Monday, February 23, 2026

ধুলো মাটির গান, উৎপল সিনহার কলম

Date:

Share post:

উৎপল সিনহা

‘ প্রাজ্ঞের মতো নয়, অন্ধের ছুঁয়ে দেখার মতো ক’রে বলো।
আমার স্নায়ুতন্তুধমনী নিয়ে আমি এক অভিন্ন সমতলে আছি। অক্ষরগুলো কাগজে বন্ধ ক’রে এসে তুমি যদি গোধূলিতে নিজেকে আচ্ছন্ন করো এবং অন্তত একটা কুড়োনো পাপড়িও আমার ত্বকমুখের অন্ধকারে রাখো তাহলে আমি তোমাকে ঠিক শুনতে পাবো। মঞ্চে নয়, তার বাইরে মাটিতে দৃষ্টিহীনতার মধ‍্যে এক প্রখর সৌহার্দ্যের অবয়বে আমি জেগে আছি। ‘
আশ্চর্য এই লেখার স্রষ্টা কবি অরুণ মিত্র। তাঁর ছবির মতো মায়াময় লেখাগুলিতে আমরা বারবার খুঁজে পাই আমাদের সমাজ সভ‍্যতা ও দেশকাল, প্রান্তিক ও শ্রমজীবী মানুষ, শ্রম, সভ‍্যতার অগ্রগতি ও আবহমান ইতিহাস চেতনা।

ইনিই লেখেন, ‘ যে ছেলেটা মাঠের মধ‍্যে দাঁড়িয়ে আছে তার ঘরে ফিরবার নাম নেই।

কী নিয়েই বা ফিরবে? আমি তাকে এমনিভাবেই রোজ দেখি। আমার বিশ্বাস সে সবসময় অদৃশ্য হয়ে যাবার জন্য অপেক্ষা করে। কিন্তু তার কপালের রক্তচিহ্নটা
এক-একবার আমাকে অভিভূত ক’রে ফেলে। তুমি হয়তো বুঝবে, মানুষের লক্ষণগুলো তুমি হয়তো ঠিক ঠিক জেনে এসেছো। ‘

তাঁর দীর্ঘ মহিমান্বিত জীবনে অরুণ মিত্র বাংলা কবিতার আধুনিক ইতিহাস চোখ দিয়ে দেখেছেন, আঙুল দিয়ে ছুঁয়েছেন এবং ধীরে ধীরে একদিন নিজেই হয়ে উঠেছেন ইতিহাস। তাঁর কবিতাযাপন জুড়ে শুধু মানুষ, মানুষ আর মানুষ।

‘রিকশার চাকা দুটো ঘুরতে ঘুরতে এইখানটায় এসে দাঁড়ায়। আমার বাড়ির সামনে এসে অপেক্ষা করে। যে-লোকটা চালায় একদিনও তার কামাই নেই, এই বিষম ঠাণ্ডাতেও না। এমনিতে তাকে দেখে আমার চেনার কথা নয়, কারণ তার মুখটা যেন রোজই বদলায়। চাকা দুটোর ঘোরা দেখে চিনি। ‘
( কবিতা : রিকশাওয়ালা )

এই অবিস্মরণীয় কবিতাটিতে দেখা যায় রোজ সন্ধ্যায় নিজের ছেলেবউকে অন্ধকারে ফেলে রেখে রিকশাওয়ালা বেরিয়ে পড়ে পেটের তাগিদে। প্রচন্ড শীতের রাতে বিভিন্ন মহল্লা পেরিয়ে নির্দিষ্ট গন্তব্যে কবিকে পৌঁছে দেওয়ার সময় সুতির ফতুয়া পরা সেই রিকশাওয়ালার মধ্যে যেন গনগনে আগুন জ্বলতে থাকে, যার আঁচ কবির গায়ে এসে লাগে, সুতির ফতুয়া তীব্রভাবে উড়তে থাকে হাওয়ায়, আর মনে হয় যেন তার অস্তিমজ্জা জ্বলছে। এই কবিতা শেষ হচ্ছে এইভাবে :
‘ খুব সম্ভব কোনো একদিন সে আসতে পারবে না।
ভেতরের আগুনটা নিবে গিয়ে সে ঠান্ডায় জমে পাথর হয়ে কোথাও প’ড়ে থাকবে। কিন্তু তাবলে রিকশার চাকা দুটো তো মাটিতে গেড়ে যাবে না। তারা আবার ঘুরবে এবং তাই থেকে আমি বুঝব সেই রিকশাওয়ালা হাজির হয়েছে,এখন যেমন বুঝি। এটাই আমার কাছে এক স্বস্তি।’

যন্ত্রী থেমে যাবে কালের নিয়মে। কিন্তু যন্ত্র থেকে যাবে। অন্য কেউ চালনা করবে। ব‍্যক্তিজীবনের আয়ু সীমিত। কিন্তু কর্মের চাকা সদাধাবমান । মনে পড়ে, ‘মানুষের মৃত্যু হলে তবুও মানব থেকে যায়। ‘

দার্শনিক এই কবির কবিতার মধ‍্যে রয়েছে সেই চন্দ্রালোক যা আমাদের হৃদয়কে প্লাবিত করে, অবশ করে এবং জাগায়।

কখনো তাঁর কলম থেকে ঝরেছে ফুল, কখনো আগুন।
‘ লাল ইস্তাহার ‘ কবিতার উপসংহারে কী লিখেছেন তিনি?
‘ প্রাচীরপত্রে অক্ষত অক্ষর
তাজা কথা কয়, শোনো ;
কখন আকাশে ভ্রুকুটি হয় প্রখর
এখন প্রহর গোনো।
উপোসীহাতের হাতুড়িরা উদ‍্যত,
কড়া-পড়া কাঁধে
ভবিষ্যতের ভার ;
দেবতার ক্রোধ কুৎসিত রীতিমতো ;
মানুষেরা, হুঁশিয়ার
লাল অক্ষরে লটকানো
আছে দ‍্যাখো
নতুন ইস্তাহার। ‘

আবার, ‘ আর এক আরম্ভের জন্য ‘ উনি শুরু করছেন তাঁর স্বসৃষ্ট অতুলনীয় কাব‍্যভাষায় :
‘ আমি বিষের পাত্র ঠেলে দিয়েছি
তুমি প্রসন্ন হও।
আমি হাসি আর কান্নার পেছনে আমার প্রথম স্বপ্নকে ছুঁয়েছি
তুমি প্রসন্ন হও। ‘

অরুণ মিত্র আধুনিক কবিতার লক্ষণ হিসেবে কবিতার রূপ নির্মিতিতে মনন ও বোধের সংমিশ্রণে কবিতাকে কখনও জটিল করেন নি, এটাই ওনার কবিতার অন‍্যতম মূল বৈশিষ্ট্য বলা যেতে পারে। তাঁর লেখায় দেখা যায় প্রেম ভালবাসার উজ্জ্বল মানবিক দিক, যুগ-যন্ত্রণার সময় সংকটের দগ্ধ জীবন, বিদ্রোহ ও বিক্ষোভ অতি স্পষ্ট ও অকপট সারল্যে প্রাণময়।

যুগের হুজুগ ও ইতিহাসের ডাক কখনোই উপেক্ষা করতে পারেন নি কবি, বারবার সাড়া দিয়েছেন তাঁর গানের মতো সুন্দর কবিতাগুলিকে হাতিয়ার ক’রে। মানুষের অস্তিত্বের সংগ্রামকে পরম শ্রদ্ধায় স্বীকৃতি দিয়েছেন তাঁর
জীবনব‍্যাপী সৃজনকর্মে। সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার আনন্দ বারবার ধরা পড়েছে তাঁর সৃষ্টিতে। অনন্যতায় স্বতন্ত্র এই কবির আরও কয়েকটি অসামান্য পংক্তি লক্ষ্য করা যাক :
‘ কী বিঘ্ন কী আনন্দ
এ-সাক্ষাতে,
যতই কাঁপি অন্ধ কোনো
আশঙ্কাতে
হৃদয় তবু অগাধ মিলে সামিল,
অনড় হাওয়া যতই তুলুক
পাঁচিল
প্রিয় নামের নিশ্বাসে তা বাতিল
ভাঙবে এ-খিল তারই চরম আঘাতে।’
( কবিতা : শেষ ভোরের ডাক )

‘ দুমুঠো লাল ভাতের স্বাদে
চোখের জলের নুন এখনো
মাখা আছে,
এই কয়েক মিনিট আগে
সবাই তাতে মুখ দিয়েছে
এবং যথারীতি কুঁজো হয়ে
ঘামের ফোঁটা ফেলে
জমেছে এসে মশানে।’
( কবিতা : চিতা )

‘ আমি এত বয়সে গাছকে বলছি
তোমার ভাঙা ডালে
সূর্য বসাও
হাঃ হাঃ আমি গাছকে বলছি…
অন্ধকার হয়েছে আর আমি
নদীকে বলছি
তোমার মরা খাতে
পরী নাচাও
হাঃ হাঃ আমি নদীকে বলছি… ‘
( কবিতা : নিসর্গের বুকে )

‘ তোমাকে এই স্বরব‍্যঞ্জনে রেখেছি,
তুমি তো মাঠের মেয়ে
খঞ্জনার নাচের মেয়ে,
তুমি ডানা ঝাপটাচ্ছ
অনবরত। ‘
( কবিতা : আর একটু থাকো )

‘ বাসনগুলো এক সময়ে
জলতরঙ্গের মতো বেজে উঠবে। তার ঢেউ দেয়াল ছাপিয়ে পৃথিবীকে ঘিরে ফেলবে। তখন হয়তো এই ঘরের চিহ্ন পাওয়া যাবে না।
তবু আশ্চর্যকে জেনো। জেনো এইখানেই আমার হাহাকারের বুকে গাঢ় গুঞ্জন ছিল। ‘
(কবিতা : অমরতার কথা )

ফরাসি ভাষা ও সাহিত্যর অধ‍্যাপক ও অনুবাদক এই কবি তাঁর প্রসারিত দৃষ্টি দিয়ে জীবনের তুচ্ছতম ঘটনা ও সমূহ যন্ত্রণার অন্বেষণে ছিলেন সমানভাবে অক্লান্ত। তাঁর কবিতার ভিত্তিমূলে রয়েছে আন্তর্জাতিক কাব‍্য-ভাবনার বিস্তৃত বিস্ময়।

কবি নিজে কী লিখে গেছেন তাঁর কবিতা লেখা নিয়ে?
‘ মানুষ ও অন‍্য প্রাণীর সংস্পর্শ যখন ভেতর থেকে আমাকে নাড়ায় কিম্বা যখন কোনো নিসর্গদৃশ‍্য আমাকে মুগ্ধ করে, তখন আমার কবিতা লিখতে ইচ্ছে হয়।
লিখিও প্রায়ই। তবে আমার পৃথিবী মনুষ‍্যকেন্দ্রিক। আমার দৃষ্টিকে সবচেয়ে প্রবলভাবে আকর্ষণ করে মানুষ, তার অস্তিত্ব তার জীবন তার আচরণ। ‘

আরও পড়ুন- ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হল ‘অশনি’, বঙ্গেও চলবে দাপট

 

 

spot_img

Related articles

হলিউডকে টেক্কা দিয়ে সেরা ‘বুং’, মণিপুরি ছবির সাফল্যে আপ্লুত মুখ্যমন্ত্রী 

ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে যুক্ত হল আরও একটি নতুন অধ্যায়। ফারহান আখতারের এক্সেল এন্টারটেইনমেন্ট প্রযোজিত, মণিপুরী আবেগঘন নাটক “বুং”...

জামিন হল না সন্দীপসহ আরজি কর ‘আর্থিক বেনিয়ম’ মামলায় ৫ অভিযুক্তের

আরজি কর 'আর্থিক বেনিয়ম' (RG Kar financial irregularities case) মামলায় অভিযুক্ত প্রাক্তন অধ্যক্ষ সন্দীপ ঘোষ (Sandip Ghosh) ও...

পর্যটনে এবার পরিবেশের ছোঁয়া, সরকারি গেস্ট হাউসে সবুজ বিদ্যুৎ 

রাজ্যের পর্যটন মানচিত্রে এবার বড়সড় বদল আসতে চলেছে। পরিবেশ রক্ষায় দায়বদ্ধতা এবং আন্তর্জাতিক পর্যটকদের আর্কষণ করতে পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন...

বিধানসভা থেকে হালিশহর মহাশ্মশান: শুভ্রাংশুকে আগলে মুকুলের শেষযাত্রায় অভিষেক

বিধানসভা থেকে হালিশহর মহাশ্মশান- পরিবারের সদস্যের মতো মুকুল পুত্র শুভ্রাংশু রায়ের পাশে থাকলেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক...