Friday, May 15, 2026

‘বাউল সাংবাদিক’, উৎপল সিনহার কলম

Date:

Share post:

উৎপল সিনহা

হরি দিন তো গেল সন্ধ্যা হলো
পার করো আমারে
তুমি পারের কর্তা জেনে বার্তা
তাই ডাকি তোমারে ।

হরিনাথ মজুমদার ( ১৮৩৩–১৮৯৬ ) ( যিনি কাঙাল হরিনাথ নামে সমধিক পরিচিত ) ছিলেন ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলা লোকসংস্কৃতির অন্যতম ধারক ও বাহক । তিনি বাউল সঙ্গীতের অন্যতম পথিকৃৎ । তাঁর আরেকটি পরিচিত নাম ফকিরচাঁদ বাউল । এছাড়াও এই মেধাবী মানুষটি প্রসিদ্ধ ‘ গ্রামবার্তা প্রকাশিকা ‘ নামক পত্রিকা প্রকাশক হিসেবে । হরিনাথ ছিলেন একাধারে কবি , লেখক , বাউল , গায়ক এবং সাংবাদিক । তাঁর লেখা উপন্যাস ‘ বিজয় বসন্ত ‘ প্রথম প্রকাশিত বাংলা উপন্যাসের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে । এটি প্রকাশিত হয় ১৮৫৯ সালে ।

আমি আগে এসে
ঘাটে রইলাম বসে
যারা পাছে এলো আগে গেল
আমি রইলাম পড়ে ।

১৮৬৩ সালের এপ্রিল মাসে প্রকাশিত গ্রামবার্তা প্রকাশিকা ছিল একটি বাংলা সাপ্তাহিক সংবাদপত্র । এই পত্রিকা প্রথমদিকে কলকাতার গিরিশ বিদ্যারত্ন প্রেসে ছাপা হতো । ১৮৬৪ সালে কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে মথুরানাথ প্রেসে এটি স্থানান্তরিত হয় ।

তাদের পারের সম্বল
তোমার নামটি কেবল
তারা নিজবলে গেল চলে
অকুল পারাবারে ।

মনে রাখতে হবে , গ্রামীণ সাংবাদিকতার পথিকৃৎ হরিনাথ মজুমদার ছিলেন তৎকালীন সময়ের নারী শিক্ষার অগ্রদূত । এই অসামান্য বাউল শিল্পী কাগজের সম্পাদনা ছাড়াও সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠক তথা সংস্কারক হিসেবেও বিভিন্ন উল্লেখযোগ্য কাজ করে গেছেন । তাঁর সমগ্র জীবন যেন এক নিবিড় সাধনা ।

শুনি কড়ি নাই যার
তারে তুমি কর পার
আমি দীনভিখারি
নাইতো কড়ি
দেখো ঝুলি ঝেড়ে ।

তৎকালীন বৃটিশ ভারতের নদীয়া জেলার কুমারখালীতে ( বর্তমান বাংলাদেশের কুষ্টিয়া ) জন্মগ্রহণ করেন হরিনাথ । শৈশবেই মা ও বাবাকে হারান । তাঁর পিতা হরচন্দ্র মজুমদার । ছোটবেলায় ইংরেজি স্কুলে কিছুদিন পড়াশোনা করেন ।কিন্তু অর্থাভাবে প্রাতিষ্ঠানিক বিদ্যাশিক্ষায় বেশিদূর অগ্রসর হতে পারেন নি ।

তবে সারাজীবন অবহেলিত গ্রামবাংলায় শিক্ষা বিস্তার এবং শোষিত দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত জনগণের জন্য সংবাদপত্রের মাধ্যমে আন্দোলন করে গেছেন তিনি। ১৮৫৫ সালে নিজের গ্রামে বন্ধুদের সাহায্য নিয়ে একটি ভার্নাকুলার বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন তিনি । ওই বিদ্যালয়ে বিনা বেতনে কিছুদিন শিক্ষকতাও করেন। পরবর্তীতে ১৮৫৬ সালে তাঁর সহায়তায় আরেকটি বিদ্যালয় স্থাপন করেন কৃষ্ণনাথ মজুমদার । স্কুলটির নাম কুমারখালী সরকারি পাইলট বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয় । অত্যাচারিত , অসহায় , শোষিত কৃষক সম্প্রদায়কে রক্ষার হাতিয়ার হিসেবেই সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন হরিনাথ ।

এ ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে ‘ সংবাদ প্রভাকর’ নামে একটি পত্রিকা । পরবর্তীকালে গ্রামবার্তা প্রকাশিকা কালক্রমে পাক্ষিক ও সবশেষে এক পয়সা মূল্যমানের সাপ্তাহিকী পত্রিকায় রূপান্তরিত হয় । এতে সাহিত্য , দর্শন , বিজ্ঞান ইত্যাদি বিষয়ে প্রবন্ধ ছাপা হতো । এছাড়াও এখানে ছাপা হতো কুসীদজীবী এবং নীলকর সাহেবদের অত্যাচার , শোষন ও তাদের কেচ্ছা কাহিনী । বৃটিশ ম্যাজিস্ট্রেট , দেশী জমিদার এবং তৎকালীন প্রভাবশালী সম্প্রদায়ের ক্রমাগত হুমকি হরিনাথকে এসব লেখা থেকে বিরত করতে পারে নি । আশৈশব জমিদার , মহাজন , কুঠিয়াল ও গোরা পল্টনদের অত্যাচার ও উৎপীড়ন নিজের চোখে দেখে হরিনাথের মনে জাগে প্রতিকার-চিন্তা এবং সেখান থেকেই তিনি সাময়িক পত্রিকা প্রকাশনার তাগিদ অনুভব করেন ।

আমার পারের সম্বল
তোমার নামটি কেবল
কাঙাল ফিকির চাঁদ কেঁদে
আকুল পাথারে সাঁতারে ।

দীর্ঘ ১৮ বছর পত্রিকা সম্পাদনার পর হরিনাথ ধর্মসাধনায় মনোনিবেশ করেন । তিনি সাধক ও ফকির লালনের গানের একান্ত অনুরাগী ছিলেন । প্রতিষ্ঠা করেন বাউল সঙ্গীতের জন্য কাঙাল ফকিরচাঁদের দল । রচনা করেন অজস্র গান । তাঁর গানে মুগ্ধ হন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। তবে আমৃত্যু বঙ্গদেশে শিক্ষার প্রসার ও সব ধরনের শোষনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্যই ইতিহাসে অবিস্মরণীয় হয়ে রয়েছেন কাঙাল হরিনাথ।

আরও পড়ুন – আইন কলেজ গণধর্ষণ: কলকাতা পুলিশের আস্থা নির্যাতিতার পরিবারের

_

 

_

Related articles

আকাশবাণীর নব্বই বছর! ধ্রুপদী সুরের মূর্ছনায় মাতল যাদুঘর প্রেক্ষাগৃহ

ভারতীয় গণমাধ্যম ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ আকাশবাণী। এই প্রতিষ্ঠানের পথচলার নব্বই বছর পূর্ণ হওয়া উপলক্ষে কলকাতার বুকে আয়োজিত...

সাড়ে ৬ হাজার পদে কর্মী নিয়োগ! ঘোষণা পঞ্চায়েতমন্ত্রী দিলীপের

পঞ্চায়েত স্তরে প্রায় সাড়ে ছয় হাজার কর্মী নিয়োগের সম্ভাবনার কথা জানালেন রাজ্যের পঞ্চায়েতমন্ত্রী দিলীপ ঘোষ। এদিন তিনি বলেন,...

কাকলিকে সরিয়ে কল্যাণকেই লোকসভার মুখ্যসচেতক করলেন মমতা, ‘দিদি’কে কৃতজ্ঞতা সাংসদের

৯ মাসের মধ্যেই পুরনো পদে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় ফেরালেন তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদারকে সরিয়ে ফের...

‘লুঠের জয়’ বেশিদিন টিকবে না! জোট বাঁধুন, মাঠে নামুন: বার্তা অভিষেকের

ভোট লুঠ করে, গণনায় কারচুপি করে বিধানসভা নির্বাচনে জিতেছে বিজেপি! এই জয় বেশিদিন টিকবে না। বৃহস্পতিবার রাত্রে দলের...