Tuesday, February 24, 2026

‘রঙ তামাশা’, উৎপল সিনহার কলম

Date:

Share post:

উৎপল সিনহা

ফেসবুকে একজন কৌতুক ক’রে লিখেছেন টেলিভিশনের প্রথম যুগের কথা ।
” তখন সাদাকালো ছবি । অ্যান্টেনা সরিয়ে নড়িয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ছবি অ্যাডজাস্ট করতে হয় । ছবি ভীষণ কাঁপে , নড়ে , সরে যায় , জ্বলে ওঠে , নিভেও যায় । ব্রাইটনেস বাড়ানো কমানোর ওপর নির্ভর করে টিভি দেখার অনেকটাই । সেই সময়কার এক সন্ধ্যায় দেখা হচ্ছে ইংল্যান্ড বনাম নাইজেরিয়ার ফুটবল ম্যাচ ।‌বাইরে ঝোড়ো হাওয়া । খুব নড়ছে অ্যান্টেনা।‌ বারবার ম্যাচের উন্মাদনায় বিঘ্ন ঘটছে ।‌ ব্রাইটনেস বাড়ালেই টিভির পর্দা থেকে উধাও হয়ে যাচ্ছে ইংল্যান্ড দল । আবার ব্রাইটনেস কমালে পর্দা থেকে হারিয়ে যাচ্ছে নাইজেরিয়ার ফুটবলাররা । এসব সহ্য ক’রেও আমাদের খেলা দেখার উৎসাহে কোনো ভাঁটা দেখা যেতো না । ”

একেবারেই নির্ভেজাল এই রসিকতার মধ্যেও কিন্তু কেউ খুঁজে পেতে পারেন লুকোনো বর্ণবৈষম্যের কটু গন্ধ । গায়ের রঙ নিয়ে সর্বদা গর্বিত শ্বেতাঙ্গ ইংরেজরা এ নিয়ে সম্ভবত কোনো অভিযোগ করবেন না। কিন্তু কালো মানুষেরা ? তাঁরা কি খুব সহজে গ্রহণ করবেন এই আপাতনির্মল রঙ্গ ? তাঁরা কি কখনো ভুলে যাবেন ‘ জন হেনরি ‘ গানে, ‘ কালো নিগারের দেখো দুঃসাহস ‘ ! ভোলা যায় ? বিদ্রুপের চাবুকের দাগ বড়ো মারাত্মক । কালো নিগারের স্পর্ধার কথা উঠলেই মনে পড়ে চিকলেট চিবোতে চিবোতে অবলীলায় শ্বেতাঙ্গ বোলারদের গ্যালারির বাইরে আছড়ে ফেলছেন কালো ভিভ রিচার্ডস । ওহ্ , কি সীমাহীন ঔদ্ধত্য ! ভিভের ব্যাটের তাণ্ডব দেখে জুড়িয়ে যেতো কালোদের প্রাণ । ভিভের প্রত্যেকটা শটে যেন লুকিয়ে থাকতো হাজার বছরের চাপা যন্ত্রণা আর যুগযুগান্তরের সঞ্চিত অপমান ।

সাদা চামড়া , কালো চামড়া । পৃথিবীটা যেন দু’ভাগে বিভক্ত অনাদিকাল থেকে । সাদা ও কালো । তাদের লড়াইও চলছে অবিরাম । এখন কিছুটা স্তিমিত , কিছুটা থিতিয়ে আছে মানেই যে লড়াই থেমে গেছে তা কিন্তু মোটেই নয় । দক্ষিণ আফ্রিকায় মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীকে ট্রেন থেকে ধাক্কা মেরে নামিয়ে দেওয়া থেকে শুরু করে নেলসন ম্যান্ডেলার সুদীর্ঘ কারাবাস যেন একই উপন্যাসের এক একটি পৃষ্ঠা । বেঞ্জামিন মোলায়েজের আত্মদানের স্মৃতি প্রতি মুহূর্তে সজাগ । যতই কালো হোক , মেঘলা দিনে কৃষ্ণকলির কালো হরিণ চোখ দেখে মুগ্ধ হয়ে যান কবি রবি ঠাকুর । কিন্তু তা থেকে যায় গীতবিতানের পৃষ্ঠায় গানের বাণী হ’য়ে । বাস্তবে কালোদের নিস্তার নেই কোথাও । শুধুমাত্র কালো হয়ে জন্মানোর অপরাধে হাজার যুগের ভোগান্তি । তবে দুষ্টু লোকেরা বলে , শ্বেতাঙ্গদের আবার ইতিহাস কি ? কীসের ঐতিহ্য , কীসেরই বা পরম্পরা ? ওই তো , ছলে-বলে-কৌশলে কাঙালের ধন কেড়ে নেওয়া , সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের নির্লজ্জ প্রর্দশনী , অর্থ , সম্পদ আর অস্ত্রের তীব্র ঝনঝনানি আর আদিঅন্তহীন প্রতারণা ।

ইতিহাস তো কালোদের । মনুষ্যত্বে পরিপূর্ণ কালো মানুষের হাতেই তো গড়া পৃথিবীর ইমারত । লড়াই আন্দোলনের রক্তাক্ত ইতিহাস। অসম লড়াইয়ে প্রাণের তোয়াক্কা না করে মরণপণ সংগ্রামের অবিস্মরণীয় ইতিহাস । হ্যাঁ , আমরা গর্বিত কালো মানুষ ,আমরা বিশ্বজয়ী কালো মানুষ । আমাদের সমস্বরে কেঁপে ওঠে দুনিয়া ।

অথচ আজও , ‘ গণিকাও কালো হলে ভেংচি কেটে তাড়িয়ে দেয় ‘ । অথচ কে না জানে , কালো মানুষের কালো চামড়ার চেয়েও কালো অপরিমেয় নিকষ কালো বেদনা । এই বেদনা নিয়েই পাড়ি দিতে হবে এখনও দীর্ঘ পথ । ‘ কেননা এ অন্ধকারে শেষ যুদ্ধ বাকি ‘ ।

‘ ব্ল্যাক পাওয়ার ‘ একটি রাজনৈতিক স্লোগান । কালো মানুষদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রতিষ্ঠা ছিল এর অন্যতম উদ্দেশ্য । মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৬০-এর দশকের শেষ দিকে এই আন্দোলন প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল জাতিগত নিপীড়নের বিরুদ্ধে কালো মানুষদের সম্মিলিত প্রতিবাদে । তাও মূলধারার নাগরিক অধিকার আন্দোলন থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করার জন্য এবং কালো বিচ্ছিন্নতাবাদকে সমর্থন করার জন্য আন্দোলনটি সমালোচিত হয়েছে ।‌অথচ কালোদের নিয়ে হাজার বছরের রঙ-তামাশার কথা কিন্তু বেমালুম চেপে যাওয়া হয় এসব সমালোচনার সময় !

ডোবায় ভেসে থাকা ব্যাঙের মাথায় ঢিল ছুঁড়ে অনেক কচিকাঁচা বিস্তর আনন্দ পায় , কিন্তু ব্যাঙের জীবন দুর্বিসহ হয়ে ওঠে । ঠিক তেমনি কালোদের নিয়ে শ্বেতাঙ্গদের বহু যুগের রঙ-তামাশায় শ্বেতাঙ্গদের বিস্তর আমোদ হলেও কালোদের ওষ্ঠাগত প্রাণের কথা কেউ ভাবে নি ।

‘ একি শুধু হাসিখেলা , প্রমোদের মেলা , শুধু মিছে কথা ছলনা ?
এ যে বুকফাটা দুখে গুমরিছে বুকে গভীর মরমবেদনা । ‘
কালো কি শুধু অন্ধকারের প্রতিনিধি ? কালো কি শুধুই রাত্রির রঙ ? উৎসারিত আলোর উৎস নয় ? সকল দ্বন্দ্ব বিরোধ মাঝে জাগ্রত ভালোর রঙ নয় ?

হ্যাঁ , কালো কর্তৃত্বের প্রতীকী রঙ । ব্যক্তিত্বের রঙ । সমস্ত রঙের উৎস । সমস্ত আলোর উৎস । সমস্ত সৌন্দর্যের প্রেরণারঙ কালো । কালো সহিষ্ণুতা ও কমনীয়তার রঙ ।

উদ্ভাবনী ক্ষমতা তথা সৃজনের রঙ । ভালোবাসার রঙ । ঘুরে দাঁড়ানোর রঙ । পড়ে গিয়েও বারবার উঠে দাঁড়ানোর রঙ । কালো বিশ্বব্যাপী মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার রঙ । লড়াই , আন্দোলন , সংগ্রাম ও চেতনার মূল রঙ কালো । কালো জীবনযুদ্ধে হারতে হারতেও শেষপর্যন্ত জিতে যাওয়ার রঙ ।

আরও পড়ুন- রাখঢাক ছেড়ে এবার রামধনু জোটে শিলমোহর সুকান্তর

spot_img

Related articles

প্রথম সমকামী প্রধানমন্ত্রী! কে এই রব জেটেন

এই প্রথম বার কোনও সমকামী প্রধানমন্ত্রী পেল নেদারল্যান্ডস (First Gay Prime Minister) রব জেটেন। ইতিহাস মাফিক দেশের কনিষ্ঠতম...

নাম বদলেও বঞ্চিত বাংলা, আমরা আদায় করে ছাড়ব! কেরালার নাম বদলে গর্জে উঠলেন মমতা

সব বিষয়েই বঞ্চিত বাংলা। সেই কারণে পশ্চিমবঙ্গের নাম বদলের দীর্ঘদিনের আর্জিকে উপেক্ষা করে কেরালার নাম বদলে অনুমেোদন দিল...

জমজমাট ‘দ্য ওয়েডিং অফ বিরোশ’, নারকেলের জল দিয়ে বিজয়-রশ্মিকার বিয়ের ওয়েলকাম ড্রিঙ্ক!

হাতে আর মাত্র দু-দিন, তারপরই সাতপাকে বাঁধা পড়তে চলেছেন বিজয় দেবেরাকোন্ডা এবং রশ্মিকা মন্দানা (Vijay Deverokonda-Rashmika Mandhana Wedding)।...

ডাক্তারি পরীক্ষা দিতে বলায় বাবাকে খুন! ড্রামে মিলল দেহাংশ

বারবার ডাক্তারি পরীক্ষা দিতে বলায় বাবাকে গুলি করে মারল ছেলে। এই ভয়ঙ্কর ঘটনাটি ঘটেছে উত্তর প্রদেশের লখনউয়ে। তবে...