Wednesday, May 13, 2026

‘পূজা ও প্রেম’, উৎপল সিনহার কলম

Date:

Share post:

উৎপল সিনহা

‘ বলতে পারো সরস্বতীর মস্ত কেন সম্মান ? ‘ প্রশ্ন তুলেছেন বুদ্ধদেব বসু তাঁর ‘ বিদ্যাসুন্দর ‘ কবিতায় ।
উত্তরও দিয়েছেন তিনি এই কবিতারই একেবারে শেষে । কী সেই উত্তর ?

‘ বিদ্যা যাকে বলি , তারই আর একটি নাম সুন্দর । ‘ হংসপাখায় পাঁক লাগে না , সরস্বতীর আসনের এমনই মহিমা । এক হাতে প্রজ্ঞা , অন্য হাতে সুর । বই ও বীনা গায়ে গায়ে । শ্বেতশুভ্র বসনা এমন বিদুষী দেবী এ মহাবিশ্বে আর কোথায় ? সুরেশ্বরী ও বিদ্যাবতী তো বটেই , তিনি অনন্যা , তিনি সর্বগুণের অসামান্য আধার।
কথায় আছে , রূপে লক্ষ্মী , গুণে সরস্বতী । কিন্তু তিনি কি প্রেমের দেবী ? যদি না হন , তাহলে বাঙালির প্রেমের দেবী কে ?

মাঘ মাসের শুক্ল পঞ্চমী তিথি বড়ো কাঙ্ক্ষিত বাঙালি ঘরের কিশোর-কিশোরীদের কাছে । বাগেশ্বরীর চরণে আমের মুকুল , দোয়াত ও কলম , বইপত্র আর সুর ও বাদ্যযন্ত্র মিলেমিশে একাকার সেদিন । আর হ্যাঁ , খড়ি । শিশুদের হাতেখড়ি হয় মাকে সাক্ষী রেখে , মায়ের আশীর্বাদ নিয়ে । অ আ ক খ লিখে তবেই পাওয়া যায় বিদ্যাসুন্দরের সাধনক্ষেত্রে প্রবেশের মহামূল্য ছাড়পত্র । শুভ কাজে মনোনিবেশের অঙ্গীকার করতে হয় পুণ্যলগ্নে । একি শুধুমাত্র নিছক কিছু ধর্মীয় রীতিনীতির অনুশাসন মেনে গুরুগম্ভীর পূজার্চনার দিন ? একি শীতের শেষ পরশের আমেজ মেখে বসন্তকে আহ্বান জানানোর মহালগ্ন নয় ? বসন্ত পঞ্চমীর সঙ্গে বাঙালির সম্পর্ক আবেগে রোমাঞ্চে টইটম্বুর । এ সম্পর্ক যেন চিরকালের । লুকিয়ে চুরিয়ে , গুরুজন ও পাড়াপড়শিদের চোখ এড়িয়ে একরাশ বুক ঢিপঢিপ নিয়ে কম্পিত কণ্ঠে প্রেমের প্রস্তাবনা , কি জানি কী হয় ! ও কি রাজি ? রাজি নয় ? তা কী করে হয় ?

ওঁ জয় জয় দেবী চরাচর সারে … অঞ্জলি , উপোস , এতদিনের এতো কৃচ্ছসাধন , হলুদ শাড়ি , হলুদ অথবা পাটভাঙা সাদা পাঞ্জাবি , দুরুদুরু বুকে কাছে এসে দাঁড়ানো … একি কখনও ব্যর্থ হয় ? হতে পারে ? জয় হোক অবাধ্য কৈশোরের , জয় হোক পূজা ও প্রেমের । জয় মা , জয় মা সরস্বতী । বিদ্যা দাও, বুদ্ধি দাও , সুর দাও , আর হ্যাঁ , হৃদয়ে প্রেম দিও একটুখানি ।

প্রেমের পরীক্ষায় পাশ করিয়ে দিও মাগো । ভ্যালেন্টাইনস ডে নয় , এ হলো বাঙালির নিজস্ব প্রেমের দিন । এ স্বতন্ত্র , এ বিশিষ্ট , এ অনুপম , এ অনন্য। পুজোর শেষে ভুরিভোজ । পাতপেড়ে খিচুড়ি ও বেগুনি ।
কোথাও বা বাসন্তী পোলাও , শীতের তরতাজা আনাজের পাঁচমিশালি তরকারি , চাটনি , পাঁপড় ও শেষপাতে নলেন গুড়ের কাঁচাগোল্লা ।

তারপর ? তারপরই তো সেই শুভলগ্ন । হাতে হাত রেখে দাও ছুট । সফল সফর যদি না পড়ে ধরা । দুটি মন কাছাকাছি , এই ছিলো , হঠাৎই উধাও । যে কথা হয় নি বলা , আজ বলা যায় । এমন দিনে তারে বলা যায় ।

সরস্বতী পূজা উপলক্ষ্যে কেনা পোশাক একেবারে নতুন চেহারা দেয় বাঙালি কিশোর-কিশোরীদের ।
এই বিশেষ দিনটি বাঙালি কিশোরীর শাড়িতে নারী হয়ে ওঠার দিন । ধোপদুরস্ত পাজামা-পাঞ্জাবী শোভিত বাঙালি কিশোর ছাত্রের সাবালক হয়ে ওঠার দিনও কি নয় এই দিনটি ?

আসলে আনন্দ বসন্তের সমাগম সম্ভাবনা ছাড়া দেবী সরস্বতীর আরাধনা ভাবাই যায় না । বসন্তই যেন রঙিন করে তোলে আপামর বাঙালিকে । আর তাই বোধহয় বাগদেবীর পূজার দিনটির অপর নাম , আসলে গোপন নাম ‘ প্রেমদিবস ‘ । এই একটি দিন ভালোবাসার হাত ধরে কোথাও তাদের হারিয়ে যাবার নেই মানা । দেবী কি নিজেও জানেন যে , উদ্দাম বাঙালি কৈশোরের প্রেমের দেবীও তিনিই ! তাঁর পূজা যদি বসন্তে না হয়ে হতো প্রবল গ্রীষ্মে অথবা দুরন্ত বর্ষায় , তাহলেও কি ভালোবাসা এমন দুহাত পেতে এসে দাঁড়াতো তাঁর দরজায় ? বসন্তের সঙ্গে প্রেমের যোগ যে চিরকালের । তাই তো বসন্তে যৌবনজলতরঙ্গ অপ্রতিরোধ্য ।

আর এই এক আশ্চর্য দেবী ! বিদ্যা , জ্ঞান , বৈদগ্ধ ও সঙ্গীতের অনন্ত আধার । ভালোবাসার এমন ভাঁড়ার , যে ভাণ্ডার বিবিধ রতনে অপরূপা , যার স্নিগ্ধ স্পর্শে জিভের জড়তা কেটে যায় , কেঁপে ওঠা কণ্ঠস্বর দৃঢ় ও প্রত্যয়ী হয় , সমস্ত দ্বিধাদ্বন্দ্ব অতিক্রম করে মনের কথা প্রকাশ করার দুরন্ত স্পর্ধা অর্জন করে নিমেষে , সেই অসামান্য ভালোবাসার অপর নাম দেবী সরস্বতী ।

আরও পড়ুন- মুখ্যমন্ত্রীর হাত ধরেই বৈপ্লবিক পরিবর্তন খেলাধুলােয় : ব্রাত্য

_

 

_

Related articles

জীবন যুদ্ধে হার মানলেন, টুটুহীন মোহনবাগান

লড়াই শেষ, জীবনযুদ্ধে হার মানলেন স্বপন সাধন বোস। ভারতীয় ফুটবলে যিনি পরিচিত টুটু(Tutu Bose) নামে। হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে শেষনিঃশ্বাস...

বিরাট ধাক্কা আসতে চলেছে: কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর আশ্বাসের পরই সতর্ক করলেন শিল্পপতি

একদিকে দেশের প্রধানমন্ত্রী করোনা পরিস্থিতির মতো কাজে ফেরার বার্তা দিচ্ছেন। অন্যদিকে তাঁরই পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী কেন্দ্রের সরকারের জ্বালানি (fuel)...

স্কুলবেলা থেকে মুখ্যমন্ত্রী! আজও ‘রবিদা’র সেলাইয়েই ভরসা শুভেন্দু অধিকারীর

রাজনীতিতে অনেক বদল এসেছে, সময়ের নিয়মে পদেরও পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু রুচি এবং ভরসায় বিন্দুমাত্র বদল আনেননি রাজ্যের নতুন...

পরবর্তী পরিকল্পনা নির্ধারণ: বুধে ৪১ দফতরের সঙ্গে বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী

রাজ্যে নতুন সরকার গঠিত হওয়ার পরে দ্রুততার সঙ্গে দফতরগুলিকে সক্রিয় করার প্রক্রিয়া শুরু করেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu...