তপন ঘোষ এবং কুমিরের কান্না,কণাদ দাশগুপ্তর কলম

কণাদ দাশগুপ্ত

‘সিংহবাহিনী’-র প্রতিষ্ঠাতা তপন ঘোষ প্রয়াত হলেন৷

নাওয়া-খাওয়া ভুলে জীবনজুড়ে সংগঠনের কাজ করেছেন৷ সেই কর্মকাণ্ডের সুফল ভোগ করেছে এবং করছে অন্যরা, আর তপনবাবু নিজের শরীরে ডেকে নিয়ে আসেন নানা রোগ৷ তারই খেসারত দিলেন তপনদা, মাত্র ৬৮ বছর বয়সে, নিজের জীবন দিয়ে৷

কোভিডে আক্রান্ত হয়েও একদম সুস্থ হয়ে যান তিনি৷ কিন্তু লুকিয়ে থাকা সেই সব রোগ তখনই মাথাচাড়া দেয়৷ এবং অকালে প্রয়াত হলেন সাম্প্রতিক কালের সর্বোত্তম সজ্জন, সুভদ্র, মিষ্টভাষী এবং প্রকৃত শিক্ষিত এক জনপ্রিয় সংগঠক তপন ঘোষ৷

তপনদা’র সঙ্গে পরিচয় দীর্ঘদিনের৷ তাঁর মতাদর্শের সঙ্গে যোজনসমান ফারাক আমার৷ সবই জানতেন উনি৷ তা সত্ত্বেও এক মুহুর্তের জন্যও সেই সম্পর্কে একফোঁটা চিড় ধরেনি৷ প্রকৃত শিক্ষিতরা এমনই হয়৷ অনেক কথা হতো৷ তপনদা বলতেন তাঁর কর্মকাণ্ডের কথা, অতীতের কথা, পরিকল্পিতভাবে তাঁকে দলে একঘরে করে দেওয়ার কথা৷ বলতেন, কিছু অযোগ্য মানুষ নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করতে কীভাবে হিন্দুত্বকে বাজি’তে লাগিয়েছে৷ বলতেন, ভাবা যায় না, এমএলএ-এমপি হওয়ার জন্য কিছু মানুষ কীভাবে হিন্দুধর্মকে ব্যবহার করে চলেছেন৷ এবং বলতেন, এদের হাতে হিন্দুধর্মের সার্বিক বিকাশ অসম্ভব৷
আজ তপনদা’র মৃত্যুর পর সোশ্যাল মিডিয়ায় বিশেষ কিছু মানুষের নিয়মমাফিক শোকবার্তা নজরে আসছে৷ এদের অনেকেই তপনবাবুকে নিয়মিতভাবে অবজ্ঞা করেছেন, তাঁর অসামান্য সাংগঠনিক প্রতিভার ফসল তুলে খেয়েছেন এবং তাঁকে মূল সংগঠনের ধারেকাছে ঘেঁষতে দেননি, পাছে তাদের জারিজুরি ধরা পড়ে যায়৷ তাদের চোখেই আজ কুমীরের কান্না দেখে বেশ আমোদ লাগছে৷ আবার এমনও অনেককে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে দেখছি, যারা এখনও জানেননা তপন ঘোষ ঠিক কী ছিলেন৷ তবু তাঁদের শ্রদ্ধা নিবেদন অকৃত্রিম৷ কিন্তু যারা সব কিছু জেনে, বুঝে এবং অপমান করার পর আজ বলছেন “অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেলো”, তাদের মানুষ বলে ভাবতেই অস্বস্তি হচ্ছে৷
শেষ কয়েকবছর কার্যত একাই থাকতেন তপনদা৷ একা থাকা মানে, ওই সব রাজনৈতিক চরিত্রগুলির ছায়া না মাড়িয়ে থাকার কথাই বলতে চাইছি৷ থাকতেন নিজের অসংখ্য ‘ছেলে- মেয়েদের’ নিয়ে৷
বর্ণময় কর্মজীবনের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সংগঠনের দায়িত্বে ছিলেন তপনদা৷ শুধু এ রাজ্য বা ভারতই নয়, বিশ্বের বহু দেশেই হিন্দু সংগঠন তৈরি করার কাজ করেছেন তপনদা৷ এক সময়ে RSS-এর প্রচারক ছিলেন৷
বর্ধমান, হুগলি, হাওড়া, দুই ২৪ পরগনার সাংগঠনিক দায়িত্বে ছিলেন তিনি। তবে বেশ কয়েক বছর সঙ্ঘের সঙ্গে তপনদা’র কোনও সম্পর্কই ছিল না। নীতিগত কারনে প্রবল মতানৈক্য, এবং তারপর একদিন সঙ্ঘের সম্পর্ক ছেড়ে নতুন সংগঠন গড়েন।
তপনদা’ই বলেছিলেন,তিনি RSS- এ যোগ দেন ১৯৬০-এর দশকের শেষভাগে৷ জরুরি অবস্থার সময়ে কপালে জুটেছিলো দীর্ঘ কারাবাস৷ রাজ্যে অখিল ভারতী বিদ্যার্থী পরিষদ বা ABVP-র
সংগঠন-সম্পাদক হন। তখনই তিনি রাজনীতিতে যোগ দিতে চেয়েছিলেন৷ কিন্তু তখনকার বিজেপি নেতৃত্ব তপনদার প্রস্তাব খারিজ করে তাঁকে ফের হাওড়া ও হুগলি জেলার RSS প্রচারকের দায়িত্ব দেওয়া হয়৷ মৌরিগ্রামে ‘আল্লানা কসাইখানা’ নিয়ে দুর্বার আন্দোলন শুরু করেন। পাশে ছিলেন তৎকালীন বিশ্ব হিন্দু পরিষদের আন্তর্জাতিক প্রধান অশোক সিংঘল। রহস্যজনকভাবে এই আন্দোলনের কারনেই তাঁকে হাওড়া ও হুগলি থেকে সরিয়ে
দুই ২৪ পরগনায় দায়িত্বে পাঠানো হয়৷ ফের দায়িত্ব বদল হয়। তপনদা’কে পাঠানো হয় দিল্লিতে বজরং দলের সর্বভারতীয় দায়িত্ব দিয়ে৷ আর তারপরেই RSS- এর সঙ্গে সম্পর্ক পাকাপাকিভাবে ছেদ
করে তিনি তৈরি করেন তাঁর নিজস্ব সংগঠন ‘হিন্দু সংহতি’। মধ্য কলকাতায় নিজের পৈতৃক বাড়িতেই তৈরি হয় সংগঠনের অফিস৷ নিয়মিত প্রকাশ করতেন
সংগঠনের পত্রিকা। এক সময়ে নিজে সরে এসে নিজের অনুগামী দেবতনু ভট্টাচার্যের হাতে দেন সভাপতির দায়িত্ব। সেই সময়ে তিনি জানিয়েছিলেন, নতুন প্রজন্মকে এগিয়ে আনতেই এই পদক্ষেপ। পরে হিন্দু সংহতিও এক সময় ভেঙে দেন তিনি। তৈরি করেন ‘সিংহবাহিনী’ নামে এক সংগঠন।

জীবনজুড়েই তপন ঘোষের মূল পরিচয় ছিলো হিন্দু-নেতা হিসেবে৷ এ রাজ্যে এক হিন্দু-নেতা হিসাবে তপনদার জনপ্রিয়তার ত্রিসীমানায় আজও নেই কোনও তথাকথিত নেতা৷এই জনপ্রিয়তাই এক সময়ে তপনদা’র শত্রু হয়ে দাঁড়ায়৷ এ রাজ্যের কিছু স্বঘোষিত তথাকথিত হিন্দু ধর্মের ‘পোস্টার বয়’ তপনবাবুকে কেন সহ্য করতে পারতেন না, সে সব অন্য কাহিনী, যা পরে কখনও বলা যাবে৷

লেখার আয়তন দীর্ঘ হয়ে যাচ্ছে৷ এবার অন্য এক ইতিহাস বলি৷

২০১৮ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি,
ভ্যালেন্টাইনস ডে। এই দিনটিতে প্রতিবছরই ধর্মতলায় সমাবেশ করতেন তপন ঘোষের সংগঠন ‘হিন্দু সংহতি’। সেদিনও হয়েছিলো৷ তপনবাবু সেদিন মঞ্চে এক পরিবারের ১৪ জন সদস্যকে মঞ্চে হাজির করেন৷ হুসেন আলি নামে এক ব্যক্তি ও তাঁর স্ত্রী- সন্তানেরা হিন্দু সংহতির মঞ্চে উঠে ‘হিন্দু’ হওয়ার দাবি করেন। গোলমাল শুরু হয়৷ তপন ঘোষ-সহ ৪ জনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। দীর্ঘক্ষণ হেয়ার স্ট্রিট থানায় বসিয়ে রাখার পর তপনদা’দের পাঠানো হয় প্রেসিডেন্সি জেলে৷

ওই বয়সের অসুস্থ এক মানুষকে
প্রেসিডেন্সিতে পাঠানোর খবর পেয়েই ব্যক্তিগতভাবে আমি চেষ্টা শুরু করলাম যাতে তপনদার তেমন অসুবিধা না হয়৷ বন্ধু তথা প্রাক্তণ সাংসদ কুণাল ঘোষকে বললাম সব কথা৷ কুণাল তখন বন্দিজীবন থেকে মুক্ত হয়েছে৷
প্রেসিডেন্সি জেলের সুপার থেকে সেন্ট্রি, সবাই পরিচিত৷ বিশ্বাস করবেন না, নিজের মতাদর্শের সঙ্গে ফারাক থাকা সত্ত্বেও এক মুহূর্তের সিদ্ধান্তে কুণাল প্রেসিডেন্সিতে ফোন করলো কারো সঙ্গে৷ সেই ফোনে তপনদা’র সঙ্গে আমাদের কথা হলো৷ কুণাল একাধিকজনকে বলে দিলো, তপনদা’র যেন কোনও অসুবিধা না হয়৷ যে ক’দিন তপনদা প্রেসিডেন্সিতে ছিলেন, প্রতিদিন দো-বেলা কথা হয়েছে৷ তপনদা-কেই তখনই কুণাল বলেছিলো, “আপনার সঙ্গে আমার আদর্শের ফারাক থাকলেও আপনি একজন শিক্ষিত এবং প্রবীণ মানুষ৷ আপনার যাতে অসুবিধা না হয়, সে দিকে নজর দিতে হলে আদর্শের মিল থাকতে হবে, এ আবার কেমন কথা?”

সত্যিই তাই৷ যাদের সঙ্গে তপনদার আদর্শগত মিল ছিলো, সহকর্মী ছিলো, তাদের সেদিন খোঁজ মেলেনি৷ আজ অবশ্য তাঁদের অনেকেই “গভীর শোকে” ভেঙ্গে পড়ার কথা জানাচ্ছেন৷

এরপর একদিন জেল থেকে মুক্তি পেলেন তপন ঘোষ৷ ছাড়া পেয়েই আসেন আমার বাড়িতে৷ সৌজন্য প্রকাশ করতে চলে যান কুণালের বাড়িতেও৷ এই আন্তরিকতায় আমরা মুগ্ধ হই নিঃসন্দেহে৷

ওদিকে কুণালের বাড়িতে বসেই তপনদা কুণালকে প্রস্তাব দিয়েছিলেন, “আসুন একসঙ্গে কাজ করি হিন্দুধর্মকে আরও শক্তিশালী করতে৷” উত্তরে সবিনয়ে কুণাল বলেছিলো, “আমি সবসময় হিন্দু এবং মুসলিমদের সঙ্গেই থাকি৷ সেখান থেকে সরে শুধু এক সম্প্রদায়ের পাশে থাকবো, তা হয়না৷” উদারমনস্ক তপনবাবু সঙ্গে সঙ্গে বুঝে ফেলেন৷ তারপর যতদিন দেখা হয়েছে, একদিনও সে কথা বলেননি৷ লকডাউন পর্বের কিছুদিন আগেও তপনদা কুণালের বাড়ি গিয়েছিলেন বিশেষ এক কাজে৷

তপনদা আমাকেও বলেছিলেন তাঁর সংগঠনের মুখপত্রটি দেখার জন্য৷ সম্ভব হয়নি৷ কিন্তু তাতেও সম্পর্কের অবনতি হয়নি৷ এমনই বড় মনের মানুষ ছিলেন তপন ঘোষ৷ যারা তপনদা’র সঙ্গে কাজ করেছেন, তাদের কাছে এ সব কথা বলা নেহাতই বাতুলতা৷
সে চেষ্টা করার অর্থ স্পর্ধা প্রদর্শন৷

যারা একসময়ে তপন ঘোষের সাংগঠনিক দক্ষতা এবং জনপ্রিয়তা দেখে ভীত হয়ে তাঁকে টেনে নামিয়ে, অপমান করার পর আজ, মৃত্যুর পর তাঁকে ‘শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের পাশের চেয়ারে বসানো’-র ভণ্ডামি করছেন, আমি তো শুধু তাদের কথাই বললাম৷