একই ঘটনা। একই দৃশ্য। শুধু পাল্টে পাল্টে যাচ্ছে সময় আর দেশ। প্রথমে দ্বীপরাষ্ট্র শ্রীলঙ্কা। তার পর বাংলাদেশ। এবার নেপাল। সেই গণঅভ্যুত্থান। বাংলাদেশের মতো সামনের সারিতে যুব সমাজ- জেন জি। হিমালয়ের কন্যা নেপালের পালাবদল যেন শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশের রিপিট টেলিকাস্ট।
ভারতেরই প্রতিবেশী ৩ দেশ- শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ, নেপাল- এখন একসারিতে। জনরোষ থেকে গণ অভ্যুত্থান। পর পর মিলে যাচ্ছে সব চিত্র। ফেসবুক, ইউটিউব, এক্স-সহ ২৬টি সোশ্যাল মিডিয়া সাইট বন্ধ করার নির্দেশকে সামনে রেখে তার প্রতিবাদে সোমবার থেকে ওলি সরকারের বিরোধিতায় নেমেছে জেন জ়ি। গুলি চলেছে। প্রাণহানি ঘটেছে। মঙ্গলবার, সেটাই চেহারা নিল বিদ্রোহের। আর তাতে পদত্যাগ করে পালাতে বাধ্য হল প্রধানমন্ত্রী। সামরিক বিমানে তাঁকে সরানো হল বাসভবন থেকে। রাষ্ট্রপতি থেক প্রধানমন্ত্রী, প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী-সহ অন্যান্য মন্ত্রীদের বাড়িতে ঢুকে চলে লুঠ অগ্নিসংযোগ। একইভাবে সেনা বিমানে দেশ ছাড়ার চেষ্টা রাষ্ট্রপ্রধানদের।

একই দৃশ্য দেখা গিয়েছিল ২০২২-এর শ্রীলঙ্কায় (Shrilanka)। তীব্র মুদ্রাস্ফীতি, অর্থনৈতিক অব্যবস্থা, বিদ্যুৎবিভ্রাট থেকে জ্বালানি তেল, নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের ঘাটতি- এইসহ কারণে একাধিক সঙ্কট দেখা দেয় শ্রীলঙ্কায়। তারই বিরোধিতায় গণঅভ্যুত্থান। তুমুল বিক্ষোভে উত্তাল হয় দ্বীপরাষ্ট্র। রাষ্ট্রপ্রধানের বাসভবনে ঢুকে লুঠ, ভাঙচুর বিক্ষোভকারীদের। রীতিমতো সুইমিংপুলে নেমে স্নান করেন বাসিন্দারা। ক্ষমতাচ্যুত হয় গোঠাভয় রাজাপক্ষ সরকার।

গতবছর ২০২৪- এই সময়ও জ্বলছে বাংলাদেশ (Bangladesh)। ‘জুলাই বিপ্লব’-এর আঁচে পড়ে যায় হাসিনা সরকার। মূলত ছাত্র আন্দোলনকে সামনে রেখেই গণ অভ্যুত্থানে ক্ষমতা হারায় শেখা হাসিনা নেতৃত্বাধীন আওয়ামি লিগ সরকার। আন্দোলনের নেপথ্যে মূল কারণ ছিল সরকারি চাকরিতে কোটা। শেখ হাসিনার পতনের পরে তাঁর বাড়িতে ঢুকে লুটপাট করেন বাংলাদেশীরা। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর খাটে শুয়ে ছবি, ভিডিও পোস্ট। সেখান থেকে টিভি থেকে হাঁস-মুরগি নিয়ে পালান নাগরিকরা। অশ্লীল আচরণ করতেও দেখা যায় তাঁদের।

এবার সেপ্টেম্বরের ৮ তারিখ ও ৯ তারিখ। স্যোশাল মিডিয়া নিষিদ্ধ করকে সামনে রেখে তুমুল বিক্ষোভ নেপাল জুড়ে। বিক্ষোভকারী বেশিরভাগই তরুণ প্রজন্ম। সংসদ ভবনে ঢুকে পড়ে তারা। সেখানে ঢুকে ভাঙচুর চালান আন্দোলনকারীরা। সংসদ ভবনে আগুন ধরিয়ে দেয়। বিক্ষোভ থামতে স্যোশাল মিডিয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয় কেপি শর্মা ওলি সরকার। কিন্তু ততক্ষণে জ্বলে গিয়েছে আগুন। মঙ্গলবার থেকে রণক্ষেত্র হয়ে ওঠে দেশ। দুর্নীতি-সহ একাধিক অভিযোগ ওলি সরকারের বিরুদ্ধে। তুমুল অশান্তি দেখা যায়।

যেভাবে রাষ্ট্রপ্রধানদের বাড়িতে হামলা হয়েছিল বাকি দুদেশে, এখানেও তারই প্রতিফলন। রাস্তায় ফেলে মারা হয় দেশের অর্থমন্ত্রীকে। একই ভাবে সেনার চপারে করে দেশ ছাড়ার পরিকল্পনা করেন ওলি। তবে, তিনি এখন নেপালের সীমান্ত অতিক্রম করতে পেরেছেন কি না তা স্পষ্ট নয়। যেভাবে হাসিনার পতনের পরে একের পরে এক বঙ্গবন্ধু-সহ আওয়ামি লিগের নেতা-নেত্রীদের মূর্তি ভাঙা হয় বাংলাদেশজুড়ে নেপালেও এদিন সেই ছবি।

রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টির প্রেসিডেন্ট রবি লমিছানেকে জেল থেকে মুক্ত করে দেওয়া হয়, ঠিক যেমন বিএনপি-সহ রাজাকারদের বাংলাদেশের কারাগার থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল।

সোমবারই আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা ছিল, শ্রীলঙ্কা-বাংলাদেশের মতো নেপালে গণ অভ্যুত্থান হতে পারে। আর মঙ্গলবার সেই আশঙ্কাই সত্যি হল। শ্রীলঙ্কা কিছুটা ঘুরে দাঁড়াতে পারলেও, বাংলাদেশে এখনও নড়বড়ে অবস্থায় রয়েছে। তদারকি ইউনুস সরকার দেশে শান্তি-শৃঙ্খলা আনতে পারছে না। নির্বিচারে অত্যাচারিত হচ্ছেন সে দেশের সংখ্যা লঘুরা। এখন নেপালের সেনাবাহিনী বা বিরোধী রাজনৈতিক দল কীভাবে পরিস্থিতি সামলায় তার দিকেই নজর ভারত-সহ রাজনৈতিক মহলের।
আরও পড়ুন – অগ্নিগর্ভ নেপালে ছাত্র-যুবদের আন্দোলনের মুখ! কে এই সুদান গুরুং?
_
_
