বাঁচার ইচ্ছে ছিল সাংঘাতিক। সেই কারণে শুধু কিডনি পেতে স্ত্রীকে ছেড়ে বিয়ে করেছিলেন প্রেমিকাকে। কাজ হাসিল হতেই তাঁকে ছেড়ে ফের ফিরছিলেন পুরনো স্ত্রীর কাছে। কিন্তু এত করার পরেও মাত্র ৪২ বছরে মৃত্যু হল অনন্ত দাসের (নাম পরিবর্তিত)। কলকাতার এসএসকেএম হাসপাতাল (SSKM Hospital)-এর এই রোগীর জীবন হার মানায় সিনেমার চিত্রনাট্যকেও।

দীর্ঘদিন ধরে কিডনির জটিল সমস্যায় ভুগছিলেন অনন্ত দাস। নিয়মিত ডায়ালিসিসে তাঁর শরীর ভেঙে পড়ছিল। চিকিৎসাধীন ছিলেন কলকাতার এসএসকেএম হাসপাতাল (SSKM Hospital)-এর নেফ্রোলজি বিভাগে (Nephrology department)। শেষমেশ চিকিৎসকরা স্পষ্ট জানিয়ে দেন, কিডনি প্রতিস্থাপন ছাড়া তাঁর আর বাঁচার কোনও উপায় নেই। চিকিৎসক ডা অতনু পাল জানান, রোগীর শারীরিক অবস্থা দ্রুত অবনতি হচ্ছিল এবং কিডনি ট্রান্সপ্লান্টই (Kidney transplantation) ছিল একমাত্র সমাধান।

কিন্তু ভারতের কঠোর অঙ্গ প্রতিস্থাপন আইন অনুযায়ী রক্ত সম্পর্কের আত্মীয় ছাড়া ডোনার পাওয়া দুষ্কর। সাধারণত এমন পরিস্থিতিতে স্ত্রী ডোনার হিসেবে এগিয়ে আসেন। কিন্তু অনন্তর স্ত্রীর শারীরিক জটিলতার কারণে তিনি কিডনি দিতে পারেননি।
আরও খবর: ‘বিচার’ মেলেনি আলিমুদ্দিনে! এবার CPIM ঘনিষ্ঠ আইনজীবীর বিরুদ্ধে থানায় যৌন হেনস্থার অভিযোগ ‘নির্যাতিতা’র

বিবাহিত অনন্ত জড়িয়ে ছিলেন পরকীয়াতেও। প্রয়োজনের সময় এগিয়ে আসেন অনন্তর প্রেমিকা। তবে তিনি একটি শর্ত দেন- প্রথম স্ত্রীকে আইনি ভাবে ডিভোর্স দিয়ে তাঁকে বিয়ে করতে হবে, তবেই তিনি কিডনি দান করবেন। বাঁচার ইচ্ছেয় সেই শর্ত মেনে নেন অনন্ত। আইনি বিচ্ছেদের পর প্রেমিকাকে বিয়ে করেন। এরপর এক বেসরকারি হাসপাতালে ট্রান্সপ্লান্ট বোর্ড ও এথিক্স কমিটির অনুমোদন এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র যাচাইয়ের পর সফলভাবে কিডনি প্রতিস্থাপন হয়। অস্ত্রোপচারের পর ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠেন তিনি।

অস্ত্রোপচারের পর প্রায় বছর দুয়েক নতুন স্ত্রীর সঙ্গে কাটলেও অনন্তর মন পড়ে ছিল ফেলে আসা সংসারে। সুস্থ হওয়ার কয়েক বছর পরে আবার প্রথম স্ত্রীর কাছে ফিরতে চান অনন্ত। নিয়মিত চেকআপে এসে চিকিৎসকদের কাছে নিজের সেই ইচ্ছার কথা জানান। শেষ পর্যন্ত দ্বিতীয় স্ত্রীকে ছেড়ে তিনি ফের প্রথম স্ত্রীর সঙ্গেই সংসার শুরু করেন। যে বিচ্ছেদ একসময় ছিল কৌশলগত, তা মিটিয়ে পুরনো সম্পর্কে ফেরেন তিনি।

প্রায় আট বছর সুস্থভাবে জীবন কাটানোর পর হঠাৎই ছন্দপতন। শরীরে বাসা বাঁধে মারণ সংক্রমণ (Infection)। নিয়মিত চেকআপ চললেও সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে অকেজো হয়ে যায় একাধিক অঙ্গ (Multi-organ failure)। যে জীবনের জন্য তিনি সমাজ ও সম্পর্কের সংজ্ঞা বদলে দিয়েছিলেন, সেই জীবনই তাঁকে ফাঁকি দিয়ে দিল একসময়। শেষ পর্যন্ত মৃত্যু দেখিয়ে দিল, জীবনের সব লড়াই জেতা যায় না।

ডাক্তার অতনু পাল জানান, চিকিৎসকদের কাছে রোগীর প্রাণ বাঁচানোটাই আসল। তবে এই ঘটনা প্রমাণ করে অঙ্গদানের সঙ্গে কতটা মানসিক ও সামাজিক টানাপড়েন জড়িয়ে থাকে। তিনি সতর্ক করেন যে, আইনি ফাঁকফোকর ব্যবহার করে এমন কৌশল ভবিষ্যতে অঙ্গ প্রতিস্থাপন প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। স্বার্থপরের মতো সিদ্ধান্ত না নিয়ে প্রয়োজনে দীর্ঘমেয়াদী ও আইনসম্মত বিকল্প খোঁজা জরুরি।

–

–

–


