Tuesday, February 24, 2026

‘জোনাকির রঙে ঝিলমিল’, উৎপল সিনহার কলম

Date:

Share post:

উৎপল সিনহা

ও জোনাকি , কী সুখে ওই
ডানা দুটি মেলেছো ।
আঁধার সাঁঝে বনের মাঝে
উল্লাসে প্রাণ ঢেলেছো ।।

তারাভরা আকাশ আমরা দেখি রাতে । রাতের আকাশে অজস্র তারা মিটমিট করে জ্বলতে থাকে । আর প্রতি রাত্রে আমাদের পৃথিবীর বুকে মিটিমিটি জ্বলতে থাকে অসংখ্য জোনাকি পোকা । যে কোনো সন্ধ্যায় পুরুলিয়া বা বাঁকুড়া জেলার যে কোনো পাহাড়ের সামনে গিয়ে দাঁড়ালে যে অপরূপ আলোর মালা দেখা যায় তা সমবেত লক্ষ লক্ষ জোনাকির আলো । সন্ধ্যায় গ্রামাঞ্চলে গেলে মনে হয় তারাভরা আকাশটা বোধহয় মাটিতে নেমে এসেছে। আহা , কী অপূর্ব যে প্রকৃতির লীলা !

তুমি নও তো সূর্য , নও তো চন্দ্র , তোমার তাই ব’লে কি
কম আনন্দ ।
তুমি আপন জীবন পূর্ণ ক’রে
আপন আলো জ্বেলেছো ।।

ইংরেজিতে এই পোকাগুলিকে বলা হয় ‘ ফায়ার ফ্লাই ‘ । এরা খুব বেশি বাঁচে না । এই স্বল্প আয়ুষ্কালেই পৃথিবীকে আলোয় ভরিয়ে দিয়ে যায় । বন্য অঞ্চলে এদের গড় আয়ু প্রায় এক বছর । এরা সাধারণত প্রাপ্তবয়স্ক হিসাবে প্রায় দু’মাস বাঁচে । কিছু প্রজাতি লার্ভা পর্যায়ে প্রায় বছর দুয়েক বেঁচে থাকতে পারে । গড় জোনাকি পোকার জীবনচক্র লক্ষ্য করলে দেখা যায় এরা মেটামরফসিসের চারটি ধাপ অতিক্রম করে , সেগুলো হলো যথাক্রমে ডিম , লার্ভা , পিউপা এবং প্রাপ্তবয়স্ক ।

তোমার যা আছে তা তোমার আছে , তুমি নও গো ঋণী কারো কাছে ,
তোমার অন্তরে যে শক্তি আছে
তারি আদেশ পেলেছ ।।

বাংলায় এদের নামটি বড়ো সুন্দর , তমোমণি । ল্যামপিরিডি পতঙ্গ পরিবারের মূলত পাখাওয়ালা গুবরে পোকাদের একটি বর্গ হলো ( কলিওপ্টেরা বর্গ ) জোনাকি। এরা জৈব রাসায়নিক ব্যবস্থায় নিজেদের শরীর থেকে আলো উৎপন্ন করে । এদের এই আলো উৎপাদনের কারণ হিসেবে যৌন মিলন ও শিকার ধরার সময়কে ধরা হয় । এরা কোল্ড লাইট বা নীলাভ আলো উৎপন্ন করে কোনো আল্ট্রাভায়োলেট বা ইনফ্রারেড তরঙ্গ ছাড়া । এই আলোর রং হলুদ , সবুজ বা ফিকে লাল হতে পারে ।

প্রায় ২০০০ জোনাকির প্রজাতি পাওয়া গেছে গ্রীষ্ম এবং নাতিশীতোষ্ণ এলাকায় । ডোবা , ভেজা এলাকা এবং কাঠ আছে এমন অঞ্চলে এরা বসবাস করে , কারণ এই স্থানগুলোতে তাদের লার্ভা বেঁচে থাকার জন্য পর্যাপ্ত খাদ্য পায় । তাদের ছানা বা কীটগুলো থেকেও আলো নির্গত হয় , এদের গ্লোওয়ার্ম বলা হয় । লাল ও সবুজ আলোর জোনাকি বেশি দেখা যায় । এদের তলপেটে স্বয়ংপ্রভ নীলাভ-সবুজ দ্যুতি থাকে । এরা সমবেতভাবে এক ছন্দে মিটমিট করতে পারে । এই দ্যুতি আসে লুসিফারিন অক্সিজেন ও এটিপি-র সংমিশ্রণের লুসিফারেজ দ্বারা অনুঘটিত জারণ থেকে ।

পুরুষ জোনাকির ডানা থাকে , সে উড়তে পারে । স্ত্রী জোনাকির ডানা নেই , তাই উড়তে পারে না । একবার জ্বলে , একবার নেভে , এইভাবে আলো দেয় পুরুষ জোনাকি । পুরুষ জোনাকির উদরাংশ কতগুলো ছোট ছোট ভাগে ভাগ করা । এই ভাগগুলোর ষষ্ঠ ও সপ্তম ভাগের মাঝখানে পুরুষ জোনাকির আলোর যন্ত্রটি থাকে । এটা তলার দিকে । যে অংশ থেকে আলো বেরোয় তার ঠিক উপরেই আছে আরেকটি স্তর । এই স্তর আলোর প্রতিফলনে সাহায্য করে । আলোক যন্ত্রের কোষগুলো রাসায়নিক বিক্রিয়ায় যে আলো তৈরি করে তাতে কোনো উত্তাপ তৈরি হয় না । তাই এই ধরনের আলোকে ঠাণ্ডা আলো বলে । স্নায়ুর মাধ্যমে সংকেত পেয়ে আলোর যন্ত্রের কোষে অবস্থিত লুসিফেরিন অক্সিজেনের সাথে যুক্ত হয়ে জারিত লুসিফেরিন তৈরি হয় । জারিত লুসিফেরিন থেকেই আলো নির্গত হয় । লুসিফেরিন একধরনের এনজাইম । জোনাকির শরীরে সংকেত পাঠানোর জন্য তেমন কোনো ব্যবস্থা না থাকায় রাতে আলো জ্বালিয়ে পুরুষ জোনাকি স্ত্রী জোনাকির সন্ধানে ঘুরে বেড়ায় । এই আলোর সংকেত দেখে স্ত্রী জোনাকি এসে ধরা দেয় । প্রসঙ্গত , প্রত্যেক জোনাকির আলো জ্বলা-নেভার ভিন্ন ভিন্ন সময় রয়েছে । আর এই জ্বলা-নেভার ভিন্নতা সৃষ্টি হয় তাদের প্রজাতিগত ভিন্নতা থেকে ।

তুমি আঁধার বাঁধন ছাড়িয়ে ওঠো , তুমি ছোটো হয়ে নও গো ছোটো ,
জগতে যেথায় যত আলো সবায় আপন ক’রে ফেলেছ ।।

জোনাকির দেহের পিছন দিকে বক্স লাইটের মতো একটা জায়গা থাকে , যার ভেতরে থাকে দুই ধরনের রাসায়নিক পদার্থ লুসিফেরেজ ও লুসিফেরিন । আলো উৎপাদনের প্রধান বস্তু লুসিফেরেজ । এই ধরনের আলো উৎপাদনের পদ্ধতিকে বলা হয় ‘ বায়োলুমিনেসেন্স ‘ । লুসিফেরেজের কাজ হচ্ছে জোনাকি পোকার খাদ্যশক্তিকে কাজে লাগিয়ে আলো উৎপন্ন করা । অক্সিজেন , ক্যালশিয়াম , এডোনোসিন ট্রাইফসফেট ও লুসিফেরিন মিলে এই আলো সৃষ্টি করে । আলো জ্বলে থাকার পিছনে নাইট্রিক অক্সাইডের ভূমিকাও রয়েছে । এই আলোতরঙ্গের দৈর্ঘ্য ৫১০ থেকে ৬৭০ ন্যানোমিটার । সাগরের তলদেশে অনেক প্রাণী থাকে যারা আলো জ্বালাতে পারে । কিন্তু স্থলভাগে জোনাকি ছাড়া আর কোনো প্রাণীর আলো জ্বালার ক্ষমতা নেই । তাই জোনাকি মানুষের কাছে রহস্যময় ও আকর্ষণীয় । রাতের আঁধারে অজস্র মিটমিটে আলোয় এক অত্যাশ্চর্য মায়াবী পরিবেশ সৃষ্টি করে এই জোনাকির দল । মানুষ এই আলোর খেলা দেখে যে শুধু মুগ্ধই হয় তা নয় , প্রেরণাও পায় । জোনাকি যদি এতো অল্প আয়ু নিয়ে এতো অল্প রসদের সাহায্যে সারা পৃথিবীকে আলোয় আলোয় ভরিয়ে দিয়ে যেতে পারে, তাহলে মানুষ পর্যাপ্ত আয়ু ও রসদ নিয়েও কৃপণের মতো ঘরের কোনে বসে থাকবে কেন ?

আরও পড়ুন- শ্রীনিবাসন সম্পদ কুমারের বই প্রকাশ “হিমায়িত তরঙ্গ” ও “ইমো”

spot_img

Related articles

ঝাড়খণ্ডে এয়ার অ্যাম্বুল্যান্স দুর্ঘটনায় পাইলট-সহ ৭ যাত্রীর মৃত্যু

আশঙ্কাই সত্যি হল, রাঁচি থেকে দিল্লিগামী এয়ার অ্যাম্বুল্যান্স (Ranchi to Delhi air ambulance accident) দুর্ঘটনায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে...

আরাবল্লী পর্বতে সাতপাক ঘুরবেন বিজয়- রশ্মিকা! ‘বিরোশ’ বিয়ে ঘিরে সবার নজর উদয়পুরে

'দ্য ওয়েডিং অব বিরোশ' (Vijay-Rashmika Wedding) অফিসিয়াল ভাবে ঘোষণা হওয়ার পর থেকে দক্ষিণী তারকা জুটি রশ্মিকা মন্দানা (Rashmika...

বৃষ্টি- তুষারপাতে আমেরিকায় ‘বম্ব সাইক্লোন’, বাতিল ১০ হাজার ফ্লাইট!

তুমুল বৃষ্টি আর তুষারপাতের ( rain and snowfall) মাঝে আমেরিকায় এবার আছড়ে পড়ল ‘বম্ব সাইক্লোন’ (Bomb Cyclone) ।...

মিলে গেল পূর্বাভাস, বৃষ্টিভেজা মঙ্গলের সকাল কলকাতাসহ দক্ষিণবঙ্গের একাধিক জেলায় 

আলিপুর আবহাওয়া দফতরের (Alipore Weather Department) পূর্বাভাস সত্যি করে মঙ্গলবার ভোরে কলকাতাসহ দক্ষিণবঙ্গের একাধিক জেলায় বিক্ষিপ্ত বৃষ্টি। ভোর...