হৃষি তো আমাদেরই কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে গেল!

অভিজিৎ ঘোষ

 

নাম হৃষিক কোলে। প্রায় সব সংবাদ মাধ্যমেই ছবি দিয়ে তার মৃত্যু বা আত্মহত্যার খবর। অদ্ভুত এক কারনে মেধাবী ছাত্রটি মৃত্যুর পথ বেছে নিয়েছে। ভাবলে শরীরের রমকূপে শিহরণ হয়, অজানা আশঙ্কায় মনটা বিমর্ষ হয়ে যায়। যাদের ওই বয়সী সন্তান আছে, তাঁরা ভাবতে বসে যান, আমারটার ক্ষেত্রে এমনটি হবে না তো!

কী ঘটেছিল হৃষির জীবনে? সিঙ্গুরের ছেলে। মাধ্যমিক-উচ্চমাধ্যমিকে দুরন্ত ফল। ফিজিক্স নিয়ে প্রথমে হুগলির কলেজে স্নাতকোত্তরে ভর্তি, পরে সুযোগ পেয়ে কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্সে। হস্টেল জীবন। মাত্র ক’য়েক দিন ক্লাস করার পর স্কুল থেকে বেরিয়ে হৃষি বেরিয়ে পড়ে। তারপর ট্রেনের তলায় জীবন। খণ্ড-বিখণ্ড দেহ। মর্মান্তিক। কিন্তু কেন এই চরম পথ? ফেলে যাওয়া চিরকূট আর বাবা জানাচ্ছেন, স্কুলে ইংরেজি মাধ্যম আর ছাত্রদের মধ্যে বেশিরভাগ সময় হিন্দি কথায় সে বেমানান ছিল, মানাতে পারেনি। তাই লজ্জা আর ব্যর্থতার গ্লানি না নিতে পেরে চরম পথ বেছে নেয়।

ক’টা প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই আসছে। মধ্যবিত্ত- নিম্নবিত্তদের মনে নানা জিজ্ঞাসা, যুক্তি, পাল্টা যুক্তি…

এক. স্কুলকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো সমীচীন হবে না। মাত্র কয়েকদিন ক্লাস করেছে হৃষিক। শিক্ষকদের কাছে সমস্যা বলার আগেই কেন চরম পথ! তাঁরা তো ছিলেন। তাঁদের সমস্যা সমাধানের সুযোগই দেওয়া হল না।

দুই. মেধাবী ছাত্রদের অনেকেই বড় একা হয়। বন্ধু-বান্ধবের গণ্ডীটাও হাতে গোনা হয়। ফলে মনের ভিতরের যন্ত্রণার বিষ দাঁত ভেঙে দেওয়ার সুযোগটা কম থাকে। বন্ধুদের জায়গা পূরণ করেন অনেক ক্ষেত্রেই বাবা-মা। হয়তো সেখানে কোথাও কম থেকে গেলেও থাকতে পরে।

তিন. তুমি মেধাবী, তুমি ভাল ছেলে, এই তকমা জুটতে জুটতে মনের ভিতর বোধহয় বহু পড়ুয়ারই জন্ম নেয় সুপিরিওরিটি কমপ্লেক্স। আমি এটা জানি না, বললে বোধহয় আমার মর্যাদাহানি হবে। তাই চুপ থাক, আর সেই চাপ না নিতে পারলেই…

চার. আমি বাংলা জানি, এই অহমিকাটা এখন বাবা-মায়েরাই ভাবেন প্রাচীন যুগের কাহিনি। ইংরেজি কম জানা বা হিন্দিতে কথা বলতে না পারার মধ্যে যে কোনও গ্লানি থাকতে পারে না, সেই শিক্ষাটা এই যুগের পড়ুয়ারা শেখে না। কারন, বাড়িতেই সেই শিক্ষাটা দেওয়ার লোক কম। স্কুলেও একই কথা। কঠিন পদার্থবিদ্যা যদি হৃষি আয়ত্ত্ব করতে পারে তবে ইংরেজিটা আয়ত্ত্ব করতে কতক্ষণ ছিল! বোঝাবে কে!

পাঁচ. আসলে এই প্রজন্মের সময় দেওয়া বা ধৈর্যটাই একেবারে তলানিতে। সে তো রাস্তায় যেভাবে গাড়ি চালায় বা দুটো কথার পরেই হাত তুলে ফেলে, তা থেকেই বোঝা যায়। কারন, অসম্ভব প্রতিযোগিতা। সুযোগ কম, সংখ্যা অনেক। জীবনে দাঁড়াতে গেলে মেরে-ধরে-ডিঙিয়ে-উৎকোচ দিয়ে সাফল্য আনতে হবে। তাই রেয়াতের প্রশ্নই নেই।

ছয়. এবং পরিশেষে বলতেই হয়, অধিকাংশ পড়ুয়ারই পড়ার বাইরে জগৎটা ছোট হয়ে আসছে। করছি আমরাই। অন্য বিষয়ে নিজেকে ব্যস্ত রেখে জীবনে ব্যর্থতা ভোলার জায়গাটা থাকছে না। অন্য জগৎ বলে কিছু থাকছেই না। ফলে সাফল্যের বিপরীত ব্যর্থতা, জীবনের উল্টোদিকে মৃত্যু ছাড়া কিছু দেখতেই পারছে না। বরং বলুন আমরা অভিভাবক, শিক্ষকরা ওদের দেখাতে বা ভাবাতে পারিনি।

হৃষির মৃত্যু থেকে কিন্তু আমরা কোনও শিক্ষাই নেব না, নিশ্চিত।