিম জার্মানির হয়ে গোল করেন ব্রাইটনার ও মুলার।
কিন্তু কেন হেরেছিল সেবারের দুর্দান্ত ডাচ দল ?

ফুটবলে ‘ মাইন্ড গেম ‘ বা স্নায়ুযুদ্ধ খুব গুরুত্বপূর্ণ। যে কোনো বড়ো ম্যাচের আগে যুযুধান দু’পক্ষের মধ্যে এই যুদ্ধ চলতে থাকে মূলত কথার অস্ত্রে প্রতিপক্ষকে মানসিকভাবে বিধ্বস্ত করার জন্য। এই কৌশল প্রাচীন। আবার যুদ্ধে ও প্রেমে নাকি যে কোনো অন্যায়ই সিদ্ধ, এই আপ্তবাক্য অনুসরণ করে খেলার আগেই মাঠের বাইরে নোংরা খেলা ও নানা ষড়যন্ত্রের আশ্রয় নেয় কোনো কোনো প্রতিপক্ষ । ১৯৭৪ বিশ্বকাপের ফাইনাল ম্যাচের আগে মাঠের বাইরে এক নোংরা খেলা খেলেছিল পশ্চিম জার্মানি। তাদের দেশের একটি জনপ্রিয় পত্রিকা ‘ বিল্ড ‘ ফাইনাল ম্যাচের কয়েকদিন আগেই খুব আপত্তিকর শিরোনামে এক বিশেষ প্রতিবেদন ছাপে। সেখানে লেখা হয়, বিশেষ সূত্রে নাকি জানা গেছে যে, ডাচ খেলোয়াড়রা

একটা পার্টিতে মদ্যপান করে উদ্দাম নৃত্যে মেতেছিলেন পরনারীদের নিয়ে। সেই পার্টির কোনো ছবি কিন্তু তারা ছাপে নি। সূত্রও তারা উল্লেখ করে নি। তবু এই সংবাদ প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে তোলপাড় শুরু হয় বিশ্ব জুড়ে। মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন ডাচ ফুটবলাররা। এমনকি এই মিথ্যা মনগড়া খবরে ভীষণ প্রভাবিত হয়ে পড়েন ডাচ খেলোয়াড়দের স্ত্রী ও বান্ধবীরা এবং তাঁরা ফুটবলারদের সঙ্গে বাক্যালাপ বন্ধ করে দেন। এর ফল হয় মারাত্মক। খেলায় মনোনিবেশ করা একপ্রকার অসম্ভব হয়ে পড়ে। হেরে যায় নান্দনিক ফুটবলের পতাকাবাহী নেদারল্যান্ডস। কিন্তু হেরে গেলেও সারা দুনিয়ার ফুটবল পাগলদের হৃদয়ে চিরস্থায়ী জায়গা করে নেয় নেদারল্যান্ডস এবং জয় হয় টোটাল ফুটবলের।

আরও পড়ুন- দিল্লি বিমানবন্দরে ৪৫ মিনিট আটকে রইল প্রধানমন্ত্রীর কনভয়, কিন্তু কেন?

_

_
_
_
_
