Saturday, May 30, 2026

‘চৈতন্য রহস্য’, উৎপল সিনহার কলম 

Date:

Share post:

উৎপল সিনহা

জন্মদিন বা মৃত্যুদিন নয়, এ দুইয়ের মধ্যিখানে যা পড়ে থাকে সেটাই গুরুত্বপূর্ণ, অর্থাৎ কর্ম । এমন কথা বিদ্বজ্জনেরা বলে থাকেন বটে, তবে জনমে বা মরণে যদি কোনোও রহস্য থাকে, তাহলে তা উপেক্ষা করা কঠিন। বিশেষ করে মনীষী বা মহামানবদের ক্ষেত্রে। স্বাভাবিক মৃত্যুতে কোনো কৌতুহল তৈরি হয় না। কিন্তু অস্বাভাবিক মৃত্যু, অন্তর্ধান, নিরুদ্দেশ ও চিরনিষ্ক্রমণ চিরকালের রহস্য হয়ে জেগে থাকে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে।

যেমন শ্রীচৈতন্যের মৃত্যু। যে মৃত্যু আজও রহস্যের চাদরে ঢাকা। তাঁর জন্ম ১৪৮৬ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি ( মতান্তরে ২৮ ফেব্রুয়ারি‌ ) । তিনি পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার নবদ্বীপে এক দোল পূর্ণিমার রাতে, চন্দ্রগ্রহণের সময় আবির্ভূত হয়েছিলেন। তাঁর পিতা জগন্নাথ মিশ্র এবং মাতা শচী দেবী। শ্রীচৈতন্যদেবের তিরোধান দিবস হিসেবে ১৪ জুন তারিখের ( ১৫৩৪ ) উল্লেখ রয়েছে ইতিহাসে । কিন্তু তাঁর মৃত্যু ঠিক কীভাবে হয়েছিল, এ ব্যাপারে স্পষ্ট কোনো উত্তর পাওয়া যায় না। মাত্র ৪৮ বছরের মহাজীবন বর্ণময়, বহুমাত্রিক, অবিস্মরণীয়। ঠিক কীভাবে মারা গিয়েছিলেন গৌরাঙ্গ মহাপ্রভু ? ইতিহাসের কাছে এ প্রশ্নের কোনো সদুত্তর নেই। তাঁর মৃত্যু কিংবা অন্তর্ধানের ৫৪০ বছর পরেও তাঁর মৃত্যু নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত। তিনি কি আত্মহত্যা করেছিলেন ?

তিনি কি নিখোঁজ হয়ে যান? তিনি কি চির-নিরুদ্দেশের উদ্দেশে প্রস্থান করেছিলেন? নাকি তাঁকে গুমখুন করা হয়েছিল ? কে দেবে এসব প্রশ্নের উত্তর ? স্পষ্ট করে এর উত্তর হয়তো আর কোনোদিনই জানা যাবে না। হয়তো বা এই মনীষীর মৃত্যুরহস্য চিরকাল ঢাকা পড়ে থাকবে ইতিহাসের এক কালো রাত্রির খামে। ওড়িশার পুরীতে অবস্থিত জগন্নাথ মন্দিরে তাঁর মৃত্যু ঘটেছিল এমন অনুমান করা হয়। অধিকাংশ বৈষ্ণব অনুসারী এবং তাঁর ভক্তদের মতে, তিনি জগন্নাথদেবের মূর্তিতে লীন হয়ে গিয়েছিলেন। খুন অথবা আত্মহত্যা, কিছু তো একটা ঘটেছিল, এমন কথাও বলা হয়ে থাকে। তিনি কি ভাবের ঘোরে তদ্গত অবস্থায় পুরীর সমুদ্রে বিলীন হয়ে যান ?

বাংলার আধ্যাত্মিক ভাব আন্দোলনের ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব শ্রীচৈতন্যের মৃত্যু আজও এক ঘণীভূত রহস্য। চৈতন্যের মৃত্যুরহস্য নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে রহস্যজনকভাবে খুন হয়ে যান বিশিষ্ট চৈতন্য-গবেষক ডঃ জয়দেব মুখোপাধ্যায়। সে খুনেরও কোনো কিনারা হয় নি। ২০০০ সালে জগন্নাথ মন্দিরের গর্ভগৃহ থেকে পাওয়া কঙ্কাল কি সত্যিই গৌরাঙ্গ মহাপ্রভুর ?

কঙ্কালটির উচ্চতার সাদৃশ্য থেকে একটি অনুমান দৃঢ় হয়ে ওঠে, তা হলো, তাঁকে খুন করা হয়েছিল। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আরও একটি গুরুতর প্রশ্ন, তা হলো, পুরীর অদূরে সাড়ঙ্গ দূর্গে কারা নিয়ে গিয়েছিল চৈতন্যকে ? কেনই বা সেখানে নিয়ে যাওয়া হয় তাঁকে! যদি তিনি খুনই হয়ে থাকেন, তাহলে তাঁর হত্যাকারী কে বা কারা?

ইতিহাসবিদ নীহাররঞ্জন রায় চৈতন্য গবেষক জয়দেব মুখোপাধ্যায়কে লেখা এক চিঠিতে লিখেছেন, ” মহাপ্রভু শ্রী চৈতন্যদেবকে গুমখুন করা হয় পুরীতেই এবং তাঁর দেহের কোনো অবশেষের চিহ্নও রাখা হয়নি কোথাও। আর রাখা হয়নি বলেই কিংবদন্তি প্রচারের প্রয়োজন হয়েছিল ” । শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভু যে বিরাট এক চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছিলেন একথা তো লোকের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়েছিল। চৈতন্যের দৈহিক উচ্চতা ছিল প্রায় সাড়ে ছয় ফুট। আর জগন্নাথ মন্দিরে পাওয়া কঙ্কালটির উচ্চতাও তো ঠিক সেই মাপেরই। এতেও তো তাঁর খুন হয়ে যাওয়ার তত্ত্বটি আরও প্রতিষ্ঠা পায়। ঐতিহাসিক দীনেশচন্দ্র সেন তাঁর’ Chaitanya And His Age’ গ্রন্থে প্রথম লেখেন যে, মন্দিরের মধ্যেই তাঁকে হত্যা করা হয় এবং তারপর মন্দিরের ভেতরেই কোনো একটি স্থানে তাঁর মৃতদেহ পুঁতে ফেলা হয়। মাটি খোঁড়া এবং তা আবার আগের মত স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরত না আসা পর্যন্ত সময়কালে কাউকেই মন্দিরের ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হয়নি।‌ সম্ভবত রাজা প্রতাপ রুদ্রের নির্দেশ মেনেই খুনিদের দল মন্দিরের দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল। জগন্নাথ বিগ্রহের চেয়েও শ্রীচৈতন্যের প্রতিপত্তি ও জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকায় পাণ্ডারা নাকি গোপনে তাঁকে হত্যা করেছিল, এমন কথাও শোনা যায়। তাঁর আনুমানিক মৃত্যুর দিন বেলা তিনটে থেকে রাত আটটা পর্যন্ত মন্দিরের গুণ্ডিচা বাটির দরজা খোলা হয়নি, ভেতরে ছিলেন অসুস্থ শ্রীচৈতন্য এবং অসংখ্য পাণ্ডা। রাত্রি আটটা নাগাদ দরজা খুলে পাণ্ডারা বলতে থাকে, আমাদের মহাপ্রভু স্বর্গে গেছেন, তাঁর দেহের আর কোনো চিহ্ন নেই।

আরও পড়ুন – বেলেঘাটায় শক্তিবৃদ্ধি তৃণমূলের, কুণালের উপস্থিতিতে দলবদল বাম-বিজেপি কর্মীদের

_

 

_

 

_

 

_

Related articles

IPL: শুভমানের শতরানে ফাইনালে গুজরাট, রেকর্ড গড়েও ট্র্যাজিক নায়ক বৈভব

শুভমান গিলের দুরন্ত শতরান, রাজস্থান রয়্যালসকে ৭ উইকেটে হারিয়ে IPL ফাইনালে গুজরাট টাইটন্স (Gujarat Titans )। বৈভব সূর্যবংশী...

‘সুন্দরী’কে আর রিল বানাবে না সায়নী! উদ্ধার ঝুলন্ত দেহ

ত্রিবেণীর (Triveni) পরিচিত সোশ্যাল মিডিয়া কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও ভ্লগার (Social Media Content Creator and Vlogger) পশপ্রেমী সায়নী চক্রবর্তীর...

সোমে নতুন মন্ত্রিসভার শপথ: নজরে অর্থ ও স্বরাষ্ট্র দফতর

বাংলায় প্রথমবার ক্ষমতা দখল করলেও রাজ্যে মন্ত্রিসভা গঠনে হিমসিম বিজেপির সরকার। মাত্র পাঁচ মন্ত্রী এখনও পর্যন্ত শপথ নিয়েছেন।...

আরজিকরের ঘটনার জের: চাকরি গেল চিকিৎসক বীরূপাক্ষ বিশ্বাসের

এবার চাকরি হারালেন আরজিকর কাণ্ডের পরে নানা অভিযোগে অভিযুক্ত সিনিয়র রেসিডেন্ট চিকিৎসক বীরূপাক্ষ বিশ্বাস (Birupaksha Biswas)। শুক্রবার রাজ্যের...