Saturday, June 20, 2026

শাড়ি নয়, মালদহের সেনবাড়ির কলাবউ ঘাঘরা পরে নদীতে যান

Date:

Share post:

সন্ধে নেমে এসেছে৷ মহানন্দার ঘাট তখন শুনসান৷ আশেপাশের জঙ্গলে থাকা শিয়ালের দল রাত জাগার প্রস্তুতি ৷ ঠিক সেই সময়, গোধূলি বেলায় শালগ্রাম শিলা হাতে পুরোহিত ছুটছেন নদীর ঘাটে৷ রীতি মেনে জমিদারবাড়ির শালগ্রাম শিলাকে এই লগ্নেই নদীতে স্নান করাতে হবে৷ তারপর সেই শালগ্রাম নিয়ে তিনি চলে যাবেন নিজের বাড়িতে৷ অনেক পুরোনো রীতি৷ সেনবাড়ির শালগ্রাম শিলা তাঁর বাড়িতেই রাত কাটায়৷ পরদিন ভোরে নারায়ণ ফের ফিরে যান জমিদারবাড়িতে৷ অব্রাহ্মণ জমিদার নিজেই শালগ্রাম শিলার জন্য বেঁধে দিয়েছিলেন এই রীতি৷

দূর থেকে নদীর ঘাটে নৌকা বাঁধা দেখে খানিকটা আশ্চর্য হয়েছিলেন পুরোহিত৷ ঘাটে পৌঁছে তিনি দেখেন, ওই নৌকা থেকে নেমে আসছেন এক সুন্দরী রমণী৷ সঙ্গে দুই ছেলে, দুই মেয়ে৷ ওই রমণী পুরোহিতের কাছে জমিদারবাড়ির রাস্তা জানতে চান৷ কিন্তু হাতে শালগ্রাম নিয়ে কথা বলা নিষেধ৷ তাই পুরোহিত ইঙ্গিতে ওই মহিলাকে জমিদারবাড়ির রাস্তা দেখিয়ে দেন৷ এরপর শালগ্রামকে স্নান করিয়ে বাড়ি চলে যান তিনি৷ তবে তাঁর মনে সন্দেহ জাগে, ভরসন্ধেয় একা ছেলেমেয়ে নিয়ে নৌকায় ওই সুন্দরী রমণী কেন জমিদার বাড়িতে যেতে চান?

পুরোহিতকে পরদিন এনিয়ে জমিদারবাড়িতে কাউকে প্রশ্ন করতে হয়নি৷ ততক্ষণে সবাই জেনে ফেলেছে, ওই রাতে দেবীর স্বপ্নাদেশ পান জমিদার রমেশচন্দ্র সেন৷ স্বপ্নে দেবী তাঁকে আদেশ দেন, ছেলেমেয়ে নিয়ে তারা পৌঁছে গিয়েছেন৷ জমিদার যেন মন্দির নির্মাণ করে তাঁকে স্থাপন করেন৷ পুজোর কিছু সামগ্রী তিনি নিজেই সঙ্গে করে নিয়ে এসেছেন৷ সেসব নদীর ঘাটে রয়েছে৷ ওই সামগ্রীগুলি যেন ঘাট থেকে তুলে আনা হয়৷ স্বপ্নে দেবীর নির্দেশ পেয়ে ঘুম থেকে উঠে ভোর হতেই রমেশ চন্দ্র সেন লোকজন নিয়ে ছুটে যান নদীর ঘাটে৷ দেখেন, সত্যিই সেখানে পুজোর বেশ কিছু সামগ্রী ও খড়্গ পড়ে রয়েছে৷ সেসব বাড়িতে নিয়ে আসেন তিনি৷ এরপরেই তিনি বাড়ির পাশে মন্দির নির্মাণ করে পঞ্চমুণ্ডির আসন প্রস্তুত করান৷ শুরু হয় বর্তমানে জেলার অন্যতম প্রাচীন, বাচামারির সেনবাড়ির দুর্গাপুজো৷

 

পুজো প্রবর্তনের ঠিক এই কাহিনীটাই বলছিলেন বর্তমানে এই পুজোর সেবাইত, দাশগুপ্ত পরিবারের প্রবীণ সদস্য প্রলয়পতি দাশগুপ্ত৷ তিনি জানান, “এই পুজো শুধু পুরাতন মালদহ নয়, জেলার মধ্যে অন্যতম প্রাচীন৷ পুজো ৫০০ বছরে পা দিল৷ গোটা জেলায় সেনবাড়ির পুজো নামে পরিচিত৷ তবে সেনদের কোনও বংশধর এখন আর বেঁচে নেই৷ অনেক আগেই সেই বংশ নিশ্চিহ্ন হয়েছে৷ হয়তো পরবর্তীতে সেই বংশের মেয়েদের কোনও সন্তানের হাতে এই পুজোর ভার যায়৷ সেখান থেকে আমাদের হাতে এসে পৌঁছোয়৷ এখন আমরা এই বংশের পাঁচ পরিবার মিলে পুজো পরিচালনা করে আসছি৷ দেবীর স্বপ্নাদেশে জমিদার মহেশচন্দ্র সেন প্রথমে ঘটে, তারপর পটে এবং শেষে মূর্তিপুজোর প্রচলন করেন৷ দেবীর স্বপ্নাদেশে তিনি মহানন্দার ঘাটে পুজোর যেসব উপকরণ পেয়েছিলেন, তার মধ্যে ছিল দুটি পুষ্পপত্র, একটি গাড়ু, একটি পানের বাটা, পাঁচটি খড়্গ সহ আরও কয়েকটি জিনিস৷ সেসব এখনও রয়েছে৷ শুরুর দিন থেকে প্রতি বছর পুজোয় এই জিনিসগুলি এখনও ব্যবহৃত হয়৷ দেবীর আদেশ অনুযায়ী এখনও ডাকের সাজে প্রতিমা তৈরি হয়”।

 

পরিবারের এক সদস্যা তনুশ্রী দাসগুপ্ত জানান “নিয়ম অনুযায়ী পঞ্চমীর দিন প্রতিমা বেদীতে ওঠেন৷ ষষ্ঠীতে কল্পারম্ভ৷ সপ্তমীর সকালে কলা বউ নিয়ে মহানন্দায় যাওয়া হয়৷ প্রাচীন রীতি মেনে আমাদের কলা বউ শাড়ি নয়, ঘাঘরা পরে নদীতে যান ও আসেন৷ পুজোর বোধন শুরু হয় কৃষ্ণা নবমী তিথি থেকে ৷ পুজোয় বলিপ্রথা রয়েছে৷ আগে মহিষ বলির প্রথা ছিল । তা উঠে গিয়ে এখন পাঠাবলি হয়। সপ্তমীতে হয় সাদা পাঠাবলি। সন্ধিপুজোতে হয় কালো পাঠাবলি এবং মহানবমীতে হয় যে কোনো রঙের পাঠাবলি”।

 

advt 19

advt 19

 

 

 

 

Related articles

বিরোধী দলনেতা বিতর্ক: সিঙ্গল বেঞ্চের নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে ডিভিশন বেঞ্চে শোভনদেব

রাজ্যে বিরোধী দলনেতা নির্বাচন ঘিরে তৈরি হওয়া আইনি লড়াই এবার পৌঁছাল ডিভিশন বেঞ্চে। বিধানসভার স্পিকার রথীন্দ্রনাথ বসুর সিদ্ধান্তকে...

‘Keep Shining’, রাহুলকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা অভিষেকের

লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানালেন সাংসদ তথা তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। শুক্রবার এক্স মাধ্যমে...

তারকেশ্বর থেকে রেড রোড, দুদিনের সফরে উন্নয়নের বার্তা নিয়ে বাংলায় প্রধানমন্ত্রী মোদি

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার গঠনের পর প্রথমবারের মতো দুদিনের সফরে রাজ্যে আসছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি (Narendra Modi)। সফরসূচিতে রয়েছে...

প্রশান্তর মৃত্যুতে সিআইডি তদন্ত, আর্থিক সাহায্যের ঘোষণা মুখ্যমন্ত্রীর

হাওড়ার বাগনানে (Bagnan,Howrah) বিজেপি কর্মী প্রশান্ত দে-র (Prashanta Dey)মৃত্যুর ঘটনায় গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা করল রাজ্য সরকার। নিহতের পরিবারকে মোট...