লোকসভা নির্বাচনের প্রচারে এসে বাংলাকে দুধ-মধুর জোয়ারে ভাসিয়ে দেওয়ার গণ্ডা গণ্ডা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন নরেন্দ্র মোদি- অমিত শাহরা৷ বলেছিলেন, “কেন্দ্র দিতে চায়, কিন্তু রাজ্য নিতে রাজি নয়”৷ এখানেই না থেমে, মোদিজি আরও একধাপ এগিয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ‘উন্নয়নের স্পিড-ব্রেকার’ পর্যন্ত বলেছিলেন। মোদি-শাহের বাণীতে উৎসাহিত হয়ে রাজ্যজুড়ে ঘুরে ঘুরে বঙ্গ-বিজেপি নেতারা বলেছিলেন, “আমাদের জেতান, বাংলার ভোল পাল্টে দেবে বিজেপি”৷ সে সব শুনে বাংলার মানুষ দু’হাত ভরে ভোট দিয়ে সংসদে ১৮জন সাংসদ পাঠালেন৷
আর তারপর ?

মোদি-সীতারমনের বাজেট দেখে কার্যত মুখে কুলুপ বঙ্গ-বিজেপি’র৷ অসহায় তাঁরা৷ অজুহাত খোঁজার মরিয়া চেষ্টায় ছেলেমানুষের মতো কথা বলে চলেছেন রাজ্যের গেরুয়া নেতারা৷
এবং তাঁরা এখনও আশাবাদী, বাংলার মতদাতারা তাঁদের হাতেই নাকি রাজ্য শাসনের ভার তুলে দেবেন৷

শুধু যে নেতা-সাংসদরাই নীরব, তেমন নয়৷ সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘মুখর’ থাকা বিজেপি সমর্থকদেরও সেভাবে দেখা যাচ্ছে না৷ হাতে গোনা দু-চারজন বাস্তববাদী ভক্ত ইতিমধ্যেই বাজেট নিয়ে যা মন্তব্য করেছেন, তা গেরুয়া- শিবিরের পক্ষে আদৌ সুখকর নয়৷ স্পষ্টই ধরা পড়ছে, মোদিজির প্রতি তাঁদের প্রশ্নাতীত আস্থায় টান পড়ছে৷ সামনে শতাধিক পুরসভার ভোট, একুশে বিধানসভা নির্বাচন৷ সেই সন্ধিক্ষণে রাজ্যের গেরুয়া নেতাদের বেশ অস্বস্তিকর এবং বিব্রতকর অবস্থায় ফেলেছে কেন্দ্রীয় বাজেট৷

এই রাজ্য মোদিজির বিজেপিকে বেনজিরভাবে ১৮ আসন দেওয়ায় পর স্বাভাবিকভাবেই আমজনতার প্রত্যাশা আকাশ ছুঁয়েছিলো৷ সেই প্রত্যাশা প্রথম ধাক্কা খায় মন্ত্রিসভা গঠনের সময়৷ একুশের ভোটে রাজ্যের শাসন ক্ষমতা দখল করতে হলে, শুধুই মিছিল- মিটিং নয়, কিছু গঠনমূলক কাজ করেও দেখাতে হবে৷ ২০১১-র আগে দিল্লির ক্ষমতাকে ব্যবহার করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একের পর এক প্রকল্প, প্যাকেজে ভরিয়েছিলেন এ রাজ্যকে৷ সেই সলতে পাকানোর ফল তিনি হাতে-নাতে পেয়েছেন৷ ওটাই বঙ্গ-বিজেপির কাছে ‘মডেল’ হতে পারতো৷ কিন্তু হলো কোথায় ? বাংলার হাতে সেভাবে দিল্লির ক্ষমতাই এলোনা৷
কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা গঠনের সময় জল্পনা তুঙ্গে ছিলো, এবার একাধিক পূর্ণমন্ত্রী বাংলা পাবে৷ অথচ সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে এমন দু’টি হাফ-মন্ত্রক নিয়ে, যা সামনে রেখে উন্নয়নও হয়না, রাজনীতিও হয়না৷ রাজ্য-বিজেপির কাছে সেটা ছিলো দিল্লির প্রথম ধাক্কা৷ আর রাজনৈতিক দিক থেকে অতীব গুরুত্বপূর্ণ সময়ে অভূতপূর্ব ‘বঙ্গ-বিদ্বেষী’ বাজেট পেশ করে দিলীপ ঘোষদের এবার দ্বিতীয় ধাক্কাটা দিলেন মোদিজি-শাহজি৷

সন্দেহ নেই, আর পাঁচজনের মতো বাংলার বিজেপি নেতা-সাংসদ- কর্মী- সমর্থকদের ন্যূনতম একটা আশা ছিলো, ভোটের মুখে কেন্দ্রীয় বাজেটে ‘বঙ্গ-থালি’ জাতীয় কিছু একটা থাকবে, যা সামনে রেখে ভোট প্রচারে তৃণমূলের মোকাবিলা করা যাবে৷ একইসঙ্গে নরেন্দ্র মোদি রাজ্য এসে উন্নয়নের যে অঙ্গীকার করে গিয়েছেন, তার বাস্তবায়ন এবার বাংলার মানুষ দেখবেন৷ সে আশায় হিমশীতল জল ঢেলেছেন টিম মোদি-শাহ- ই৷ কিন্তু স্পর্শকাতর এই বিষয়টি তো এড়িয়ে যাওয়া যায় না, তাই
দলের মুখ রাখতে দিলীপ ঘোষরা নানা যুক্তি দিতে বাধ্য হচ্ছেন৷ ওনারা বলার সময় নিজেরাও বুঝতে পারছেন, বাংলার মানুষ এই যুক্তি ‘খাচ্ছেন না’৷ কিন্তু তাও ওনাদের বলতেই হচ্ছে,”এটা দেশের বাজেট, রাজ্যের তো নয়।”
কিন্তু ঘনিষ্ঠ মহলে সব নেতাই বলছেন, “কেন্দ্র ভোটের মুখে পথে বসিয়ে দিলো৷ কী নিয়ে বাংলার মানুষের সামনে যাবো ? মানুষের প্রশ্নের উত্তরই বা কী দেবো?”

তবুও ভোট বড় বালাই৷ তবুও যেতে হবে মানুষের কাছে৷ তাই কিছু বলতেই হবে৷ বিজেপির রাজ্য সভাপতি সাংসদ দিলীপ ঘোষ বলেছেন, “আমরা বাংলার জন্য নয়, সারা ভারতের জন্য কাজ করি। আয়করে ছাড় বাংলার মানুষ পাবেন না? অতীতে অন্য সরকার যে-রকম প্রাদেশিক বাজেট করত, আমরা করি না। সব-কা-বিকাশ করি।”

যুক্তি দিতে চেষ্টা করেছেন কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী দেবশ্রী চৌধুরি৷ বলেছেন, “এই বাজেট সকলের। মহিলা, যুব, কৃষক, সবার জন্য বরাদ্দ হয়েছে।” সাংসদ সুভাষ সরকার তো জাদুঘরের উন্নতির মধ্যেই বাংলার উন্নয়ন খুঁজে পেয়েছেন৷ তাই বলেছেন, “কলকাতা জাদুঘরের জন্য তো বরাদ্দ হয়েছে।”
তবে সবার সব সাফাইকে ছাপিয়ে গিয়েছেন বিজেপির রাজ্য সাধারণ সম্পাদক সায়ন্তন বসু৷ তিনি দিল্লির এই বঞ্চনার জন্যও মুখ্যমন্ত্রীকেই অভিযুক্ত করে বলেছেন, “রাজ্য সরকার তো বাজেটের আগে দিল্লিতে কোনও নির্দিষ্ট প্রস্তাবই পাঠায়নি। পাঠালেই পেয়ে যেতো”৷ সায়ন্তনবাবু সম্ভবত এখনও বুঝেই উঠতে পারেননি, কেন্দ্রের বাজেট কীভাবে হয়৷
কিছু করার নেই, দিল্লির বিজেপি এক ধাক্কায় যে গর্তে বঙ্গ-বিজেপি’কে ফেলেছে, সেই গর্ত থেকে উঠে আসতে রাজ্য- বিজেপির কিছুটা সময় লাগবেই৷ ততদিন এভাবেই বাড়বে হাস্যকর সাফাইয়ের সংখ্যা৷
তবে, বাস্তব এটাই বিজেপি রাজ্য থেকে ১৮ সাংসদ পেয়েও বাংলার প্রত্যাশা-পূরণে ব্যর্থ হয়েছে।

