
দেবাশিস বিশ্বাস

গতকাল শিলিগুড়িতে রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী ও দোর্দণ্ড প্রতাপ বাম নেতা শ্রী অশোক ভট্টাচার্য বলেছেন যে অতীতে বর্তমান রাজ্যের শাসক দলকে হারাতে বহু বাম কর্মী, সমর্থক বিজেপিকে ভোট দিয়েছেন, এটা বিরাট বিরাট ভুল ছিল। ওনারা তো ছোট ভুল করেন না, সব ই Himalayan blunder করেন। এটাও হয়তো সেরকম বলতে চেয়েছেন উনি।

যদিও এই কথা শুনে তেমন কোনও প্রতিক্রিয়া নেই, খুব একটা প্রচার ও নেই এই কথার। এই রাজ্যে ওনার দলের গুরুত্ব বর্তমানে ততটুকুই টিকে আছে, যতটা গুরুত্ব বিশ্ব মঞ্চে ভারতের টিকে আছে আমাদের মহাগুরুর কল্যাণে।

যাই হোক, উনি কোনও মহা গোপন তথ্য প্রকাশ করেননি, এমনকি বিরাট কিছু হাটে হাঁড়ি ভেঙেছেন এমনও নয়। উনি যে কথা বলেছেন, সেই কথা রাজ্যের প্রায় ৯৫ শতাংশ মানুষ জানেন, এটা জানার জন্য Political science বা Economics বা Sociology এর Doctorate-ও হতে হয় না, একটা দেশলাই কাঠি জ্বালাবার পদ্ধতি জানার জ্ঞান যার আছে, তারা সবাই জানে বোঝে। কথা সেটা নয়। কথা হল এই কাণ্ড করার পরও তাঁরা এতটাই hypocrite যে তাঁরা বিচিত্র সব তত্ত্ব যেমন “বীজেমুল”, “সেটিং”, “ফিটিং” এসব আউরে গেছে, আউরে চলেছেন অনবরত। কেউ এসব পাত্তা দেয়না, আর এসব শুনে কারও হাসি ও পায় না। ভাবতে অবাক লাগে, এরা রাজ্যের মানুষকে কতটা মূর্খ ভাবে? এরা এতটা মূর্খ হল কি ভাবে? জন বিচ্ছিন্নতা কত দূর অবধি গ্রাস করলে নিজের রাজ্যের মানুষকে এতটা মূর্খ অজ্ঞ ভাবার মতন দাম্ভিকতা গ্রাস করে?

অশোকবাবু অবশ্যই বিচক্ষণ মানুষ, হতেই পারে দীর্ঘ দিন শাসকের কুরশিতে থাকার কারণে, ওনাকে ক্ষমতা অর্থ এসবের চোরা গলিতে ঘুরপাক খেতে হয়েছে, তাই আবশ্যিক ভাবে এসেছে জন বিচ্ছিন্নতা, দম্ভ, আহাম্মকি ভাব, কিন্তু ওনার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা প্রখর এটা নিশ্চিত। উনি যে কথাটা বলতে চেয়েছেন, কিন্তু প্রকাশ্যে বলেন নি, সেটা হল ওনার দল এক বিশেষ দলকে নিশ্চিত ১২-১৫ শতাংশ vote transfer করেছিল, কিন্তু ওনাদের তো প্রায় ৪৫ শতাংশের উপর ভোট ছিল। ওই ১২-১৫ শতাংশ ভোট গেলেও ৩০ শতাংশ মতন ভোট টিকে থাকার কথা। রাজ্যে আগে ভোট হত দুই দলের মধ্যে। কিন্তু নতুন অঙ্কে যদি ত্রি মুখী ভোট contest হয়, সেক্ষেত্রে ওই ২৮-৩০ শতাংশ ভোট ই ক্ষমতা দখলের জন্য যথেষ্ট হতে পারে। এটাই ছিল ওনাদের সহজ পাটি গণিত। কিন্তু ওনাদের ই নেতা সরোজ মুখার্জির কথা ওনার ভুলে গেছিলেন। অঙ্ক যখন মানুষ নিয়ে, সেখানে ২ আর ৩ মিলে ৫ হবে এমন নিশ্চয়তা নেই, ৫, ১৫, ২, ০, সব ই হতে পারে। এক্ষেত্রে ও তাই হল। ওনারা ছাড়লেন ১২-১৫ শতাংশ ভোট, কিন্তু এই ছাড়ার খেলা মানুষ গেল বুঝে। দেখা গেল সঙ্গে সঙ্গে ওনাদের প্রায় ১২-১৫ শতাংশ মুসলিম ভোট কেটে বেরিয়ে গেল। এখানেই শেষ নয় ওনাদের সঙ্গে থাকা ১০-১২ শতাংশ Left liberal minded হিন্দু ভোট ও গেলো ঝড়ের বেগে সরে। এই অংশ কোনো কারনে, কোনো অকাট্য যুক্তিতেও কোনো ভাবেই কোনো fascist দলকে সমর্থন তো করবেই না, বরং এমন কোনো কাজ ই করবে না, যাতে fascist শক্তির উত্থান হয়। আরোও বড় বিড়ম্বনার বিষয়, এই ভোট গেল সেই দিকেই, যাদের হারাবার জন্য অশোক বাবুরা নিজেদের ঘরের ভোট transfer করেছিলেন। ফলে দেখা গেল ওই দলের কোনো ক্ষতি তো হলো ই না, বরং তাদের ভোট ৫০ শতাংশ পেরিয়ে গেল। অশোক বাবুদের পোষা troll বাহিনী এদের চটি চাটা, ধান্দাবাজ, চোর, লম্পট এসব বলে জঘন্য ব্যক্তি আক্রমন করেও কোনও লাভই হল না। অশোক বাবুরা সর্বস্ব হারিয়ে পথে বসে গেলেন। এখন তাঁরা ৫-৬ শতাংশ ভোট পান কোনও রকমে, আসন একটাও নেই, ১০ শতাংশ পেলেই বা ৫ টা আসন কোনও ভাবে পেলেই নিজেদের বিজয়ী ঘোষণা করে দেবেন, যেমন ট্রাম্প সাহেব রোজ নিজেই নিজেকে বিজয়ী ঘোষণা করে চলেছেন।

আরও পড়ুন : তৃণমূলকে হারাতে বাম ভোট রামে! মেনে নিলেন সিপিআইএমের অশোক

অশোক বাবুরা কোন স্বর্গে বসবাস করেন কে জানে। কেন এই হাল হল, তাদের উপর মানুষের এখনো এত ক্রোধ বিরক্তি কেন সেটা নিয়ে আলোচনা করার সাহস তাঁদের নেই। কারন প্রকৃত তথ্য ও তত্ত্ব বিশ্লেষণ করলে ৫ টার মধ্যে ৪ টি আঙুল ই তাঁদের মানে নেতৃত্বের দিকেই উঠবে। তাই তাঁরা কখনো বলেন যে মানুষ ভুল না করলেও আমরা মানুষকে বোঝাতে ব্যর্থ হয়েছি, কখনো এটাও বলে ফেলে যে মানুষ ও ভুল করে (কেবল তাঁরা কোন ভুল করেন না) ইত্যাদি ইত্যাদি বহু কথিত বহু চর্চিত garbage. আসল কথাটা আগে স্বীকার করুন যে তাঁরা ভুল করেছেন, হ্যা জেনে বুজে অন্যায় করেছেন, মানুষ তাঁদের বজ্জাতি বুঝে গেছিল তাই তাঁদের তাড়িয়েছে। এবং মানুষকে ধন্যবাদ দেওয়া উচিৎ এই বলে যে ভাগ্যিস তাঁরা এই বজ্জাতি বুঝে গেছিল, না বুঝলে এই রাজ্য টা একটা আসাম, ত্রিপুরা বা ওড়িশা হয়ে যেতো।

আপাতত অশোক বাবুরা দলের কিছু করার নেই, ওনারা আসলে বুঝতে চাইছেন না যে ওনারা ক্ষমতা, বা seat বা ভোট ই কেবল হারান নি, ওনারা যে বস্তুটা হারিয়েছেন সেটার নাম ” বিশ্বাস যোগ্যতা”, credibility, সেটা এক অমূল্য রতন। হ্যাঁ সেটাও ফিরে পাওয়া সম্ভব। তার জন্য দরকার লম্বা কঠিন পথে হাঁটার সাহস ও ইচ্ছা।

কিন্তু অত সময় কোথায়, সন্ধ্যে হয়ে আসছে, এখুনি যেতে হবে সুমনের সঙ্গে আড্ডা মারতে, স্বর্ণালীর সাথে আগামী রণ কৌশল তৈরী করতে, আজ কোন আদালতে কোন বিচারক কাকে কি প্রশ্ন করলেন, আগামী নির্বাচনে সেই প্রশ্ন কত গুরুত্বপূর্ণ সেটা ব্যাখ্যা করতে।
অতলের কোনও তল নেই। নামা, কেবল নামা, নেমেই চলা।

–

