‘দিলীপ দাসের গান’, উৎপল সিনহার কলম

Date:

Share post:

উৎপল সিনহা

ধুম জ্বর, ভীষণ মাথা ব্যথা । মাথা তুলতে গেলেই পা টলমল। তিন দিন ধরে জ্বর নামছে না, প্যারাসিটামল ব্যর্থ। এবার বোধহয় যেতেই হয় ডাক্তারের কাছে। কিন্তু তার আগেই ডাক এলো এমন একজন মানুষের কাছ থেকে, যিনি আসানসোল শিল্পাঞ্চলে তো বটেই, সারা রাজ্যে সঙ্গীত শিল্পী হিসেবে স্বনামধন্য। ডাক এসেছে এইজন্যই যে, শিল্পীর প্রিয় হারমোনিয়ামটি বেশ ভোগাচ্ছে কয়েকদিন ধরে। মেরামত না করলে আর চলছে না। মেরামত যিনি করবেন তিনিও তাঁর কাজের জন্য শিল্পাঞ্চলে বেশ প্রসিদ্ধ। কিন্তু তার যে ভীষণ জ্বর! তবু আষাঢ়ের এক মেঘলা দুপুরে জয় গুরু ব’লে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়লেন জ্বরের তাড়ন-পীড়ন উপেক্ষা করেই। এমনকি উপেক্ষা করলেন নিজের গর্ভধারিনীর বারণ। গুরুজীর বাড়িতে তখন চলছে রবিবারের গানের ক্লাস। ঘরভর্তি ছাত্রছাত্রী সকলেই খুব মনোযোগ দিয়ে শিখছে রাগ মিয়া মল্লার।

গুরুজীর সঙ্গে গলা মিলিয়ে গাইছে মেঘমেদুর চমৎকার এক বন্দীশ। শিক্ষাদানে মগ্ন আচার্য্য বেশ কিছুক্ষণ পর হঠাৎই লক্ষ্য করলেন ঘরের এক কোণে গুটিসুটি মেরে বসে আছেন সেই অসুস্থ হারমোনিয়াম মেকানিক, আসলে তো হারমোনিয়ামের ডাক্তার। গান থামিয়ে কুশল বিনিময় করে কাজের কথা বললেন। তারপর আবার ফিরে গেলেন মিয়া মল্লারে । ঘন্টাখানেক পর গানের সামান্য বিরতির সময় উঠে পড়লেন অসুস্থ মানুষটি। গুরুজীর অনুমতি নিয়ে রওনা হলেন বাড়ির পথে। কিন্তু কোথায় জ্বর ? কোথায় পা টলমল ? কোথায় গেল মাথাব্যথা? সব উধাও! এ কেমন ম্যাজিক? ছেলেকে হাসিমুখে গটগট করে ঘরে ঢুকতে দেখে তো বিস্ময়ের শেষ নেই মায়ের। কোন জাদুতে এত তাড়াতাড়ি সুস্থ হলো ছেলে? আসলে এক ডাক্তার আরেক ডাক্তারকে সুস্থ করে তুললেন স্রেফ মিউজিক থেরাপির মাধ্যমে। এখানেই সঙ্গীতের আসল শক্তি, যা অভিনব ইন্দ্রজালকেও হার মানায়। এই জাদুকরের নাম দিলীপ দাস , যিনি একাধারে ছিলেন গায়ক, গীতিকার, সুরকার, সঙ্গীতাচার্য্য ও সঙ্গীত চিন্তক।

এবার আরো একটি চমকপ্রদ ঘটনা। আসানসোল শিল্পাঞ্চলের একটি কলেজের এক স্বনামধন্য অধ্যাপকের ছেলে, বয়সে কিশোর, তুখোড় মেধা, কিন্তু তার বেশ কয়েকটি সমস্যা। তার ঘুম আসে না কিছুতেই। সে উগ্র, রগচটা, তার চণ্ডাল ক্রোধ। তাকে নিয়ে তার বাড়ির সকলের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার শেষ নেই। বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের ওষুধেও তেমন কাজ হচ্ছে না। অধ্যাপক নিজেও সঙ্গীতপ্রিয়, সেতার বাজান। গুরুজীর সঙ্গে যোগাযোগ বহুদিনের। কথায় কথায় একদিন গুরুজীকে জানালেন ছেলের সমস্যার কথা। সেটাও ছিল এক রবিবার। অধ্যাপকের বাড়ি এলেন দিলীপ বাবু। দেখলেন খাটের ওপর বালিশে হেলান দিয়ে কি যেন ভাবছে সেই কিশোর। মুখ থমথমে, জবা ফুলের মত লাল চোখদুটো। সামনে রাখা হারমোনিয়াম টেনে নিয়ে একটা ধুন বাজাতে বাজাতে মৃদু হেসে ছেলেটির দিকে তাকালেন গুরুজী। অশান্ত ছেলেটি প্রতিক্রিয়াহীন। বরং তার চোখেমুখে বেশ একটা বিরক্তি । ইমনের ধুন শেষ করে হঠাৎই গান গাইতে শুরু করলেন গুরুজী। রবি ঠাকুরের গান, ‘ দুঃখের বরষায় চক্ষের জল যেই নামলো… ‘ । দেখা গেল ছেলেটি বড়ো বড়ো চোখে একদৃষ্টে গুরুজীর দিকে তাকিয়ে নিবিষ্ট মনে গান শুনছে। একসময় গান শেষ হলো। এরপর ঘরজুড়ে দু’এক মিনিটের অখণ্ড নীরবতা। ঘরের দেয়ালে বাঁধানো বড়ো বড়ো ফটোফ্রেমে রবীন্দ্রনাথ, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন, নেতাজী সুভাষচন্দ্র। ছেলেটি গভীর আগ্রহে সম্ভবত অপেক্ষা করছে পরের গানের। এবার গুরুজী নির্বিকার। একসময় ছেলেটি ঘরের নিস্তব্ধতা ভেঙে বলে উঠলো, ‘ আমায় আরেকটা গান শোনাবেন স্যার ? ‘ এবার স্যার গাইলেন যতদূর মনে পড়ে একটি ভজন। তারপর আরেকটি গান, সম্ভবত নজরুল গীতি। এসবের মাঝে কখন যেন উগ্র ছেলেটি শান্ত হয়েছে, যাকে বলে ‘ দস্যি ছেলে লক্ষ্মী আজ ‘ । আর তারপর, কী আশ্চর্য, গান শুনতে শুনতে ছেলের দু’চোখে নেমে এসেছে ঘুম! ঘুমিয়ে পড়েছে সে। এরপরেও গান থামালেন না স্যার। আরও দু’একটি গান গেয়ে তৃপ্তমনে চুমুক দিলেন চায়ে। অধ্যাপক সবিস্ময়ে দেখলেন বহুচর্চিত মিউজিক থেরাপির হাতে কলমে প্রয়োগ এবং তাৎক্ষণিক সাফল্য। সঙ্গীত নামক মহৌষধের অমিত শক্তির হাতে গরম প্রমাণ।

দিলীপ দাস ছিলেন শিল্পীদের শিল্পী , যিনি শ্রোতাদের মনস্তত্ত্ব বুঝে গান নির্বাচন করতেন এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে সফল হতেন। শ্রোতাদের মন ভালো করে দেওয়ার ম্যাজিক জানতেন তিনি। এক গান থেকে আরেক গানে যাওয়ার ফাঁকে গান নিয়ে যে মনোজ্ঞ আলোচনা তিনি করতেন, তা শ্রোতাদের ঋদ্ধ করতো, এক অপার্থিব আলোয় যেন উদ্ভাসিত হয়ে উঠতো তাঁর গুণগ্রাহীদের মন। মুখ দেখে মানুষের মন বোঝার এক বিরল ক্ষমতা নিয়ে জন্মেছিলেন সঙ্গীত চিন্তক দিলীপ দাস ( ১৯৪২ — ২০২৪ ) , যিনি বলতেন, ‘ নতুন গানকে আয়ু দিতে হবে, আয়ু দিতে হবে নিভে আসা মনকেও ‘ । সেই চেষ্টা তিনি আমৃত্যু করে গেছেন। বলতেন, ‘ সঙ্গীত হলো আর্ত মানুষের সর্বশ্রেষ্ঠ শুশ্রূষা ‘ ।

আরো একদিন। ‘ বৈশাখের এই ভোরের হাওয়া… ‘ , গানটি বেশ দ্রুত লয়ে গাইছিল স্যারের এক ছাত্র। গান শেষ হলে স্যার মৃদু হেসে ছাত্রকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘ ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠেই হাঁইহাঁই করে গাইতি বা কোদাল চালাতে ভালো লাগবে তোমার ? ‘ , ‘ লয় না বুঝলে গান হয় না ‘। গানের বাণীর মধ্যেই লয় লুকিয়ে থাকে। গানের কথাগুলো বারবার পড়লেই লয় খুঁজে পাওয়া যায়।‌ সারাটা জীবন গানের ভিতর দিয়েই ভুবন দেখেছেন আর দেখিয়েছেন স্যার। একবার বাবুঘাট থেকে হাঁটতে হাঁটতে নেতাজী ইনডোর স্টেডিয়াম পেরিয়ে আকাশবাণী ভবনের দিকে যেতে যেতে রাগ মালকোষের আলাপ ও বিস্তার গুণগুণ করছিলেন স্যার। তাঁর দু’পাশে দুই ভক্ত গভীর মনোযোগ সহকারে মালকোষ শুনতে শুনতে বিভোর হয়ে অনুভব করেছিলো রাত্রির তৃতীয় প্রহরের গাম্ভীর্য ও নিস্তব্ধতা যেন নেমে এসেছে দুপুরের কলকাতার তীব্র রোদ্দুর আর হাজার গাড়িঘোড়ার শব্দদানবকে উপেক্ষা করে।

দিলীপ দাসের বাড়িতে একবুক কান্না নিয়ে ঢুকে একমুখ হাসি নিয়ে বেরোতে দেখা গেছে বহু মানুষকে। বর্ষার এক বিষন্ন সন্ধ্যায় আসানসোল শিল্পাঞ্চলের এক পরিচিত গায়ক বড়ো বিমর্ষ মুখে ঢুকলেন দিলীপ বাবুর গানের ঘরে। বসলেন সেই সুদৃশ্য গালিচায়, যেখানে রয়েছে সাত-আট জোড়া বাঁয়া তবলা, কয়েকটি তানপুরা ও সুরমণ্ডল এবং বেশ কয়েকটি হারমোনিয়াম। দিলীপ বাবু সম্ভবত কোনো মৌলিক গান নির্মাণে মশগুল ছিলেন। মুখ তুলে আগন্তুককে জিজ্ঞেস করলেন, ‘ কী হয়েছে ‘ ? আগন্তুক বললেন, ‘ একটা বড়ো ভুল করে ফেলেছি দাদা, বড়ো ভুল ‘ । মৃদু হেসে দিলীপ বাবু বললেন, ‘ একটা ভুল ? মাত্র একটা ? ‘ তারপর গাইতে আরম্ভ করলেন, ‘ আমি আজীবন শুধু ভুল করে গেছি ‘ , ( কথা: পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়, সুর: প্রভাস দে, কণ্ঠ: মান্না দে) । গান শেষ করেই বললেন, ‘ এই যে কষ্ট করে দুটো নি লাগালাম ( কোমল ও শুদ্ধ ) , কই একটুও তারিফ করলেন না তো ‘ ! আগন্তুকের মুখ থেকে বিমর্ষতা ততক্ষণে বিদায় নিয়েছে। একগাল হেসে বললেন, ‘ একটু তারিফে হবে না যে দিলীপ দা, আজ আপনি পরপর দুটো নি আমার এই ভাঙা বুকে বসিয়ে দিলেন পেস মেকারের মতো, যা বাকি জীবনে আমাকে অনেক ভুল থেকে রক্ষা করবে ‘ । ‘ আজ কিছুতেই যায় না মনের ভার ‘ , ছিল যাঁর অন্যতম প্রিয় গান, তিনি স্বয়ং স্বেচ্ছায় তাঁকে ঘিরে থাকা মানুষগুলোর মনের ভার লাঘব করার ভার নিয়েছিলেন। আজ থেকে বহু বছর আগে বিহারের পাটনায় অনুষ্ঠান করতে গিয়ে বিরাট সংখ্যক উগ্র শ্রোতাদের, যাঁরা একের পর এক শিল্পীকে চিৎকার করে মঞ্চ থেকে নামিয়ে দিচ্ছিলেন ‘ গান পছন্দ হচ্ছে না ‘ এই অজুহাতে, শান্ত করেছিলেন দিলীপ দাস। বিশাল গণ্ডগোলের মধ্যেই তিনি মঞ্চে ওঠেন এবং হারমোনিয়ামে আঙ্গুল ছুঁইয়ে
নবাব ওয়াজিদ আলি শাহ-র লেখা বিখ্যাত ঠুংরি ‘ বাবুল মোরা নৈহর ছুটো হি যায়ে ‘ গাইতে শুরু করেন। মুহূর্তেই শান্ত হয়ে যায় উত্তেজিত জনতা। সবাই মন দিয়ে গান শুনতে থাকে। উত্তেজিত জনতার মন বুঝে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে গান নির্বাচন করা, এও তো এক দীর্ঘ অনুশীলনের ফসল, এও তো এক সাধনা। শুধুমাত্র একজন সঙ্গীত শিল্পী ছিলেন না দিলীপ বাবু ,বিস্তীর্ণ আসানসোল শিল্পাঞ্চলের রুখাসুখা মাটির বুকে দিলীপ দাস ছিলেন মরমী এক আশ্বাস, নিভৃত এক আশ্রয়, সংবেদনশীল এক অভিভাবক, যিনি প্রকৃতই অবিস্মরণীয়। শোকে-দুঃখে-বিপদে আর অসুস্থতায় দিলীপ দাস যেন স্বয়ং ছিলেন এক আরোগ্য নিকেতন। গান দিয়ে মনের চিকিৎসা করতেন। মনস্তত্ত্ব বুঝতেন, যেন নাড়ির গতি দেখেই বুঝে নিতেন রোগীর শরীর ও মনের অবস্থা।

সুরের গুরু দিলীপ দাস ছিলেন সেই অপরূপ স্নিগ্ধ চন্দ্রাতপ, যা তাঁর অগণিত ছাত্রছাত্রী, গুণগ্রাহী ও শ্রোতাদের জীবনের বিভিন্ন অস্থির সময়ে , বিপন্ন বিপুল অন্ধকারে বারবার কান্তিময় আলোর সন্ধান দিয়েছে । দিয়েছে সুরের হাত ধরে বেঁচে থাকার অনির্বাণ প্রেরণা।

আরও পড়ুন- থিয়েটার থেকে বিশ্বসাহিত্য! প্রকাশিত হল ব্রাত্য বসুর ‘গদ্যসংগ্রহের’ নতুন দুই খণ্ড 

_

 

_

 

_

spot_img

Related articles

হিমবাহ ধসে বড় বিপর্যয়ের আশঙ্কা উত্তর সিকিমে, জারি হাই অ্যালার্ট

ফের ফিরতে চলেছে তিন বছর আগের সাউথ লোনাক লেক বিপর্যয়ের স্মৃতি! আশঙ্কার কালো মেঘ উত্তর সিকিমে (North Sikkim)।...

দু’দিনে বিশ্বজুড়ে ৩৩৩ কোটির ব্যবসা, ‘ধুরন্ধর: দ্য রিভেঞ্জ’ মাইলস্টোনে দীপিকার নীরবতায় সমালোচনা! 

শুধু বলিউড নয় বিশ্বজুড়ে 'ধুরন্ধর' দাপট বজায় রাখলেন রণবীর সিং (Ranveer Singh)। একদিনে ২০০ কোটির মাইলস্টোন ছুঁয়ে শাহরুখের...

একধাক্কায় ১১ ডিগ্রি পারদ পতন, রবিবাসরীয় সন্ধ্যায় ফের ঝড়-বৃষ্টির পূর্বাভাস!

কালবৈশাখী আর দফায় দফায় মাঝারি বৃষ্টির দাপটে কলকাতার তাপমাত্রা স্বাভাবিকের প্রায় ১১ ডিগ্রি কমেছে। শুক্র ও শনির পর...

কেবিন ক্রু-দের ওজন বাড়লেই কাটা হবে বেতন! নয়া সিদ্ধান্ত এয়ার ইন্ডিয়ার 

চলতি বছরের মে মাস থেকে কেবিন ক্রু-দের জন্য নতুন এক নিয়ম চালু করতে চলেছে এয়ার ইন্ডিয়া (Air India...