অলকেশ কুমার শর্মা
ভারতীয় অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হল পরিকাঠামো ক্ষেত্র। উন্নতমানের পরিকাঠামো কেবল উন্নত পরিষেবার স্থায়ী চাহিদাই সৃষ্টি করে না, সামগ্রিক উন্নয়নের গতি বহুগুণে বাড়িয়ে তোলে। বিশেষ করে গত কয়েক দশকে দেশের বিভিন্ন বৃহৎ প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এই ক্ষেত্র একটি মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে। এই গুরুত্ব অনুধাবন করেই কেন্দ্র সরকার চলতি অর্থবর্ষের বাজেটে পরিকাঠামো খাতে ১১.১ লক্ষ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে। একই সঙ্গে বিশ্বমানের পরিকাঠামো গড়ে তুলতে সময়-নির্দিষ্ট কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’, ‘আত্মনির্ভর ভারত’, ‘পিএম গতিশক্তি’র মতো নীতিগত উদ্যোগ, প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ নীতির উদারতা এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতি সব মিলিয়ে এই ক্ষেত্রের বিকাশ আরও ত্বরান্বিত হবে বলেই আশা করা যায়।

কেরল সরকার ও ভারত সরকারের বিভিন্ন পরিকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে তিন দশকেরও বেশি সময় যুক্ত থাকার অভিজ্ঞতায় আমি দেখেছি, প্রকল্প সম্পাদনের পথে কত রকম প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়। জমি অধিগ্রহণে জটিলতা, নিয়ন্ত্রণগত অনুমোদনে বিলম্ব, সমন্বিত পরিকল্পনার অভাব, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং সর্বোপরি প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় সুদৃঢ় পরিকল্পনার ঘাটতি এসবই প্রকল্প বাস্তবায়নে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এ ছাড়াও কাঁচামালের অপ্রতুলতা, দক্ষ শ্রমিকের অভাব, পর্যাপ্ত জল ও বিদ্যুৎ সরবরাহের সমস্যা, প্রকল্প নকশার অসম্পূর্ণতা কিংবা ঘন ঘন নকশা পরিবর্তনের মতো বিষয়গুলি কাজের গতি শ্লথ করে। স্থানীয় স্তরের বিভিন্ন সমস্যা এবং পরিকল্পনা ও নিয়ন্ত্রণের ঘাটতির কারণে প্রকল্পে বিলম্ব হয়, যার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ে অর্থনীতির ওপর।

বৃহৎ পরিকাঠামো প্রকল্পগুলি স্বভাবতই অত্যন্ত জটিল। এতে বহু রাজ্য, বহু ক্ষেত্র এবং একাধিক কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সংস্থার সম্পৃক্ততা থাকে। প্রয়োজন হয় নানাবিধ অনুমোদনের, যার ফলে কাজ শেষ হতে সময় ও ব্যয়—দুটিই বেড়ে যায়। যদিও বিভিন্ন মন্ত্রক ও দফতর নিজ নিজভাবে নজরদারি ও বাস্তবায়ন পদ্ধতি গ্রহণ করে, তবু সেগুলি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিচ্ছিন্ন এবং রাজ্য সরকারের সঙ্গে কার্যকর সমন্বয়ের অভাব থেকে যায়।
এই প্রেক্ষাপটে জাতীয় গুরুত্বের প্রকল্পগুলির কাজ যাতে বিলম্বিত না হয়, সেই লক্ষ্যে ২০১৫ সালের মার্চ মাসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর উদ্যোগে চালু হয় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিনির্ভর বহুমুখী প্ল্যাটফর্ম ‘প্রোঅ্যাক্টিভ গভর্ন্যান্স অ্যান্ড টাইমলি ইমপ্লিমেন্টেশন’ (প্রগতি)। এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের প্রকল্পগুলির অগ্রগতি সরাসরি নজরদারির পাশাপাশি সাধারণ মানুষের অভিযোগও একই ডিজিটাল পরিসরে পর্যালোচনা করা হয়। প্রধানমন্ত্রী প্রগতিকে কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে এবং বিভিন্ন মন্ত্রকের মধ্যে সমন্বয়সাধনের একটি সার্বিক সমাধান হিসেবে কল্পনা করেছিলেন।
শুরু থেকেই কেন্দ্রীয় মন্ত্রক ও রাজ্য সরকারের সক্রিয় সহযোগিতায় প্রগতি একটি কার্যকর ডিজিটাল নজরদারি ও অভিযোগ নিষ্পত্তির মঞ্চে পরিণত হয়। প্রধানমন্ত্রীর পৌরোহিত্যে এ পর্যন্ত ৫০টি পর্যালোচনা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে, যেখানে রাজ্যের মুখ্য সচিব ও কেন্দ্রীয় মন্ত্রকের সচিবরা উপস্থিত থেকে প্রকল্প-সংক্রান্ত নির্দিষ্ট সমস্যা চিহ্নিত ও সমাধানের পথ খুঁজেছেন। সাধারণ সমস্যাগুলি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রক স্তরেই নিষ্পত্তি হয়েছে এবং জটিল বিষয়গুলি প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে। ৫০০ কোটি টাকার বেশি মূল্যের প্রকল্পগুলির নিয়মিত নজরদারির জন্য পৃথক ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয়ে একটি বিশেষ নজরদারি গোষ্ঠীও গঠিত হয়, যার সঙ্গে আমি যুক্ত ছিলাম। ক্যাবিনেট সচিবালয় বৈঠকে গৃহীত সিদ্ধান্তগুলির বাস্তবায়ন নিশ্চিত করে, ফলে প্রকল্প সময়মতো শেষ করা সম্ভব হয়।

প্রগতি চালুর পর গত এক দশকে ৩,৩০০-রও বেশি প্রকল্প পর্যালোচনা করে দ্রুত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা হয়েছে, যার আনুমানিক মূল্য ৮৫ লক্ষ কোটি টাকা। ‘এক দেশ, এক রেশন কার্ড’, ‘প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা’, ‘প্রধানমন্ত্রী জন আরোগ্য যোজনা’, ‘স্বচ্ছ ভারত মিশন’-সহ ৬১টি বড় সরকারি প্রকল্প এই প্ল্যাটফর্মে পর্যালোচিত হয়েছে। ব্যাঙ্কিং, বিমা, রিয়েল এস্টেট নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ এবং কোভিড সংক্রান্ত বিষয়-সহ ৩৬টি ক্ষেত্রে ওঠা অভিযোগেরও নিষ্পত্তি হয়েছে। প্রগতি ও পিএমজি পোর্টালে উত্থাপিত ৭,৭০০ সমস্যার মধ্যে ৭,১০০টির সমাধান হয়েছে—নিষ্পত্তির হার ৯২ শতাংশেরও বেশি। প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি পর্যালোচনায় থাকা প্রকল্পগুলিতে প্রায় প্রতিদিন গড়ে একটি করে সমস্যার সমাধান হয়েছে যা প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি ও দায়বদ্ধতা বৃদ্ধির স্পষ্ট প্রমাণ।

সামাজিক ক্ষেত্রেও প্রগতি উল্লেখযোগ্য সাফল্য এনে দিয়েছে। এর অন্যতম উদাহরণ মিশন অমৃত সরোবর। ২০২২ সালে শুরু হওয়া এই প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল দেশের প্রতিটি জেলায় ৭৫টি করে জলাশয় নির্মাণ ও পুনরুজ্জীবন। প্রতিটি সরোবরের ন্যূনতম আয়তন এক একর এবং জলধারণ ক্ষমতা ১০ হাজার ঘনমিটার নির্ধারণ করা হয়। কেন্দ্র, রাজ্য ও জেলা প্রশাসনের আধিকারিকরা প্রগতি প্ল্যাটফর্মে নিয়মিত নজরদারি চালানোর ফলে জমি ও অর্থ সংক্রান্ত সমস্যা দ্রুত সমাধান সম্ভব হয়। ২০২৩ সালের ১৫ আগস্টের মধ্যে ৫০ হাজার অমৃত সরোবর নির্মাণের লক্ষ্য থাকলেও, ইতিমধ্যে ৬৮,৮০০-রও বেশি সরোবর নির্মিত হয়েছে। জলাভাব দূরীকরণ এবং ভূগর্ভস্থ জলস্তর বৃদ্ধিতে এই মিশন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

পরিকাঠামো ক্ষেত্রে প্রগতির প্রভাব স্পষ্ট রেল প্রকল্পগুলিতেও। জম্মু–উধমপুর–শ্রীনগর–বারামুলা রেল সংযোগ প্রকল্প ১৯৯৪ সালে অনুমোদিত হলেও ২০১৫ সাল পর্যন্ত কাজ হয়েছিল মাত্র ৪০ শতাংশ। প্রগতি মঞ্চে একাধিকবার পর্যালোচনার পর কাজের গতি দ্রুত বাড়ে এবং ২০২৫ সালের ৬ জুন এই ২৭২ কিলোমিটার দীর্ঘ রেলপথ চালু হয়। একইভাবে বোগিবিল রেল ও সড়ক সেতু প্রকল্পও প্রগতির নজরদারিতে সময়মতো সম্পন্ন হয়। এই উদাহরণগুলি দেখায়, প্রযুক্তি-নির্ভর সমন্বয় কীভাবে নাগরিকদের কাছে আধুনিক পরিকাঠামো দ্রুত পৌঁছে দিতে পারে।

নাগরিকদের প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শাসনব্যবস্থাকে আরও গতিশীল করতে প্রধানমন্ত্রী প্রগতি প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলেছিলেন। পরবর্তীতে পিএম গতিশক্তি ও ‘পরিবেশ’-এর মতো ব্যবস্থার সঙ্গে এর সংযোগ স্থাপন করে নজরদারিকে আরও কার্যকর করা হয়। এর ফলে ব্যয় হ্রাস, ডিজিটাল স্বচ্ছতা ও দ্রুত বিবাদ নিষ্পত্তি সম্ভব হয়েছে।
ভারত যখন পরিকাঠামো উন্নয়নে বৃহৎ লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে চলেছে, তখন প্রগতি প্রকল্প পরিচালনা ও সময়মতো বাস্তবায়নের এক শক্তিশালী মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এটি প্রমাণ করেছে যে প্রযুক্তি-নির্ভর পর্যালোচনা কেবল স্ক্রিনে সীমাবদ্ধ থাকে না, বাস্তব পরিবর্তনও ঘটায়। সহজ নজরদারি, কার্যকর সমন্বয়, স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতার মাধ্যমে জনপরিষেবাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার যে দৃষ্টিভঙ্গি, প্রগতি তারই সফল বাস্তব রূপ। এর মূলমন্ত্র “সহজতার জন্য সংস্কার, কর্মসম্পাদনের মাধ্যমে বাস্তবায়ন এবং রূপান্তরের মাধ্যমে প্রভাব” আজ ভারতের প্রশাসনিক ব্যবস্থায় এক নতুন মানদণ্ড স্থাপন করেছে।
মতামত ব্যক্তিগত
(লেখক : রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা নির্বাচন পর্ষদ – পিইএসবি-র সদস্য এবং বৈদ্যুতিন ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রকের প্রাক্তন সচিব)



