হাসিনা-মোদি শীর্ষ সম্মেলন , পারস্পরিক সহযোগিতায়  জোর 

খায়রুল আলম, ঢাকা

করোনাভাইরাস মহামারির মধ্যে ভার্চুয়াল শীর্ষ সম্মেলনে ( virtual summit ) যোগ দিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সহযোগিতার সম্পর্ক আরও এগিয়ে নেওয়ার কথা বললেন  দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ( Narendra Modi ) বলেছেন, তার সরকার ‘প্রতিবেশীর অগ্রাধিকার’ নীতিতে পরিচালিত হচ্ছে এবং সেই নীতির ‘এক নম্বর স্তম্ভ’ হচ্ছে বাংলাদেশ (Bangladesh)।বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক শক্তিশালী করার এই নীতি দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম দিন থেকেই আমার অগ্রাধিকারে রয়েছে।

আর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা (Bangladeshi Prime minister Sheikh Hasina) বলেছেন, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে যে সহযোগিতামূলক ঐকমত্য রয়েছে, তার সুযোগ নিয়ে দুই দেশই নিজ নিজ অর্থনীতিকে আরও সুসংহত করতে পারে।বাংলাদেশ ও ভারতের অর্থনীতির ক্রমবর্ধমান পারস্পরিক নির্ভরতাকে আমরা আনন্দের সঙ্গে স্বীকৃতি দিই।

তাদের এ বৈঠকের আগে ঢাকায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় দুই দেশের মধ্যে জ্বালানি, সামাজিক উন্নয়ন, কৃষিসহ সাতটি বিষয়ে সহযোগিতার লক্ষ্যে  চুক্তি, প্রটোকল ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়।

আর ভার্চুয়াল বৈঠকে ৫৫ বছর পর বাংলাদেশের চিলাহাটি ও ভারতের হল‌দিবাড়ির মধ্যে রেল ক‌রিডোরেরও উদ্বোধন করেন দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী। ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের (India Pakistan war) সময় ওই রেলপথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।

এই প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, “আমি বিশ্বাস করি, উভয় দেশ বিদ্যমান সহযোগিতামূলক ঐকমত্যের সুযোগ নিয়ে আমাদের অর্থনীতিকে আরও সংহত করে বৈশ্বিক এবং আঞ্চলিক ভ্যালু-চেইন আরও সমৃদ্ধ করতে পারে। আমাদের চলমান যোগাযোগের উদ্যোগগুলি এক্ষেত্রে অনুঘটক হিসেবে কাজ করতে পারে। এর অন্যতম উদাহরণ হল ‘চিলাহাটি-হলদিবাড়ি’ রেল সংযোগ পুনরায় চালু করা।”

এ অনুষ্ঠানেই মহাত্মা গান্ধী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের (Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman) উপর ডিজিটাল প্রদর্শনীর উদ্বোধন করা হয়।

এই প্রসঙ্গে মোদি বলেন, “এটা গর্বের যে, আমি মহাত্মা গান্ধী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ওপর ডিজিটাল প্রদর্শনীর ( Digital Display ) উদ্বোধন করতে পারছি। তারা আমাদের তরুণদের সবসময়ই উদ্বুদ্ধ করে যাবেন।”

চলতি বছরের মার্চে মুজিববর্ষের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে। তবে করোনাভাইরাসের মহামারির কারণে মূল আয়োজন বাতিল হওয়ায় তার আর ঢাকা আসা হয়নি।

আগামী বছর ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণের জন্যও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান নরেন্দ্র মোদি।

তিনি বলেন, করোনাভাইরাস মহামারির কারণে এ বছর নানা চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করতে হচ্ছে। সঙ্কটের এই সময়ে স্বাস্থ্য, কোভিড-১৯, টিকার মত বিষয়ে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে।

শেখ হাসিনা বলেন, কোভিড-১৯ মহামারিতে বিশ্ব মহা বিপর্যয়ের সম্মুখীন এবং মানবজাতি কীভাবে এই অজানা শত্রুর মোকাবিলা করে তার পরীক্ষার মুখোমুখি।

তিনি আরও বলেন,    “সম্ভবত কোভিড-১৯ মহামারীর সবচেয়ে বড় বহিঃপ্রকাশ হল মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা। এ বছরের গোড়ার দিকে ঢাকায় আপনাকে স্বাগত জানানোর ইচ্ছা অপূর্ণ থেকে গেছে। তবুও, আমাদের গত শীর্ষ সম্মেলনের দিক-নির্দেশনা অনুযায়ী, এই ক্রান্তিকালীন সময়ে উভয় পক্ষের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যেভাবে আমাদের দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা এগিয়ে নিয়েছে- তা প্রশংসাযোগ্য।”

শেখ হাসিনা বলেন, মুক্তিযুদ্ধে বাঙালির বিজয়ের মাসে এ বৈঠকে করতে পেরে তিনি আনন্দিত। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে শহীদ হওয়া ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের প্রতি তিনি শ্রদ্ধা জানান।

২০১৯ সালের অক্টোবরে দিল্লির হায়দরাবাদ হাউসে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠকের কথা স্মরণ করে তার আতিথেয়তার জন্য ধন্যবাদ জানান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী।

এ বছর মহামারির মধ্যেও দুই দেশের সহযোগিতা অব্যাহত থাকার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “এ বছর জুড়ে রেলরুট দিয়ে বাণিজ্য, উচ্চ-পর্যায়ের পরিদর্শন ও সভা, সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ, কলকাতা থেকে উত্তর-পূর্ব ভারতে ভারতীয় পণ্যসামগ্রীর প্রথম পরীক্ষামূলক চালান প্রেরণ এবং অবশ্যই, কোভিড-১৯ বিষয়ে সহযোগিতার ন্যায় বিভিন্ন উদ্যোগ আমরা গ্রহণ করেছি।”

বিশ্বের অন্যতম ক্ষতিগ্রস্ত ও জনবহুল অঞ্চলে ভারত সরকার যেভাবে কোভিড-১৯ মোকাবিলা করেছে, সেজন্য নরেন্দ্র মোদীর সরকারের প্রশংসা করেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

তিনি বলেন, “আপনার স্বাস্থ্যসেবা প্যাকেজগুলি ছাড়াও, ‘আত্মনির্ভর ভারত’-এর উদ্যোগে প্রবর্তিত অর্থনৈতিক প্যাকেজগুলি প্রশংসনীয়। আমরা বিশ্বাস করি, আপনার গৃহীত নীতিমালার মাধ্যমে ভারত বৈশ্বিক অর্থনীতিতে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।”

ভাইরাস মোকাবেলায় বাংলাদেশ সরকারের নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, “বাংলাদেশেও আমরা এই মহামারির অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব উপশম করতে ১৪.১৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছি। মার্চের গোড়ার দিকে করোনাভাইরাস শনাক্তকরণের পরে আমরা আড়াই কোটির বেশি মানুষকে সহায়তা প্রদানের জন্য সামাজিক সুরক্ষার আওতা সম্প্রসারিত করেছি।মহামারির দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলা করতে ব্যাপক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, ফলে আন্তর্জাতিক সরবরাহ চেইনে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটেছে  এবং উপভোক্তাদের চাহিদা হ্রাস পাওয়া সত্ত্বেও আমাদের অর্থনীতি উর্ধ্বমুখী প্রবৃদ্ধির ধারা বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে।”

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক একটি ‘যুগান্তকারী মুহূর্ত’ অতিক্রম করছে মন্তব্য করে শেখ হাসিনা বলেন, “একটি স্বাধীন জাতি হিসেবে বাংলাদেশ ৫০ বছর পূর্তি উদযাপন ( Golden jubilee ) করতে যাচ্ছে এবং বাংলাদেশ এবং ভারত কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠারও ৫০তম বছরে পা রেখেছে।

বাংলাদেশ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উৎযাপন করছে। তার কয়েক মাস আগে, ভারতের জাতির পিতা মহাত্মা গান্ধীর সার্ধশত জন্মবার্ষিকী বাংলাদেশে উদযাপন করা হয়েছে।

শেখ হাসিনা বলেন, “বাংলাদেশে বাপুজির প্রতি শ্রদ্ধার নিদর্শন হিসেবে একটি বিশেষ ডাক টিকিট অবমুক্ত করা হয়েছে।বঙ্গবন্ধুর সম্মানে ভারতের ডাক বিভাগের একটি স্ট্যাম্পের উদ্বোধন করা হয়।”

হাসিনা  বলেন, “১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে আমাদের অবিচ্ছেদ্য যোগসূত্র স্মরণে আমরা বিশ্বব্যাপী বাছাই করা কিছু শহরে আগামী বছর জুড়ে যৌথ কর্মসূচি পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। ২০২১ সালের ২৬-এ মার্চ ঢাকায় আপনার উপস্থিতি আমাদের যৌথ উদযাপনের গৌরবময় স্মৃতি স্মরণীয় করে রাখবে।”