
” আমি সূর্যমুখী ফুলের মতো
দেখি তোমায় দূর থেকে,
দলগুলি মোর রেঙে ওঠে
তোমার হাসির কিরণ মেখে ”
সবাই জানে সূর্যমুখীর স্বভাব। ওরা দিনের বেলায় সূর্যের দিকে মুখ করে থাকে এমনভাবে, যেন ” তোমায় দেখে দেখে আঁখি না ফিরে ” । সূর্যের আলো যেদিকে, ওদের মুখও সেদিকে। সূর্যের দিকে তাকিয়ে থাকা ছাড়া আর যেন কোনো কাজ নেই ওদের, যেন আর কোনো নেই ওদের ভাবনা। যেন আলোই ওদের বেঁচে থাকার একমাত্র কারণ, একমাত্র টান। তাই কি ? এই দৃশ্যটা যে শুধুই প্রাকৃতিক, শুধুই বৈজ্ঞানিক, তা নয়, ভীষণ সুন্দরও । দারুণ ইতিবাচক। কেননা এতে আছে এক ধরনের নির্ভরতা আর ভালোবাসা।

কিন্তু আসল গল্পটা শুরু হয় যখন সূর্য ডুবে যায়। রাত্রি আসে মুখখানি ঢেকে। চারপাশে শুধু অন্ধকার আর অন্ধকার। সূর্যহীন আকাশের দিকে তখন আর তাকিয়ে থাকে না সূর্যমুখীরা। কী করে তখন তারা ? তাদের চোখ নেমে আসে মাটিতে। তখন তারা একে অপরের দিকে ঘুরে দাঁড়ায়। যেন নিঃশব্দে পরস্পরকে বলে, আলো না থাকলেও, ঘন অন্ধকারেও একে অপরের পাশে থাকা যায়। এটাই Sunflower Theory বা সূর্যমুখী তত্ত্ব।

” কিছুই কোথাও যদি নেই
তবু তো কজন আছে বাকি
আয় আরো হাতে হাত রেখে
আয় আরো বেঁধে বেঁধে
থাকি ” ।

এ একেবারে আমাদের জীবনের মতো। আলো থাকে, কিন্তু সবসময় থাকে না। সবসময় সবকিছু সহজ, মসৃণ, সুন্দর অথবা উজ্জ্বল থাকে না। অনেক সময়ই চারপাশটা জমাট অন্ধকারে ঢেকে যায়। তখন উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা গ্রাস করে। মন খারাপ হয়, কিছুই ভালো লাগে না। নিঃসীম নিঃসঙ্গতা, ভাঙা মন, না পাওয়ার হাহাকার আর একরাশ শূন্যতা ঘিরে ফেলে আমাদের। অস্তিত্বের সঙ্কট তৈরি হয়। সূর্যরূপী ভরসা তখন কোথায় যেন হারিয়ে যায়। আলোর অভাবে দিশেহারা লাগে। বিশ্বাস, ভরসা হারিয়ে যেতে থাকে। স্বপ্নগুলো যেন তলিয়ে যেতে থাকে ডুবন্ত নৌকার মতো।

কোথাও কোনো আশ্বাস খুঁজে পাওয়া যায় না। আর ঠিক এই সময়েই আমাদের সাহস জোগায় সূর্যমুখীরা। ওদের শিক্ষা প্রেরণা দেয় আমাদের। নতুন করে বাঁচার জন্য উদ্দীপিত করে। গাইতে থাকে জাগা আর জাগানোর গান।

Sunflower Theory আমাদের এটাই শেখায় যে, সবসময় আলো খোঁজার দরকার নেই, সবসময় শক্তিশালী হয়ে থাকারও প্রয়োজন নেই। কখনো কখনো অন্ধকারে একে অপরের দিকে ঘুরে দাঁড়ানোই যথেষ্ট । আলো না থাকলেও একজন অবশ্যই পারে আরেকজনের আলো হয়ে উঠতে। শুধুমাত্র পাশে থাকার ভরসা দিয়ে একজন আরেকজনকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে।

‘ তোমার সমস্যা তুমি একা সামলাও ‘ , না বলে যদি বলা যায়, ‘ আলো না থাকুক, আমি তো আছি তোমার পাশে ‘ , তাহলে জীবনটা আরও সুন্দর হয়ে ওঠে, পৃথিবীটা হয়ে ওঠে আরও বাসযোগ্য। সহজ কথায়, সূর্যমুখী তত্ত্বের দর্শন হলো, শুধু আলোতে নয়, অন্ধকারেও থাকতে হয় পাশাপাশি।
মনে রাখতে হবে, সহজে নুয়ে পড়ে না সূর্যমুখী ।শুধুমাত্র নিজের বেঁচে থাকাটুকু নিয়েই সন্তুষ্ট থাকে না তারা। সহনশীলতা ও প্রতিশ্রুতির আশ্বাস ছড়িয়ে রাখে চারপাশে , যাতে কেউ বিপন্ন বোধ না করে। অন্ধকারে সাহচর্য কেবলমাত্র রোমান্টিকতা নয় , বরং পারস্পরিক সমর্থন এবং সহযোগিতার দৃঢ় অঙ্গীকার। বস্তুত একে অপরের ভরসা হয়ে থাকাটাই তো বেঁচে থাকার মূল উদ্দেশ্য। এটাই তো আনন্দের উৎস। ভালোবাসা ও পাশে থাকার এমন রোমান্টিক রূপক সভ্যতার অন্যতম প্রেরণা। শুধু রাতের অন্ধকারে নয়, মেঘলা দিনেও একে অপরের দিকে তাকিয়ে থাকে সূর্যমুখী ফুলেরা। প্রকৃতিকে দেখায়, প্রকৃত সঙ্গী কাকে বলে।
আরও পড়ুন – কবিগুরুর চরণে প্রণাম, শ্যামাপ্রসাদের বাসভবনে শ্রদ্ধা; প্রথম দিনেই আবেগে-কর্তব্যে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু
_

