নির্বাচন ঘোষণার রাত থেকে আমলাদের সরিয়ে দিচ্ছে কমিশন। একে আগেই “মধ্যরাতে গুপ্ত তাণ্ডব” বলে তীব্র আক্রমণ করেন তৃণমূল (TMC) সুপ্রিমো তথা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee)। এই তুঘলকি আচরণ নিয়ে ফের স্যোশাল মিডিয়ায় সরব হলেন তৃণমূল সভানেত্রী। নিজের এক্স হ্যান্ডেল (X-Handle) একের পর এক কমিশনের নোটিশ পোস্ট করে মমতা লেখেন, ”বর্তমানে যা দেখছি, তা কার্যত একটি অঘোষিত জরুরি অবস্থা এবং এক ঘোষণাহীন রাষ্ট্রপতি শাসন ছাড়া আর কিছুই নয়।”

১৫ মার্চ রাত থেকে রাজ্যের মুখ্যসচিব, স্বরাষ্ট্রসচিব, ডিজিপি, এডিজি, আইজি, ডিআইজি, জেলাশাসক এবং পুলিশ সুপারসহ ৫০-এরও বেশি আধিকারিককে তুঘলকি কায়দায় সরিয়ে দিয়েছে কমিশন (Election Commission)। এর বিরুদ্ধে বারবার গর্জে উঠছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এক্স হ্যান্ডেলে তিনি লেখেন, “নির্বাচন কমিশন যেভাবে বাংলাকে বিশেষভাবে চিহ্নিত করে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে, তা কেবল নজিরবিহীনই নয়—বরং তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের আগেই, মুখ্যসচিব, স্বরাষ্ট্রসচিব, ডিজিপি, এডিজি, আইজি, ডিআইজি, জেলাশাসক এবং পুলিশ সুপারসহ ৫০-এরও বেশি বরিষ্ঠ আধিকারিককে আকস্মিকভাবে ও স্বেচ্ছাচারী পন্থায় পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এটি কোনো প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়; বরং এটি হল সর্বোচ্চ পর্যায়ের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ।”

তৃণমূল সভানেত্রীর মতে, “যেসব প্রতিষ্ঠানকে নিরপেক্ষ থাকার কথা, সেগুলির উপর পরিকল্পিতভাবে রাজনীতির প্রভাব বিস্তার করাটা সংবিধানের ওপর সরাসরি আঘাত হওয়ার সমান। এমন এক সময়ে—যখন ‘এসআইআর’ (SIR) প্রক্রিয়া চলছে এবং ইতিমধ্যেই ২০০-এরও বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে—কমিশনের কার্যকলাপের মধ্য দিয়ে স্পষ্ট পক্ষপাতিত্ব এবং রাজনৈতিক স্বার্থের কাছে এক অস্বস্তিকর নতিস্বীকার ফুটে উঠেছে; যা বাংলার মানুষকে ক্রমাগত ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।”

দেশের সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশ মানা হয়নি বলে অভিযোগ করে মমতা (Mamata Banerjee) লেখেন, “সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশাবলিকে স্পষ্টভাবে উপেক্ষা করে সম্পূর্ণ ভোটার তালিকা এখনও প্রকাশ করা হয়নি, যার ফলে সাধারণ নাগরিকরা গভীর উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। এরই মধ্যে, আইবি (IB), এসটিএফ (STF) এবং সিআইডি (CID)-র মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাগুলোর আধিকারিকদের বেছে বেছে পদ থেকে সরিয়ে রাজ্যের বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে—যা বাংলার প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে পঙ্গু করে দেওয়ার একটি সুপরিকল্পিত প্রচেষ্টার দিকেই ইঙ্গিত করে।”
আরও খবর: তুঘলকি আচরণ! IPS-দের বদলির নির্দেশ দিয়েও মধ্যরাতে ফেরাল কমিশন

মুখ্যমন্ত্রীর প্রশ্ন, বিজেপি (BJP) কেন এত মরিয়া? কেন বাংলা এবং বাংলার মানুষের উপর এই অবিরাম আক্রমণ চালানো হচ্ছে? স্বাধীনতার ৭৮ বছর পেরিয়ে যাওয়ার পরেও, সাধারণ নাগরিকদের লাইনে দাঁড় করিয়ে নিজেদের নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে বাধ্য করার মধ্যে তারা ঠিক কী ধরনের তৃপ্তি খুঁজে পায়?

কমিশনকে তীব্র আক্রমণ করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “কমিশনের কার্যকলাপের মধ্যে যে স্ববিরোধিতাগুলি প্রকট হয়ে উঠেছে, তা তাদের বিশ্বাসযোগ্যতার সম্পূর্ণ পতনের বিষয়টিকেই ফুটিয়ে তোলে। তাদের দাবি , পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া আধিকারিকদের নির্বাচনী দায়িত্ব দেওয়া উচিত নয়; অথচ মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানেই সেই একই আধিকারিকদের নির্বাচনী পর্যবেক্ষক হিসেবে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। শিলিগুড়ি ও বিধাননগরের পুলিশ কমিশনারদের পর্যবেক্ষক হিসেবে নিয়োগ করার সময় তাঁদের স্থলাভিষিক্ত করার জন্য বিকল্প কাউকে নিয়োগ না করায়, এই দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নগরকেন্দ্র কার্যত নেতৃত্বহীন হয়ে পড়েছিল। এই চরম প্রশাসনিক ত্রুটি প্রকাশ্যে আসার পরেই কেবল তড়িঘড়ি করে তা সংশোধন করার পদক্ষেপ নেওয়া হয়। এটি কোনোভাবেই সুশাসন বা প্রশাসনিক দক্ষতা নয়। এটি মূলত বিশৃঙ্খলা, বিভ্রান্তি এবং চরম অযোগ্যতারই প্রতিফলন—যাকে জোর করে ‘কর্তৃত্ব’ হিসেবে চালানোর অপচেষ্টা করা হচ্ছে।”

কমিশনকে নিশানা করে মমতা বলেন, “এটি কোনও আকস্মিক ঘটনা নয়; বরং এটি হল জোরপূর্বক, প্রাতিষ্ঠানিক কারসাজির মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নেওয়ার একটি সুপরিকল্পিত নীলনকশা। আমরা বর্তমানে যা প্রত্যক্ষ করছি, তা কার্যত একটি ‘অঘোষিত জরুরি অবস্থা’ এবং এক ধরনের ‘অপ্রবর্তিত রাষ্ট্রপতি শাসন’ ছাড়া আর কিছুই নয়—যা কোনো গণতান্ত্রিক আদর্শ দ্বারা নয়, বরং নিছক রাজনৈতিক প্রতিহিংসার দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে। বাংলার মানুষের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হয়ে, বিজেপি এখন জবরদস্তি, ভয়ভীতি প্রদর্শন, কারসাজি এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অপব্যবহারের মাধ্যমে এই রাজ্যটি দখল করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে।”

The manner in which the Election Commission has singled out and targeted Bengal is not just unprecedented- It is deeply alarming. Even before the formal notification of elections, more than 50 senior officials including the Chief Secretary, Home Secretary, DGP, ADGs, IGs, DIGs,… pic.twitter.com/ITipND3qYr
— Mamata Banerjee (@MamataOfficial) March 19, 2026
মমতা জানান, “পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রতিটি আধিকারিক এবং তাঁদের পরিবারের পাশে আমি পূর্ণ সংহতি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি—যাঁদের একমাত্র অপরাধ হল, তাঁরা সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে রাজ্যের সেবা করে চলেছেন। বাংলা কখনোই ভয়ভীতির কাছে নতি স্বীকার করেনি এবং ভবিষ্যতেও করবে না। বাংলা লড়াই করবে, বাংলা প্রতিরোধ গড়ে তুলবে এবং বাংলার মাটিতে বিভেদকামী ও ধ্বংসাত্মক কোনও এজেন্ডা চাপিয়ে দেওয়ার যেকোনো প্রচেষ্টাকে বাংলা চূড়ান্তভাবে পরাস্ত করবে।”

–

–
