Friday, June 5, 2026

ক্যান্সার-কোমা পেরিয়ে বিশ্বমঞ্চে বাংলার ‘কুইন’ তরুনিকা

Date:

Share post:

পাঁচ মিটারের বেশি দূরত্বে তাঁর দৃষ্টি ঝাপসা। বয়স একুশ হলেও চিকিৎসকদের মতে মানসিক বয়স থমকে আছে বারোতেই। জন্মের মাত্র আঠারো মাস বয়সে ব্লাড ক্যানসার, আর তার পরেই টানা ৩২ দিনের যন্ত্রণাময় কোমা—সব বাধাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে আজ আন্তর্জাতিক মঞ্চে বিশ্বরেকর্ড গড়ছেন বাংলার মেয়ে তরুণিকা ঘোষ।

তরুণিকার সাফল্যের মুকুটে এখন একের পর এক পালক। সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ার ব্রিসবেনে আয়োজিত ‘ভার্চুস ওয়ার্ল্ড প্যারা অ্যাথলিট কম্পিটিশনে’  (Virtus World Athletics Championships) ১৫০০ মিটার রেস ওয়াকে বা দ্রুত হাঁটায় (Race Walk) গড়েছেন এক অবিশ্বাস্য বিশ্বরেকর্ড। আগের রেকর্ডের তুলনায় ১২ সেকেন্ড কম সময় নিয়ে তিনি বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন। শুধু তাই নয়, গত বছর গোয়ায় (Goa) জাতীয় প্যারা সুইমিংয়ের (The National Para Swimming) ১০০ মিটার ফ্রি-স্টাইলে রুপো জেতার পর, এ বছর হায়দ্রাবাদ (Hyderabad) একই ইভেন্টে ছিনিয়ে নিয়েছেন সোনা। বিদেশের মাটিতে তাঁর এই অসামান্য কৃতিত্ব দেখে বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা তাঁকে নিজেদের দেশের ব্যাজ পরিয়ে সম্মান জানিয়েছেন—যা তাঁর সাফল্যের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।

তরুণিকার জীবনযুদ্ধ শুরু হয়েছিল যখন তাঁর বয়স মাত্র ১৮ মাস। প্রথমে জুভেনাইল রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস (Juvenile Rheumatoid Arthritis) ভেবে ভুল চিকিৎসা চললেও তাঁর অবস্থার অবনতি হলে বাবা সঞ্জয় ঘোষ ও মা সুবর্ণা ঘোষ তাঁকে নিয়ে যান মুম্বইয়ের টাটা মেমোরিয়াল হসপিটালে (Tata Memorial Hospital)। সেখানেই জানা যায় তিনি তৃতীয় পর্যায়ের ‘অ্যাকিউট লিমফোব্লাস্টিক লিউকোমিয়া’ (Acute lymphoblastic leukemia) বা ব্লাড ক্যানসারে (Blood Cancer) আক্রান্ত। ২০০৮ সালে এক ভয়াবহ সংক্রমণের জেরে টানা ৩২ দিন কোমায় ছিলেন তিনি। চিকিৎসকরা আশা ছেড়ে দিলেওঅলৌকিকভাবে ফিরে আসেন তরুণিকা।  বর্তমানে চিকিৎসার প্রভাবে তাঁর দৃষ্টিশক্তির প্রায় ৮০ শতাংশ নষ্ট হয়ে গিয়েছে।

মুম্বই থেকে ফেরার পর শুরুতে মানুষের ভিড় আর স্কুলের পরিবেশ দেখে ভয় পেতেন তরুণিকা। স্কুলে গেলেও অন্যদের সঙ্গে মিশতে পারত না। সেই সময় তাঁর জীবনে বড় ভূমিকা নেন তাঁর দাদা। দাদাকে খেলাধুলা করতে দেখেই ছোটবেলা থেকে খেলাধুলার প্রতি আগ্রহ জন্মায়।

প্রথমে সাঁতারেই মন দেন তিনি। বাবার হাত ধরে সুইমিং পুলে গিয়ে জলকেই বন্ধু বানিয়ে নিয়েছিলেন। পরে প্রতিযোগিতায় নামা শুরু। দাদার অনুপ্রেরণাতেই ১৫ বছর বয়সে  খেলাধুলায় যোগ দেন।

চিকিৎসকেরা জানান, তাঁর বাঁ দিকের হাত-পা পুরোপুরি সক্রিয় নয়। কলকাতার পিজি হাসপাতালের (PG Hospital )স্পোর্টস মেডিসিন বিভাগে পরামর্শ নিয়ে বিশেষ ফিজিওথেরাপি শুরু হয়। এক বছরের মধ্যেই তার সুফল মেলে। ফিজিওথেরাপি তাঁর শরীরের বাঁ দিকের জড়তা কাটিয়ে গতি ফিরিয়ে দেয়।

তরুণিকা নিজেকে ভালবেসে ‘কুইন'(Queen) বলে ডাকেন। তাঁর যুক্তি, তাঁর রক্তের গ্রুপ ‘ ও নেগেটিভ ‘(O Negative), যা অত্যন্ত বিরল এবং তাঁর কাছে এটিই হলো “রাজকীয় রক্ত”। এই আত্মবিশ্বাসই তাঁকে লড়তে শেখায়। তাঁর পরিবারের আক্ষেপ, বিশেষভাবে সক্ষম অ্যাথলেটদের জন্য পরিকাঠামো বা উন্নত কোচের অভাব থাকলেও তরুণিকার লক্ষ্য স্থির।

বর্তমানে তরুণিকার  মধ্যে শৃঙ্খলা ও লক্ষ্যস্থিরতা অসাধারণ। দিনে তিন থেকে চার ঘণ্টা অনুশীলন এখন তাঁর নিয়ম। তাঁর একটাই স্বপ্ন—দেশের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করা, একদিন অলিম্পিকের মঞ্চে নামা।

তরুণিকার গল্প শুধু ক্যানসার জয়ের নয়, অদম্য লড়াই করে  স্বপ্নপূরণের গল্প। অন্ধকার পেরিয়ে আজ তিনি প্রমাণ করেছেন—শারীরিক সীমাবদ্ধতা নয়, মানসিক শক্তিই আসল পরিচয়।

Related articles

দফতর বন্টনের দিন হঠাৎ দিল্লি যাত্রা মুখ্যমন্ত্রীর! কারণ ঘিরে কৌতুহল 

শুক্রবার সকাল পর্যন্ত মনে করা হচ্ছিল আজই রাজ্য মন্ত্রিসভার দফতর বন্টন (Distribution of Portfolios to Ministers) হবে, কিন্তু...

১.১০ কোটি বৃক্ষরোপণের প্রতিশ্রুতি, পরিবেশ রক্ষায় পশ্চিমবঙ্গকে শীর্ষে নিয়ে যাওয়ার বার্তা মুখ্যমন্ত্রীর 

বিশ্ব পরিবেশ দিবস (World Environment Day) উপলক্ষ্যে শুক্রবার সকালে নলবনে 'একটি গাছ মায়ের নামে' কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে বৃক্ষরোপণ...

দিল্লিতে মারাত্মক কাণ্ড, ফ্ল্যাট থেকে উদ্ধার বাঙালি অধ্যাপিকার রক্তাক্ত দেহ! 

দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের (Delhi University) সহকারী অধ্যাপিকা দেবস্মিতা পালের (Debosmita Paul) রক্তাক্ত দেহ উদ্ধার ঘিরে চাঞ্চল্য। মাথায় ভারী বস্তু...

রেশন কার্ড বাতিল নিয়ে বড় নির্দেশিকা, ‘ভুয়ো’ উপভোক্তা ছাঁটাইয়ে কী পদক্ষেপ নবান্নের

এসআইআরের চূড়ান্ত রিপোর্টের উপর ভিত্তি করে রাজ্যে 'অযোগ্য' রেশন উপভোক্তাদের কার্ড বাতিল (Ration Card Cancellation) সংক্রান্ত নির্দেশিকা জারি...