লক্ষ্য বাংলা: মোদি-শাহ চান সৌরভকে, ভাগবতের পছন্দ মিঠুন

কুণাল ঘোষ

কুণাল ঘোষ

চলতি করোনা এবং আমফান বিপর্যয়ের আবহেও বাংলার রাজনৈতিক ক্ষমতাদখলের অঙ্ক থেকে সরছে না বিজেপি। আগামী কয়েকমাসের মধ্যেও বড়ধরণের পদক্ষেপের প্রস্তুতি নিচ্ছে তারা। শীর্ষমহল সূত্রে তার নির্দিষ্ট ইঙ্গিত মিলেছে।

সূত্রটি জানিয়েছে, এর জন্যে ত্রিস্তরীয় পরিকল্পনা করছেন দিল্লির শীর্ষনেতারা। প্রথমত, বাংলার তৃণমূল সরকারকে ব্যতিব্যস্ত রাখা। নানারকম প্রশাসনিক প্যাঁচ। দ্বিতীয়ত, রাজ্য বিজেপি সংগঠনকে যথাসম্ভব সক্রিয় রাখা ও বাংলার আমজনতা মধ্যে পরিবর্তনের চাহিদা তৈরি। এবং তৃতীয়ত, বিকল্প মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে নতুন মুখ তুলে ধরা।

সর্বোচ্চ সূত্রে খবর, দিল্লি মনে করছে মুখ্যমন্ত্রিত্বের প্রশ্নে বিকল্প মুখ এই মুহূর্তে রাজ্য বিজেপিতে নেই। লোকসভা নির্বাচনে সাফল্য ছিল নরেন্দ্র মোদির মুখকে সামনে রেখে। কিন্তু বিধানসভায় সেরকম কোনো মুখ নেই যাঁর উপর মানুষ আস্থা রেখে সরকার পাল্টানোর কথা ভাবতে পারেন। দিলীপ ঘোষ রাজ্য সভাপতি হিসেবে খুবই ভালো কাজ করছেন, কিন্তু এখনও দিলীপবাবুকে দিল্লি মুখ্যমন্ত্রী ভাবছে না।

এহেন পরিস্থিতিতে তিনটি নামে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে দিল্লি। তিনটি নামই বিজেপির বাইরের।
প্রথম নাম সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়। নরেন্দ্র মোদি এবং অমিত শাহ চাইছেন সৌরভকে বিকল্প মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তুলে ধরে ভোটে যেতে। বিষয়টি সৌরভকে জানানোও হয়েছে বলে খবর; যদিও এর কোনো কনফার্মেশন আনুষ্ঠানিকভাবে নেই। কয়েকমাসের মধ্যে যদি দেখা যায় বাংলার শাসকদলকে চাপে ফেলা গিয়েছে, তাহলে সৌরভকে ময়দানে নামিয়ে শেষপর্যায়ের হাওয়া তৈরি হবে।

সৌরভ যদি একান্ত দাঁড়াতে না চান, তাহলে বিজেপির পছন্দ মিঠুন চক্রবর্তী। আর এস এস প্রধান মোহন ভাগবতও মিঠুনকেই পছন্দ করছেন। বাংলায় মিঠুনের গ্রহণযোগ্যতা যথেষ্ট। জনপ্রিয় মুখ। শুধু সিনেমার তারকা নন, সমাজসেবার জন্যেও মিঠুন বিখ্যাত। একটা সময়ে বাম এবং তৃণমূলের বাইরে নিজের দল গড়ার ইচ্ছে ছিল তাঁর। রাজনীতিতে বরাবর আগ্রহী মিঠুন একসময়ে বামেদের এবং কংগ্রেসের ঘনিষ্ঠ ছিলেন। পরে তৃণমূলের সাংসদ হন। তীব্র অভিমানে মাঝপথে সাংসদপদ ছেড়ে দেন এবং বাংলা থেকেও দূরত্ব রাখেন। সূত্রের খবর, মিঠুনের কাছে প্রস্তাবটি পৌঁছে গিয়েছে। তাঁকে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে প্রজেক্ট করার কথা ভাবছে দিল্লি। মিঠুন হ্যাঁ বা না, কিছুই বলেননি এখনও।

সৌরভ বা মিঠুন ছাড়া তৃতীয় নামটি রাজনৈতিক। এখন তিনি তৃণমূলের গুরুত্বপূর্ণ নেতা। রাজ্যব্যাপী পরিচিতি ও তৎপরতা আছে। তিন চারটি জেলায় তাঁর গভীর প্রভাব। একটি সংস্থার রিপোর্ট দিল্লিকে জানিয়েছে, এই ব্যক্তিকে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তুলে ধরলে সুফল মিলতে পারে।

ফলে বিজেপির দিল্লির নেতৃত্ব এখন বাংলায় সরকারকে চাপে রাখা আর মানুষের মন জয়ের নীতিতে চলবেন। কারণ রাজ্য বিজেপি থেকে বিকল্প মুখ তৈরির চেষ্টা তাঁরা আর করবেন না। বিজেপির এক শীর্ষসূত্রের বক্তব্য, তাঁদের সমীক্ষা বলছে, এই মুহূর্তে 294টি আসনের মধ্যে তাঁরা 112টি আসনে নিশ্চিতভাবে এগিয়ে আছেন। আগামী কমাসে এই সংখ্যাটি তাঁরা আরও 30 থেকে 40টি বাড়াতে চান। এবং শেষে নতুন বিকল্প তারকা মুখ এনে ঝড় তুলে ফিনিশিং টাচ দেওয়ার চেষ্টা করবেন। তবে, বাংলার সংখ্যালঘু ভোটাররা যে মূলত বিজেপির দিকে থাকবেন না, তা নিশ্চিত। এবং এটা শতাংশের হিসেবে বেশ বড়। এই বিষয়টি এখনও ভাবাচ্ছে বিজেপি শীর্ষনেতৃত্বকে।

সূত্রটি বলছে, নেতৃত্ব জানেন বাংলায় ব্যক্তি মমতার ‘ব্র্যান্ড ভ্যালু’ বিরাট। ফলে বহু ক্ষুব্ধ মানুষও শেষ পর্যন্ত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মুখে সম্মোহিত হয়ে আসল সময়ে তৃণমূলকে ভোট দিয়ে দেন। লোকসভায় মোদিও এই বিরাট জয় পেয়েছেন বিকল্প মুখ মানুষের সামনে বিরোধীরা রাখতে পারেননি বলে। ফলে এইবার বাংলায় রাজনৈতিক রুটিন কাজগুলির পাশাপাশি বিজেপি শীর্ষনেতারা বিকল্প মুখে জোর দিচ্ছেন। শুধু সংগঠন দিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মোকাবিলা করা কঠিন এবং এখনও পর্যন্ত অসম্ভব। দিল্লির ফর্মুলা, আপাতত তৃণমূলবিরোধী আবহ তৈরি করতে করতে যদি পরিস্থিতি বদলের অনুকূলে হয়, তাহলে সৌরভ বা মিঠুনকে আসরে নামিয়ে “মুখ বনাম নতুন মুখ” ফোকাসে লড়াইটি নিয়ে যাওয়ার অঙ্ক কষা চলছে। তবে এই চেষ্টা আর আলোচনা আদৌ কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করবে সৌরভ, মিঠুন বা তৃতীয় ব্যক্তির সম্মতির উপর। সূত্র বলছে, এখনও পর্যন্ত কোথাও কোনো “না”-এর খবর নেই। তবে জল আরেকটু না গড়ালে বোঝা যাবে না।
তবে ধন্দ আছে শীর্ষমহলেও। সৌরভ বা মিঠুন বড় নাম। কিন্তু দীর্ঘদিন রাজনীতি বা জনআন্দোলনে থাকা মমতার মুখে বিকল্প খেলা বা সিনেমাজগতের তারকা হতে পারেন কিনা, বাংলার ক্ষেত্রে পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না। আপাতত রাজ্যের বিভিন্ন স্তরে অরাজনৈতিক সেলিব্রেটিদের জয়-পরাজয়ের কেন্দ্রওয়াড়ি একটি রিপোর্ট তৈরি করা হচ্ছে।