পাথর খাদান থেকে সাফল্যের শিখরে আসানসোলের ২০ ‘লড়াকু’ পরীক্ষার্থী

Date:

Share post:

অন্ধকার খুপরি ঘর, নুন আনতে পান্তা ফুরানো সংসার, আর দিনরাত পাথর ভাঙার শব্দ— এই ছিল তাদের চেনা জগৎ। কিন্তু সমস্ত প্রতিকূলতাকে জয় করে আলোর পথে পা বাড়াল পশ্চিম বর্ধমান জেলার ২০ জন কিশোরী। আসানসোলের বনসরাকডিহির ‘ফিড বই টই হই চই ফ্রি কোচিং স্কুল’-এর হাত ধরে এবারের মাধ্যমিক পরীক্ষায় ‘কুড়িতে কুড়ি’ সাফল্য এল। আর্থিক অনটনকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে মাধ্যমিকের (Madhyamik 2026) গণ্ডি পার করল ২০ জন কন্যা।

এই লড়াকু ছাত্রীদের জীবনসংগ্রাম যেকোনো সিনেমার গল্পকেও হার মানায়। আসানসোলের পাঁচগাছিয়া কমলা গার্লস হাইস্কুল থেকে তারা পরীক্ষায় বসেছিল। তাদের মধ্যে কারও বাবা নেই, কারও মা হাড়ভাঙা খাটুনি খাটেন পাথর খাদানে। এমনকি আধুনিক এই যুগেও অনেকের বাড়িতে পৌঁছায়নি ইলেক্ট্রিসিটি। কুপি বা লন্ঠনের আলোতেই চলেছে লেখাপড়ার প্রস্তুতি। পলাশডিহা বাউড়ি পাড়ার রীতা বাউড়ির বাড়িতে আজও বিদ্যুৎ নেই। বাবা অসুস্থ, মা পাথর ভাঙা কলের শ্রমিক। সেই অন্ধকার ঘর থেকেই আজ সে মাধ্যমিক উত্তীর্ণ। সরাকডিহির শ্রেয়া বসাক দিনমজুর বাবার মেয়ে। অসুস্থ মায়ের সেবা আর সংসারের যাবতীয় কাজ সামলে দ্বিতীয় বিভাগে পাশ করেছে সে। নন্দিনী বাউড়ির বাড়িতে পারিবারিক অশান্তির জেরে পুড়ে গিয়েছিল জন্ম শংসাপত্র-সহ যাবতীয় জরুরি নথি। বাবার ছত্রছায়া ছাড়াই দিনমজুর মায়ের হাত ধরে পড়াশোনা চালিয়ে গেছে নন্দিনী। আজ তার দুচোখে স্বপ্ন নার্স হওয়ার।

এই অভাবনীয় সাফল্যের পেছনে বড় ভূমিকা পালন করেছে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘ফিড’ (FEED)। সংগঠনের তরফে চন্দ্রশেখর কুণ্ডু আবেগপ্লুত কণ্ঠে বলেন, “এটা এক অসম লড়াই। আজ অন্ধকার কাটিয়ে ওরা আলোর দেখা পেল। আমাদের শুভানুধ্যায়ী এবং শিক্ষক-শিক্ষিকাদের অক্লান্ত পরিশ্রম ও সহযোগিতায় এই অসাধ্য সাধন সম্ভব হয়েছে।” আরও পড়ুন: তিলজলার অগ্নিকাণ্ডের তদন্তে উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন রাজ্যের

মেয়েদের এই সাফল্যে চোখে জল পাথর ভাঙা কলের শ্রমিক লক্ষ্মী বাউড়ির। তিনি বলেন, “বাড়িতে কারেন্ট নেই, স্বামী অসুস্থ। আমি সারাদিন কাজ করি। ফিডের এই স্কুল না থাকলে আমার মেয়ে এতদূর এগোতে পারত না। ওরাই বই, খাতা, ব্যাগ এবং ভালো শিক্ষক দিয়ে আমাদের সন্তানদের মানুষ করছে।” আসানসোলের এই ২০ জন কন্যার সাফল্য প্রমাণ করে দিল, সুযোগ এবং সঠিক দিশা পেলে জন্মগত পরিচয় বা দারিদ্র্য কোনোটিই মেধার পথে বাধা হতে পারে না। এই জয় কেবল ২০ জন ছাত্রীর নয়, বরং গোটা সমাজের লড়াইয়ের জয়।

spot_img

Related articles

সাংসদ – পরাজিত প্রার্থীদের নিয়ে কালীঘাটে জরুরি বৈঠকে তৃণমূল নেত্রী

এবার ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে লড়াই করা প্রার্থীদের নিয়ে বৈঠক ডাকলেন নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee)। একই সঙ্গে দলের...

নিরাপত্তার ‘অজুহাত’: নবান্নে এবার নিয়ন্ত্রিত সাংবাদিকদের গতি!

সংবাদ সংগ্রহে স্বৈরাচারী বাধা বিজেপির নবনির্বাচিত রাজ্য প্রশাসনের। একেবারে দিল্লি মডেলে এবার বাংলাতে, নবান্নে সাংবাদিকদের (journalists) গতিবিধি নিয়ন্ত্রিত...

বিধানসভায় শপথের প্রস্তুতি, প্রোটেম স্পিকারের দায়িত্বে তাপস রায়

রাজ্য বিধানসভার প্রোটেম স্পিকার হিসেবে শপথ নিলেন মানিকতলার বিধায়ক তাপস রায়। মঙ্গলবার লোক ভবনে আয়োজিত এক বিশেষ অনুষ্ঠানে...

ভিন রাজ্যে আলু বিক্রি: কৃষি বিপণনের দায়িত্ব পেয়েই বার্তা দিলীপের

তাঁর কাঁধে রাজ্যের একাধিক দফতর। দলের দীর্ঘদিনের নেতৃত্ব দেওয়ার অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই বিজেপির আস্থা গভীর দিলীপ ঘোষের উপর। তাই...