‘হে আমার আগুন’, উৎপল সিনহার কলম

উৎপল সিনহা

‘ কারোর মধ‍্যে আগুন দেখলাম না। ‘

এই খেদোক্তি মাইকেল ক্লার্কের। ইনি প্রাক্তন অস্ট্রেলীয় ক্রিকেটার। নিজেদের দেশে আয়োজিত এবারের( ২০২২ ) টি-২০ বিশ্বকাপের গ্রুপের বাধা পেরোতে পারে নি এককালের দোর্দন্ডপ্রতাপ অস্ট্রেলিয়া। তাই প্রাক্তনদের হাহাকার তো স্বাভাবিক। আগ্রাসী ক্রিকেটের জন‍্য বিখ্যাত ব্র‍্যাডম‍্যানের দেশ। আগুনে ক্রিকেট তাদের রক্তে। বিশ্বক্রিকেটে সম্ভবত সবচেয়ে বেশি সমীহ আদায়কারী এই দেশটি। ব‍্যাটিং, বোলিং ও ফিল্ডিং তিন বিভাগেই দুরন্ত আগ্রাসন তাদের খেলার মূল বৈশিষ্ট্য। সেখানে এবারের এই ন‍্যাতানো, মিনমিনে ক্রিকেট সবাইকে অবাক করেছে। গ্রুপ পর্ব থেকেই অস্ট্রেলিয়ার বিদায় এবারের কুড়ি-কুড়ি বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড়ো অঘটন। ছোট ছোট দেশগুলো এবার চোখ রাঙিয়ে গেল বড় দলগুলোকে। দিয়ে গেল আগামীতে অনেক অপ্রত্যাশিত ওলোটপালটের হুঁশিয়ারী।

কোথায় আগুন? এই মুহূর্তে বিশ্বক্রিকেটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ভারতের খেলাতেও কি তেমন আগুন দেখা গেলো? পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিরাট কোহলির সেই মহাকাব‍্যিক ইনিংসের পর প্রত‍্যাশার যে ফানুস উড়েছিল তা সেমিফাইনালে ইংল‍্যান্ডের বিরুদ্ধে উধাও হয়ে গেল একেবারে ভোজবাজির মতো। এমন নির্লজ্জ আত্মসমর্পণে ছোট দলগুলোও লজ্জা পাবে। জঘন্য বোলিং ও ফিল্ডিং। আর আগুনহীন
অতি সাধারণ ব‍্যাটিং যা কোনো কাজেই লাগে না। শুধুমাত্র বিরাটের খেলায় সামান্য আগুন দেখা গেছে। কিন্তু ক্রিকেট তো একজনের খেলা নয়। আর আগুন তো নিজে নিজেই জ্বলতে পারে না অনন্তকাল, তাকে সমিধ জোগাতে হয় সময়মতো। সেই সমিধ জোগানোর কাজটা কেউই করেন নি। তাই বিরাটের ‘ আগুন ‘ সর্বগ্রাসী হওয়ার বদলে নিস্তেজ হয়ে এসেছে ক্রমশ।

আরও পড়ুন-

শুধু প্রতিভা দিয়েই সবসময় বাজিমাত করা যায় না। চাই দেশপ্রেম, দায়বদ্ধতা, সমবেত শৃঙ্খলাবোধ ও নিরন্তর অনুশীলন। এর মধ‍্যে কোনো একটি কম হলেই বিপর্যয়। ভারতীয় ক্রিকেটেও বেশ কয়েক বছর ধরে ‘ আগুন ‘ অনুপস্থিত। আর ক্রিকেটর কথা যদি বাদ দিই, যদি দেশ-কাল-সমাজের কথাই ধরি, সেখানেও কোথায় আগুন? যদি আগুন থাকবেই তাহলে শঙ্খ ঘোষকে কেন লিখতে হয় : ‘ কথা বলছিল সাদা তিন বুড়ি সাবেক কালের প্রথায়, সবদিক এত চুপচাপ কেন সেই ছেলেগুলো কোথায়? ‘
কোন ছেলেগুলো?
সেই ছেলেরা যারা আগুনের ঠিকঠাক ব‍্যবহার জানতো। যারা আগুনের গান গাইতো। যারা সবার অন্তরে পবিত্র আগুন জ্বালানোর চেষ্টা করে ব‍্যর্থ হয়েছিল এবং শেষে সবার জন্য, সবার কথা ভেবে নিজেদের ভেতরের আগুনে নিজেরাই জ্বলেপুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল। আগুন হওয়া কি খুব সহজ নাকি? সহজই যদি হবে তাহলে জয় গোস্বামীকে কেন লিখতে হয় : ‘ তবু আগুন, বেণীমাধব, আগুন জ্বলে কই? ‘

মাইকেল ক্লার্ক যে আগুন দেখতে চেয়েছিলেন তাঁর দেশের খেলোয়াড়দের মধ‍্যে সেই আগুনের চেয়ে একটুও আলাদা নয় আমাদের ‘ মালতীবালা বালিকা বিদ‍্যালয় ‘- এর সেই মেয়েটির পরমাকাঙ্খিত আগুন যা সহসা জ্বলে উঠলে বদলে যায় জীবন, বদলে যায় খেলা, বদলে যায় সমাজ।

আসলে এখন কোথাওই আগুন নেই তেমন। ইরান আর ইউক্রেনের কথা বাদ দিলে সারা পৃথিবী জুড়েই বিরাজ করছে এক হিমযুগ। রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিপ্রেক্ষিত এখন প্রায় ঢেউহীন। ভাটা আছে অথচ কী আশ্চর্য, জোয়ার নেই! মনে পড়ে আর একটি কবিতার অবিস্মরণীয় কয়েকটি লাইন :
‘ একদিকে তার চোখে চোখ রেখে বিদ‍্যুৎ শিহরণ,
আর বাদবাকি গড্ডালিকার জীবন অন‍্যদিকে,
শুধু তার হাসি তর্জমা ক’রে কেটে গেল এ জীবন… ‘
কোথায় সেই বিদ‍্যুৎ শিহরণ? কোথায়? কোথায় সেই হাসি যার তর্জমা করে কেটে যেতে পারে একটা গোটা জীবন? নেই। নেই। আছে শুধু গড্ডালিকা প্রবাহ। স্রোতহীন, জীবনহারা যেন এক নদী, জীর্ণ লোকাচারে প্রতি পদে যার খাতে পড়ছে প্রাণঘাতী চড়া।

লিলি-টমো-মার্শাল-রিচার্ডসদের যুগে যে আগুন অহরহ জ্বলতো বাইশ গজের বুকে আর দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়তো ক্রিকেট খেলিয়ে দেশগুলোর ক্রিকেটারদের প্রতিদিনের ভাবনায়, অনুশীলনে ও নিত‍্যনতুন উদ্ভাবনে, সেই আগুনের অভাব শুধু মাইকেল ক্লার্ককেই নয়, ব‍্যথিত ও বিস্মিত করেছে সারা বিশ্বের সমস্ত ক্রিকেটপ্রেমীদের। আবার একইসঙ্গে এও সত‍্য যে গোটা মানবসভ্যতা যখন স্হবিরতায় আক্রান্ত তখন শুধুমাত্র ক্রিকেটারদের মধ‍্যেই আগুনের সন্ধান পাওয়া যাবে এটাই বা কীভাবে সম্ভব?
এমনকি যারা চিরকাল টানে দাঁড়, ধরে থাকে হাল, যারা কাজ করে দেশে দেশে নগরে ও বন্দরে, সারা বিশ্বের প্রান্তরে প্রান্তরে, যারা প্রকৃতই জানে আগুনের ব‍্যবহার সেই ক্লান্তিহীন সর্বকালজয়ী শ্রমজীবী শ্রেণীর মধ‍্যেও কি দেখা যাচ্ছে কাঙ্ক্ষিত আগুন?
তাহলে মিছিমিছি অস্ট্রেলীয় ক্রিকেটারদের কাঠগড়ায় তুলে কী লাভ?

আরও পড়ুন- ফের টাকা উদ্ধার মালদহে, এবার শ্রমিকের বাড়িতে মিলল ৩৭ লক্ষ

Previous articleBreakfast news : ব্রেকফাস্ট নিউজ