তিনি ভেকধারী ‘বুদ্ধিজীবী’ সাজেন না, কণাদ দাশগুপ্তের কলম

কণাদ দাশগুপ্ত

বঙ্গ-বিজেপিতে দিলীপ ঘোষকে অপছন্দ করেন, এমন লোকজন কম নয়৷ তা সত্ত্বেও মসৃনভাবেই
দিলীপবাবু ‘সেকেণ্ড টার্ম’ রাজ্য বিজেপির শীর্ষপদে চলে এলেন৷ এর কারন একাধিক৷

দিলীপ- বিরুদ্ধ লবি গোপনে শলা-পরামর্শ চালালেও প্রকাশ্যে সভাপতি পদে একটি নামও সামনে আনতে পারেনি৷ এই পদে যাওয়ার ইচ্ছা বঙ্গ-বিজেপির কয়েকজন নেতার থাকলেও একে অপরকে সহ্য করতে না পারার জন্য আলোচনা দানা পাকেনি৷ অথচ একাধিক জেলার নেতারা দিলীপ ঘোষকে এবার আর এই পদে চাননি৷ কিন্তু জেলার নেতারা এই ইস্যুতে রাজ্য নেতাদের সাহসের অভাব দেখে অনেক দূর এগিয়েও শেষ মুহূর্তে পিছিয়ে যান৷
রাজ্যস্তরের যে নেতারা এবার সভাপতি হতে চেয়েছিলেন, তাঁরা নিজেদের গণ্ডির বাইরে সেকথা তুলে ধরতে পারেন নি কিছুটা দিল্লির ভয়েও৷ তাছাড়া এরা কেউই নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি নন৷ রাজ্য সভাপতি জনপ্রতিনিধি হওয়ার সুবিধা অনেক৷ দলের বাকি সাংসদ বা বিধায়করা বিধানসভা ভোটের মুখে সভাপতি পদে বসার যোগ্যতা এখনও অর্জনই করেননি৷

দলের অন্দরে দিলীপ ঘোষের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নাতীত না হলেও, সভাপতি হতে বাকি যারা আশাবাদী ছিলেন, তাদের থেকে কিছুটা বেশিই আছে৷ কেউ পরের পর নির্বাচনে হেরেই চলেছেন, কেউ সবেমাত্র দলে এসেছেন৷ কেউ হঠাৎই কোটায় রাজ্যসভার সাংসদ হয়েছেন৷ এখনও রাজ্যটাই ঠিকঠাক চেনেন না৷ দলে এদের ‘শত্রু’-ও কম নয়৷ ফলে একজন এগোতে চাইলে, অন্যজন কাঁকড়ার মতো টেনে ধরেছেন তাঁকে৷ মাঝে আবার সোশ্যাল মিডিয়ায় সভাপতি পদে ছবি-সহ একটি নাম ভাসানো হয়েছিলো৷ বলা হয়, বিদ্যার সমুদ্র এই ভদ্রলোকের সভাপতি হওয়া নাকি ‘পাকা’ হয়ে গিয়েছে৷ তাঁর পিছনে নাকি দিল্লির গোটা হাই কম্যাণ্ড এবং মোহন ভাগবত আছেন বলে দাবিও করা হয়েছিলো৷ আসলে, যারা এই নামটি খাওয়াতে চেষ্টা করেছিলেন, তাঁদের কারোরই সক্রিয় রাজনীতির অভিজ্ঞতা-ই নেই৷ রাজনীতি বলতে এরা বোঝেন, সোশ্যাল মিডিয়ায় অবান্তর জ্ঞান দেওয়া৷ এই বালখিল্য ইচ্ছা তাই এদের ঘরের চৌকাঠও পেরোয়নি৷ সব মিলিয়ে, সামনে ফাঁকা মাঠ-ই পেয়েছেন দিলীপ ঘোষ৷

দিলীপ ঘোষের বিরুদ্ধে দলের দিল্লি-লবি’র একাংশও সক্রিয় ছিল। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বাবুল সুপ্রিয় প্রকাশ্যেই তাঁকে “দায়িত্বজ্ঞানহীন” পর্যন্ত বলেছেন৷ সেই মন্তব্যকে সমর্থন করেছিলেন বিজেপির ‘নব্য থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক’ সাংসদ রাজ্যসভার সাংসদ স্বপন দাশগুপ্ত। কৈলাস বিজয়বর্গীয়দের মতো কিছু কেন্দ্রীয় নেতাও সমানে দিলীপ-বিরোধী একটি লবিকে হাওয়া দিয়ে গিয়েছেন৷ দলের অন্দরে চর্চা হয়েছে, দিল্লির শীর্ষস্তরের নেতাদের মদত ছাড়া এই বাজারে বাবুল সুপ্রিয় বা স্বপন দাশগুপ্তের ‘সাহস’ হতো না প্রকাশ্যে দিলীপ ঘোষের বিরুদ্ধাচরন করা৷ কিন্তু সেই সব চেষ্টাও তো কাজে লাগলো না৷

দিলীপ ঘোষের বিরুদ্ধে দলের একাংশ বারে বারে অভিযোগ তুলেছে, তাঁর কথাবার্তা দলের ভাবমূর্তি ধ্বংস করছে। এই অভিযোগ মূলত তারা’ই তুলেছে, যাদের প্রত্যক্ষ এবং সক্রিয় রাজনীতি সম্পর্কে ন্যূনতম ধ্যানধারনাও নেই৷ দিলীপবাবুর কিছু কথা শালীনতার মাত্রা ছাড়ালেও তার রাজনৈতিক সুফল পেয়েছে সামগ্রিকভাবে বিজেপি৷ দল প্রচার এবং চর্চার মধ্যে ছিলো এর ফলে৷ এবং এসবের প্রতিক্রিয়া দিতে তৃণমূলের শীর্ষমহলকেও ব্যস্ত থাকতে হয়েছে৷ এ ধরনের মন্তব্য করে বিপক্ষকে ব্যতিব্যস্ত রাখা, আধুনিক রাজনীতির একটি অংশ৷ তাছাড়া, যারা এসবের প্রতিবাদ করছেন, অতীতে বিরোধী নেতাদের সম্পর্কে অশোভন কথা বলার তাঁদের ট্রাক-রেকর্ডও বাঁধিয়ে রাখার মতো৷ তাই দিলীপ ঘোষের কিছু মন্তব্য মাত্রাছাড়া হলেও তা একশো ভাগ সফল হয়েছে দলকে এবং নিজেকে প্রচারের আলোয় রাখতে৷

শাসকদলের চাপে কিছুটা নেতিয়ে যাওয়া কর্মী- সমর্থকরাও উৎসাহিত হয়েছেন দিলীপের এ ধরনের ‘আগুনখেকো’ ভাবমূর্তিতে৷ তাছাড়া, দলকে এবং দলের কর্মীদের ‘তাজা’ রাখতে নিজের গায়েই এভাবে কাদা মাখতে কবে কোন সভাপতি সক্রিয় হয়েছেন?

দিলীপ ঘোষের প্লাস-পয়েন্ট, সচেতনভাবেই তিনি নিজেকে তথাকথিত “বুদ্ধিজীবী” হিসাবে প্রোজেক্ট করেননি৷ বাংলায় ক্ষমতা দখল করতে এই মুহুর্তে আধখানা বুদ্ধিজীবীরও প্রয়োজন নেই৷ ক্ষমতায় এলে মৌচাকের পাশে নিশ্চিতভাবেই ঝাঁকে ঝাঁকে ‘থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক’ জুটে যাবে৷ এখন দরকার এমন একজন কাণ্ডারি, যিনি কর্মী-সমর্থক-ভোটারদের বুস্ট-আপ করতে পারবেন সবদিক থেকে৷ সেই কাজে সফল তিনি৷

সেই লজিকে বঙ্গ-বিজেপিতে এই মুহুর্তে দিলীপ ঘোষ বিকল্পহীন৷ সন্ধিক্ষণে সঠিকহাতেই ব্যাটন তুলে দিয়েছে দিল্লির বিজেপি৷

আরও পড়ুন-গুরুতর অভিযোগ না থাকলে কলকাতায় ‘সিটিং’ কাউন্সিলরদের রাখছে তৃণমূল,কণাদ দাশগুপ্তের কলম